টানা একাদশ রাতে ইরানে মার্কিন হামলা
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা টানা একাদশ রাতের মতো ইরানের বিরুদ্ধে আকাশ হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে ‘ইরানের হুমকি দেয়ার সক্ষমতা আরো কমানোর’ লক্ষ্যে এসব হামলা চালানো হয়েছে।
এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানের স্থানীয় সময় বুধবার ভোররাতে মার্কিন বাহিনী ‘ইরানের সামরিক অভিযান কেন্দ্র, সামুদ্রিক সক্ষমতা, বিমান রাখার হ্যাঙ্গার, ড্রোনের গুদাম ও সামরিক সরবরাহ অবকাঠামোতে’ হামলা চালিয়েছে।
প্রায় ৭৫ মিনিট ধরে এসব হামলা চালানো হয়েছে আর এদিনের মতো অভিযান শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা। তেহরান থেকে আলজাজিরার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ইরানের রাজধানীজুড়ে ব্যাপক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে আর তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম সক্রিয় ছিল।
ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের বুশেহর কিছু অংশে, সিরিক শহরের আশপাশে বেশ কিছু বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটির দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর বার্তা সংস্থা ফার্সকে জানিয়েছেন, বেহবাহান ও ওমিদিয়েহ শহরের নিকটবর্তী এলাকাগুলোকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যস্থল করা হয়।
ফার্স জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী ইরানের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের তাব্রিজ শহরের প্রান্তে সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে। স্থানীয় সময় রাত ২টা ৪০ মিনিটে এসব হামলা চালানো হয় এবং শহরের নিকটবর্তী একটি সামরিক জোনে আঘাত হানে। তবে শহরের ভেতরে কোনো হামলা হয়নি। তেহরান ও তাব্রিজে হামলার মধ্য দিয়ে সম্প্রতি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে হরমুজ প্রণালীর আশপাশের এলাকাগুলোতে হামলা চালানোর যে প্রবণতা দেখাচ্ছিল মার্কিন বাহিনী, তা থেকে তারা সরছে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। এর পাশাপাশি হামলা চালানো সময়ও আগের তুলনায় কমে এসেছে। আগেরদিন মঙ্গলবার রাতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে হামলা চালিয়েছিল মার্কিন বাহিনী, সেই তুলনায় এদিন হামলার সময় ছিল মাত্র সোয়া এক ঘণ্টা। বুধবার ভোরে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের এয়ার ডিফেন্স ইরানের একটি ড্রোন হামলা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছে। চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ইরানে ফের হামলা শুরু করার পর থেকে কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, ইরাক ও জর্দানে মার্কিন বাহিনীর ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়ে আসছে তেহরান। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এসব পাল্টা হামলা অন্তত তিনজন মার্কিন সেনা নিহত ও আরো শতাধিক আহত হয়েছে বলে পেন্টাগন জানিয়েছে।
আলোচনায় এখনো ইচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্র : রুবিও
ইরান সঙ্কটের কূটনৈতিক সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে তার অভিযোগ, ইরান আলোচনায় আন্তরিক নয়। একই সময়ে সঙ্ঘাতের ব্যাপকতা বিশ্বের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বুধবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে রুবিও ওই কথা বলেন।
রুবিওর এই মন্তব্যের একদিন আগে ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীদের হুমকির মুখে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেলবাহী তিনটি ট্যাংকার লোহিত সাগর থেকে এশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা বাতিল করে ফিরে যায়। লোহিত সাগরের প্রবেশমুখের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইয়েমেনের হাউছিরা সোমবার সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। এতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই যুদ্ধে উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ইরান আগে থেকেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে হুমকি দিয়ে আসছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের দৈনিক লাখ লাখ ব্যারেল তেল রফতানির প্রধান বিকল্প পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে লোহিত সাগর।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরান ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব পেয়েছে। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সই হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তি টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
তাছাড়া ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইস্কান্দার মোমেনি মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান সফর করে ইসলামাবাদকে কূটনৈতিক চেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে থাকলেও ইরানের অবস্থান নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে। “আমাদের এখনকার সমস্যা হল, তারা আলোচনায় আন্তরিক নয়। তারা যদি আন্তরিক হয়, আমরাও আন্তরিক। আর যদি তারা তা না হয়, তাহলে আমরা নিজেদের এবং মিত্রদের স্বার্থ রক্ষায় যা প্রয়োজন সেটিই করব,” বলেন রুবিও।
তিনি বলেন, ইরানকে কোনোভাবেই হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করতে দেয়া যাবে না। এটি হলে বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক নজির তৈরি হবে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য, যাদের অনেকের দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সাথে ভূখণ্ডগত বিরোধ আছে। রুবিওর মতে, “পশ্চিম এশিয়ায় যদি আমরা এমন কোনো নজির তৈরি করি যে, একটি দেশ সিদ্ধান্ত নেবে তারা আন্তর্জাতিক জলপথ নিয়ন্ত্রণ করবে, টোল আদায় করবে, আর টোল না দিলে জাহাজ উড়িয়ে দেবে, তাহলে এটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হবে। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে, এমনকি এই অঞ্চলেও এর পুনরাবৃত্তি হবে।”