মানুষের আকাক্সক্ষার পরিণতি শিল্পের দৃষ্টিকোন
Printed Edition
গাজী গিয়াস উদ্দিন
ত্যাগের শক্তিতে মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারে। আত্মার দারিদ্র্যই সবচেয়ে বড় কৃপণতা। মানুষের আকাক্সক্ষার পরিসীমা নেই। তবু মানুষকে থামতে হয়। তবু অসীম যাত্রার বিরতি নেই। মানুষ পেতে চায় অনেক। বৈষয়িক চাওয়া পাওয়া। মর্যাদা এবং অমরত্বের বাসনা। সুখ-সমৃদ্ধি প্রতিপত্তি লাভ। জৈবিক নানা চাহিদা। ভোগ-উপভোগ।
১৯১৯ সালে সিলেট সফরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ স্থানীয় ছাত্রদের উদ্দেশে ‘আকাঙ্খা’ বিষয়ের ওপর বক্তৃতা করেন। কিশোর মুজতবা আলী বিশ্ব কবিকে চিঠি লিখে জানতে চাইলেন ‘আকাঙ্খা উচ্চ করতে গেলে কী করা প্রয়োজন।’ এক সপ্তাহ পরেই আসমানি রঙের খামে জবাব পেলেন ‘আকাঙ্খা উচ্চ করিতে হইবে’, এই কথাটির মোটামুটি অর্থ এই- স্বার্থই যেন মানুষের কাম্য না হয়। দেশের মঙ্গলের জন্য ও জনসেবার জন্য স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ কামনাই মানুষকে কল্যাণের পথে নিয়ে যায়। তোমার পক্ষে কী করা উচিত তা এত দূর থেকে বলে দেয়া সম্ভব নয়। তবে তোমার অন্তরের শুভেচ্ছাই তোমাকে কল্যাণের পথে নিয়ে যাবে মানব আকাক্সক্ষা যদি হতে পারত নৈর্ব্যক্তিক।
মানুষ চিন্তা ও কর্মে এ স্তরে পৌঁছাতে না পারলে জীবন ও জগতে বিড়ম্বনা থেকে তার মুক্তি নেই। এর মানে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠতে পারা। বিষয়টিকে আপাতদৃষ্টিতে অনেকে আত্মবঞ্চনার নামান্তর ভাবতে পারেন।
জগৎখ্যাত মনীষী বার্ট্রান্ড রাসেল তার সুলিখিত ‘ক্ষমতা স্পৃহা’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন অন্যান্য প্রাণীর সাথে মানুষের পার্থক্য কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক, আর কিছুটা আবেগগত। তিনি বলেন ‘মানুষের কিছু কিছু আকাঙ্খা সীমাহীন এবং এসব আকাঙ্খা সব সময়ই পরিপূর্ণ তৃপ্তি লাভে ব্যর্থ হয়।’ এ প্রসঙ্গে তিনি দৃষ্টান্ত যুক্ত করেন ‘সাপ শিকার খেয়ে পরিতৃপ্তির সুখনিদ্রা যায়। পুনরায় ক্ষুধার্ত না হওয়া পর্যন্ত সে ঘুমিয়েই কাটায়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন ‘জীবজন্তুর কার্যক্রম সাধারণত নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা ও প্রজননের মাধ্যমে বংশগতি বৃদ্ধি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। মানুষের বেলায় বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন।... মানুষের প্রাথমিক প্রয়োজনসমূহ পূরণ হয়ে যাওয়ার পর কল্পনাশক্তির ঘোড়ায় চড়ে মানুষ জীবনের অন্যান্য দিকের স্বাদ নেয়ার ব্যাপারে অবিরাম প্রয়াস চালায়।... আমাদের জীবনে চিরকালীন সুখ লাভের জন্যে যা করা প্রয়োজন তা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কেবল ঈশ্বরের পক্ষেই পরম সুখ লাভ করা সম্ভব। কারণ ‘রাজত্ব, ক্ষমতা আর মহিমা কেবল তাঁরই প্রাপ্য।... প্রতিটি মানুষই সম্ভব হলে ঈশ্বর হতে চাইত। কিছু লোক আছে যারা মানুষের পক্ষে যে ঈশ্বর হওয়া সম্ভব নয়, এ কথা মানতে রাজি নয়।’
শিক্ষা ও সংস্কৃতির উপযোগী পরিবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কয়টি পরিবার বা সমাজ সাধারণ নিরাপদ পরিবেশ পাচ্ছে যে- লক্ষ্য পথে বেড়ে উঠবে? আসলে জগতে কোনো কিছুরই অভাব নেই। অথচ স্বভাব দোষে আমরা সব হারাচ্ছি। ভেতরে বাহিরে সব ভাবেই আমরা যেন সর্বহারা, যা পাচ্ছি, স্বাভাবিকভাবে নয়, যা পাচ্ছি, পেয়েও হারাচ্ছি। আমাদের চিন্তা ও কর্ম আমাদেরকে সুখ ও পরিতৃপ্তি দিতে পারছে না। চারপাশে ব্যর্থতা, জঞ্জাল আর কদাচার আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। কেন?
আমাদের ব্যর্থতা, আমাদের বেদনা আমাদের অর্জিত? জেনেশুনে কেউ কারো বিপদ ও ক্ষতি ডেকে আনে না। এটা জেনেও আমরা অপরিণামদর্শীর ন্যায় ভুল পথে পা বাড়াই। আমার সিদ্ধান্ত কি অভ্রান্ত? ভুলের যাচাই-বাছাই ক’জন করে। ভেবে দেখি, আমি সমাজের দশজন না হয়ে এগার হতে পারি কি না।
চিন্তা ও পরিকল্পনা স্বাধীন। কিন্তু কাজের বাস্তবায়ন এবং চিন্তার প্রতিফলন সাধন কষ্টার্জিত।
অলসতা, পরিশ্রম বিমুখতা এবং অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে যে কোনো দুর্বলতা চিন্তা ও কর্ম পথে প্রধান অন্তরায়।
জীবনের স্বপ্ন অর্জনে ধৈর্য এবং অবিচলতা লক্ষ্য পূরণে সুবিজয় সুনিশ্চিত করে। স্রষ্টার স্মরণ, মাতাপিতার প্রতি ভক্তি ও দায়িত্ব পালন এবং নিজ পরিবার- আত্মীয় প্রতিবেশীর প্রতি সুবিচার করতে পারা, আর দুঃখী দরিদ্রের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হলে- এসব জীবনে সফলতার জন্যে সহায়ক হয়। সমাজের মানুষের দোষগুলো না খুঁজে যদি গুণগুলো খোঁজা হতো, এ চর্চা চলতে থাকলে মানুষের দোষ খুঁজে পাওয়া যেত না। সমালোচনা করার প্রয়োজন পড়লে তা হবে গঠনমূলক। সংশোধনের শুদ্ধিধারা সমাজে পরিবর্তন আনতে পারে।
সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব চিরন্তন ও অনিবার্য। তবে সত্য ও মিথ্যার ধারণায় শুধু বিতর্ক নয়, যথেষ্ট কুসংস্কার আছে। বাধা অতিক্রম করেই জয়ী হতে হয়। অন্যায়, অবিচার ও কুসংস্কার এড়িয়ে চলতে পারলেই মুক্তি।
কুসংস্কার হলো এমন অযৌক্তিক ভ্রান্ত বিশ্বাস, যা যুক্তি ও বাস্তবতা বিবর্জিত। এ বিশ্বাসগুলো প্রায়শই অলৌকিক শক্তি বা অতিপ্রাকৃত ঘটনার ওপর নির্ভরশীল হয় এবং বৈজ্ঞানিক বা ধর্মীয় কোনো প্রমাণ এর ভিত্তি হিসেবে থাকে না।
রাতে আয়না দেখা, কালো বেড়াল বা রাতে বুতুমের ডাক অশুভ, এসব লোক- কুসংস্কারের কথা আমি বলছি না। গোঁড়ামি করে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, মানুষের অধিকারের প্রতি উদাসীনতা, নারীর প্রতি নিষ্ঠুরতা এসবকেই আমি জঘন্য কুসংস্কার বলব। মানুষের জীবনকে এসব বিষিয়ে তুলছে, ক্ষতিগ্রস্তও করছে। অন্যায় অসুন্দর ও কুসংস্কারমুক্ত বিশ্ব বর্তমান ও আগামী বিশ্বের সবচেয়ে বড় আকাক্সক্ষা।
রবীন্দ্রনাথের ‘পরিশেষ’ কাব্যের ‘প্রশ্ন’ কবিতার উল্লেখ এখানে প্রাসঙ্গিক মনে করছি :
‘ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত, পাঠায়েছ বারে বারে/দয়াহীন সংসারে,/তারা বলে গেল ‘ক্ষমা করো সবে’, বলে গেল ‘ভালোবাসো-/অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো’।/বরণীয় তারা, স্মরণীয় তারা, তবুও বাহির-দ্বারে/আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।/আমি-যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে / হেনেছে নিঃসহায়ে,/আমি-যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে/বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে/আমি-যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে/ কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।/কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা,/অমাবস্যার কারা/লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে,/ তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে-/যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,/ তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো।’
আকাক্সক্ষা ও তার পরিণাম সম্পর্কে আমি যা বলতে চেয়েছিলাম, তা হচ্ছে- আমাদের জীবনের প্রয়োজন ও চাহিদার তালিকা বর্তমান আধুনিক যুগে আমরা যত বড় করে ফেলেছি। সবই কি এ জীবনে অপরিহার্য? তবে এসব কিছু অর্জন করা যাদের পক্ষে সম্ভব, তাদের আকাক্সক্ষার নিবৃত্তি কোথায়? আর জীবনের যাবতীয় আকাক্সক্ষা পূরণে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার জীবনযুদ্ধ কতটা মানবীয়, তা নিয়েই ভাবছিলাম। তবু কে থামাবে জীবনযুদ্ধ। পরিণতি যা হওয়ার তা-ই হবে। তবু বলব, মানুষের আকাক্সক্ষার পরিণতি সম্পর্কে আরো গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা উচিত। কারণ, সুখশান্তি ও সাফল্যই মূল কথা। তাই বলে অপরকে মেরে নিজে সুখী হওয়ার ধারণা কি সঠিক?
মানুষের কষ্ট লাঘব করে আনন্দ পাওয়া, মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থেকে পরোপকারের ত্যাগে দৃষ্টান্ত রেখে দায়িত্ব কর্তব্যের ভারমুক্ত হওয়া- এসব গুণাবলি মানুষকে যথার্থ অর্থে মহীয়ান করে তোলে। হৃদয় প্রাচুর্য এবং বিবেক ঐশ্বর্য প্রকৃত মুমিন বা বিশ্বাসীর ভূষণ- তা আমরা ক’জন জানি, বুঝি আর মানি? এ প্রসঙ্গে ইংরেজ কবি শেলির দুটো পঙ্ক্তি প্রণিধানযোগ্য:
‘For the love beauty and delight
There are no death, nor change.’
এর মানে ভালোবাসা, সৌন্দর্য এবং আনন্দের মৃত্যুও নেই, পরিবর্তনও নেই। এর তাৎপর্য হচ্ছে, মানুষের জীবনের সার্থকতা ভালোবাসা সৌন্দর্য ও আনন্দ নিয়েই। এ তিনটি গুণ ও বৈশিষ্ট্য ধারণ করে নিজেকে এবং সবাইকে ভালো রাখার চেষ্টা- সাধনার মাঝেই ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রকৃত সুখ পরিতৃপ্তি নিহিত।
মানবতাবোধ জাগ্রত করার আকাক্সক্ষা মানুষের অধরাই থেকে যাচ্ছে? কেন? মানুষের জীবনে অতি লোভ, অতি ভোগ এবং অপচয় নিজের ও অপরের সর্বনাশ ডেকে আনছে। অপচয় সম্পর্কে কুরআনের ভাষ্য হচ্ছে- ‘অপচয়কারী শয়তানের ভাই।’ আর এ শয়তান হচ্ছে যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি। ভোগের সামগ্রী অর্জনের জন্যে মানবীয় গুণাবলিসমূহ বিসর্জন দেবার কোনো যৌক্তিকতা নেই। জানি, মুনাফালোভী ও সুবিধাবাদীগণ এ আপ্তবাক্য মানবেন না। চূড়ান্ত অর্থে সুখের জন্যে মানতেই হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা লাভে সচেষ্ট বুদ্ধিমান- কৌশলীরা কি মানবেন? মানবতার ‘সাধারণ স্বার্থ’ প্রতিষ্ঠার উপায় কি?
আমরা কেন এত কথা বলি? তার চেয়ে কাজ যদি বেশি করতাম?