পিলখানা শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও নিরাপত্তা কাঠামো আধুনিকায়নের অঙ্গীকার

বিচার, স্মৃতি সংরক্ষণ ও সীমান্ত বাহিনী শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রীর

Printed Edition
first-2
জাতীয় শহীদ সেনা দিবসের মতবিনিময় সভায় দোয়ায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ অতিথিরা : পিআইডি

বিশেষ সংবাদদাতা

২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছর পূর্তিতে শহীদ সেনাকর্মকর্তাদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, পিলখানার ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। ইতিহাসে যথাযথ স্বীকৃতি না দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

রাজধানীর পিলখানা (বিডিআর সদর দফতর) প্রাঙ্গণে গতকাল আয়োজিত স্মরণসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধান, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক, শহীদ পরিবার এবং সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

‘একটি জাতির হৃদয়ে রক্তাক্ত স্মৃতি’ : বক্তৃতার শুরুতে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন ও ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণ করেন। বিশেষভাবে উল্লেখ করেন ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারির সেই নৃশংস ঘটনায় নিহত ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনের আত্মত্যাগ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি নাম একটি পরিবারের আলো নিভে যাওয়ার গল্প। একটি সন্তানের পিতৃহীন হওয়ার ইতিহাস, একটি স্বপ্নের অসমাপ্ত মহাকাব্য। তিনি জানান, দেশে ফেরার পর বনানী সামরিক কবরস্থানে গিয়ে শহীদদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে পরিবারের দীর্ঘ ১৭ বছরের বেদনা ও বিচারহীনতার যন্ত্রণা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ : ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয়ভাবে স্মরণীয় করে রাখতে সরকার আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি গ্রহণ করবে বলে ঘোষণা দিয়ে তিনি সেনাবাহিনীর সাথে আলোচনা করে স্মৃতি সংরক্ষণ, স্মারক নির্মাণ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির উদ্যোগ নেয়ার কথা বলেন। তার ভাষায়, এই দিনগুলোকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বীকৃতি না দিলে আমরা ইতিহাসের কাছে দায়ী থাকব।

সীমান্ত বাহিনী পুনর্গঠন ও আধুনিকায়ন : সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ঐতিহাসিক অবদান তুলে ধরে তিনি বলেন, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই এই বাহিনী সেনাবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে। ভবিষ্যতে এই বাহিনীকে আরো আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও পেশাদার করে গড়ে তোলা হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন; আধুনিক প্রশিক্ষণ; যোগ্য অফিসার প্রেষণ বৃদ্ধি; সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার- এসবের মাধ্যমে বাহিনীকে শক্তিশালী করা হবে।

জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা : প্রধানমন্ত্রী বলেন, পিলখানার মর্মান্তিক ঘটনা জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতা উন্মোচিত করেছিল। তাই আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কাঠামো আধুনিক ও সময়োপযোগী করা হবে।

তিনি এটিকে সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাতের একটি অপপ্রয়াস হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে গোয়েন্দা, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করা হবে।

শহীদ পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা : শহীদ পরিবারগুলোর কল্যাণে শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালুর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

আবেগঘন সমাপ্তি : রমজানের আত্মশুদ্ধির শিক্ষা স্মরণ করে তিনি শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সবার সহযোগিতা চান। বক্তৃতার শেষাংশে বলেন- আল্লাহ আমাদের দেশকে হেফাজত করুন। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

পিলখানা ট্র্যাজেডির দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও নিরাপত্তা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এই তিনটি বার্তাই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সবচেয়ে জোরালোভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে বলে উপস্থিতদের অভিমত।