বৈশ্বিক ক্ষুধা প্রতিবেদন

বিশ্ব আগের চেয়ে বেশি অপুষ্টি ও দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গত বছর বিশ্বে তীব্র ক্ষুধার বেশির ভাগের কারণ ছিল সঙ্ঘাত ও সহিংসতা, যা প্রায় ১৫ কোটি মানুষকে অনাহারে রেখেছে। গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস (জিআরএফসি) ২০২৬ অনুসারে, গত বছর বিশ্বে গাজা উপত্যকা এবং সুদানের কিছু এলাকায় দুর্ভিক্ষময় পরিস্থিতি ছিল। ১৮টি মানবিক ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার একটি জোটের এই বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, খাদ্যসঙ্কটে থাকা ৪৭টি দেশ ও অঞ্চলে গত বছর তাদের জনসংখ্যার ২২.৯ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ২৬৬ মিলিয়ন মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়, যা ২০২৪ সালের ২২.৭ শতাংশের তুলনায় সামান্য বেশি হলেও ২০১৬ সালে রেকর্ড করা ১১.৩ শতাংশের প্রায় দ্বিগুণ।

২০২০ সাল থেকে প্রতি বছরই তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়া জনসংখ্যার অনুপাত ২০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। প্রকৃত অর্থে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ২০১৬ সালের ১০৮ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২৬৫.৭ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ২৮১.৬ মিলিয়নে পৌঁছেছিল। জিআরএফসি সতর্ক করেছে যে, ২০২৪ সালের তুলনায় মূল পরিসংখ্যানটি সামান্য কম হওয়ার কারণ চাহিদার কোনো প্রকৃত হ্রাস নয়, বরং আওতাভুক্ত দেশের সংখ্যা ৫৩ থেকে কমে ৪৭ হওয়া।

দুর্ভিক্ষ, মহাবিপর্যয় ও জরুরি অবস্থা

দুর্ভিক্ষ-ক্ষুধা পর্যবেক্ষণকারী সমন্বিত খাদ্যনিরাপত্তা পর্যায় শ্রেণিবিন্যাস (আইপিসি) পদ্ধতির অধীনে সর্বোচ্চ শ্রেণিবিভাগ হিসেবে গত বছর গাজা উপত্যকা এবং সুদানের কিছু অংশে নিশ্চিত করা হয়েছিল। গাজা, সুদান ও দক্ষিণ সুদানের অন্যান্য অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বিদ্যমান ছিল এবং সেই পূর্বাভাস এ বছরেও অব্যাহত রয়েছে।

আইপিসি অনুসারে, দুর্ভিক্ষ হয় যখন

কমপক্ষে ২০ শতাংশ পরিবার চরম খাদ্যসঙ্কটের সম্মুখীন হয়। তীব্র অপুষ্টিতে জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের বেশি প্রভাবিত হয়। অনাহার বা ক্ষুধা-সম্পর্কিত কারণে মৃত্যুর হার প্রতিদিন প্রতি ১০ হাজার জনে দুইজনের বেশি হয়। ছয়টি দেশ ও অঞ্চলের জনসংখ্যা “মহাবিপর্যয়কর পরিস্থিতি”র মধ্যে ছিল, যা আইপিসির খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শ্রেণিবিন্যাসের সর্বোচ্চ স্তর। তাদের সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ, যা ২০১৬ সালের তুলনায় নয় গুণেরও বেশি। গাজা উপত্যকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যেখানে ৬ লাখ ৪০ হাজার ৭০০ জন মানুষ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয়েছিল, যা দেশটির জনসংখ্যার ৩২ শতাংশের সমান এবং এটি বিশ্বব্যাপী নথিভুক্ত সর্বোচ্চ হার। এর পরেই ছিল সুদান, যেখানে ৬ লাখ ৩৭ হাজার ২০০ জন মানুষ বা দেশটির জনসংখ্যার ১ শতাংশ এই দুর্ভিক্ষের শিকার।

অন্য চারটি দেশে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয়াবহ খাদ্যসঙ্কট দেখা দিয়েছে : দক্ষিণ সুদান ৮৩ হাজার ৫০০ (জনসংখ্যার ১ শতাংশ), ইয়েমেন ৪১ হাজার ২০০ (০.১ শতাংশ), হাইতি ৮ হাজার ৪০০ (০.১ শতাংশ) এবং মালি ২ হাজার ৬০০ (০.০১ শতাংশ)। এ ছাড়াও ৩২টি দেশের ৩৯ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ চতুর্থ পর্যায় বা জরুরি অবস্থার মধ্যে ছিল, যা বিশ্লেষিত জনসংখ্যার ৩.৮ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের তুলনায় এটি একটি সামান্য বৃদ্ধি।

সঙ্ঘাতই ক্ষুধার প্রধান চালিকাশক্তি

১৯টি দেশে সংঘাত ও সহিংসতা ছিল তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার প্রধান কারণ, যেখানে ১৪৭.৪ মিলিয়ন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী তীব্র ক্ষুধার সম্মুখীন হওয়া মানুষের অর্ধেকেরও বেশি ছিল এসব দেশের মানুষ। ১৬টি দেশে চরম আবহাওয়া ছিল প্রধান চালিকাশক্তি, যা ৮৭.৫ মিলিয়ন মানুষকে প্রভাবিত করেছে, অন্য দিকে ১২টি দেশে অর্থনৈতিক ধাক্কা প্রধান কারণ ছিল, যেখানে ২৯.৮ মিলিয়ন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে, খাদ্যসঙ্কটে থাকা অঞ্চলগুলোর জন্য মানবিক ও উন্নয়নমূলক অর্থায়ন গত বছর হ্রাস পেয়েছে, যা ২০১৬-২০১৭ সালের স্তরে নেমে এসেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ২০২৬ সালের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, মার্চ মাসের আংশিক চিত্রের ভিত্তিতে, একাধিক ক্ষেত্রে তীব্রতার মাত্রা সঙ্কটজনক রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাতের বৃদ্ধি খাদ্য সঙ্কটে থাকা দেশগুলোকে বৈশ্বিক কৃষি ও খাদ্যবাজারের ব্যাঘাতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের একটি প্রজন্ম

২০২৫ সাল নাগাদ পুষ্টি সঙ্কটে থাকা ২৩টি দেশে আনুমানিক ৩.৫৫ কোটি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল, যার মধ্যে প্রায় ১.০ কোটি শিশু মারাত্মক তীব্র অপুষ্টিতে (যা সবচেয়ে প্রাণঘাতী রূপ) আক্রান্ত ছিল। আরো ২.৫৭ কোটি শিশু মাঝারি তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল। তথ্য প্রাপ্ত ২১টি দেশে প্রায় ৯২ লাখ গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী নারীও তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিলেন।

খাদ্যসঙ্কটগ্রস্ত দেশগুলোতেই বাস্তুচ্যুতি

২০২৫ সাল নাগাদ অন্তর্ভুক্ত ৪৬টি দেশে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা সামান্য কমে ৮.৫১ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৬.২৬ কোটি মানুষ ৩৪টি দেশে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত এবং ২.২৫ কোটি মানুষ ৪৪টি দেশে শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী ছিল।

ক্ষুধার কাঠামোগত কারণগুলো মোকাবেলায় ধারাবাহিক উদ্যোগ না নিলে, বিশ্বের সবচেয়ে নাজুক দেশগুলো ২০২৬ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক ক্ষুধার বোঝার একটি অসম অংশ বহন করতে থাকবে বলে প্রতিবেদনে উপসংহার টানা হয়েছে।