পাটুয়াটুলী জামে মসজিদের শতবর্ষী ইতিহাস ও সম্প্রীতির ইফতার

Printed Edition
Back------5
পাটুয়াটুলী জামে মসজিদের শতবর্ষী ইতিহাস ও সম্প্রীতির ইফতার

হাবিবুল বাশার

পুরান ঢাকার সদরঘাট ও ইসলামপুর রোড-সংলগ্ন পাটুয়াটুলী এলাকাটি যেমন বাণিজ্যিক ব্যস্ততার জন্য পরিচিত, তেমনি এর অলিগলিতে মিশে আছে শত বছরের পুরনো ইতিহাস। এই ইতিহাসের অন্যতম এক জীবন্ত সাক্ষী ‘পাটুয়াটুলী জামে মসজিদ’। বুড়িগঙ্গার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদটি কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের সামাজিক ও ধর্মীয় বিবর্তনের এক অনন্য দলিল। সাম্প্রতিক সময়ে এই মসজিদের ইফতার আয়োজন পুরান ঢাকার অন্যতম বৃহৎ ও বৈচিত্র্যের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

মসজিদটির সঠিক নির্মাণ সাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ থাকলেও, অধিকাংশের মতে এটি ১৮ শ’ শতাব্দীর শেষভাগে বা ১৯ শ’ শতাব্দীর শুরুর দিকে নির্মিত হয়েছে। এলাকাটি একসময় ‘পটুয়া’ বা চিত্রকরদের বসবাসের স্থান ছিল বলে এর নাম হয় পাটুয়াটুলী, আর সেই নামেই পরিচিতি পায় এই মসজিদটি।

এটি কোনো রাজকীয় স্থাপনা ছিল না; বরং স্থানীয় ধর্মপ্রাণ ব্যবসায়ী এবং পটুয়া সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের যৌথ উদ্যোগে এটি একটি ‘মহল্লা মসজিদ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মসজিদের আদি কাঠামোতে মুঘল স্থাপত্যের গম্বুজ ও খিলানের ছাপ ছিল।

সময়ের প্রয়োজনে এবং মুসল্লিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদটি কয়েক দফায় সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বর্তমানে এটি একটি বিশাল বহুতল কমপ্লেক্সে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে আধুনিক স্থাপত্যের সাথে ঐতিহ্যের এক সুন্দর সংমিশ্রণ দেখা যায়।

ইফতারের মেনু ও ব্যবস্থাপনা

পুরান ঢাকার ইফতার মানেই এক রাজকীয় আমেজ। পাটুয়াটুলী জামে মসজিদে ইফতারের মেনুতে পুষ্টি ও স্বাদের এক অপূর্ব সমন্বয় থাকে। মাদরাসা শিক্ষা সচিব ও মসজিদের হিসাব প্রধান আবদুর রশিদ বলেন, আমাদের এখানে প্রতিদিন প্রায় ৪৩০ থেকে ৪৫০ জনের নিয়মিত ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। ইফতারের প্লেটে আমরা বৈচিত্র্য রাখতে সচেষ্ট থাকি। পেঁপে, আপেল, কমলা, আনারস এবং মাল্টার মতো তাজা ফল থাকে প্রতিদিন।

আলুর চপ, বেগুনি, জিলাপি, মুড়ি ভর্তা এবং বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি ছোলা বুট। ক্লান্তি দূর করতে পরিবেশন করা হয় বিশেষ জিলাপির শরবত।

ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও ইফতারে অংশগ্রহণকারীদের বৈচিত্র্য

এই মসজিদের ইফতার আয়োজন কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে ইফতারের দস্তরখান যেন এক অখণ্ড সম্প্রীতির প্রতিচ্ছবি।

মসজিদের খাদেমদের তথ্যমতে, এখানে স্থানীয় ব্যবসায়ী মুসল্লিদের পাশাপাশি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেন। এ ছাড়া আশপাশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ এবং অত্র মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও একই দস্তরখানে বসে ইফতার করেন।

ইফতারের জন্য মসজিদের একটি সম্পূর্ণ আলাদা তহবিল রয়েছে। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, স্থানীয় মুসল্লি এবং মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যরা এই ফান্ডের মূল জোগানদাতা। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত আর্থিক সহযোগিতায় প্রতিদিন শত শত মানুষের আহারের সংস্থান হয়।

ঐতিহাসিকভাবে এই মসজিদটি মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ:) এবং হাফেজ্জী হুজুরের (রহ:) মতো মহান আলেমদের আদর্শে অনুপ্রাণিত ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে, যা এই মসজিদের ধর্মীয় গাম্ভীর্যকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকার কোলাহলের মধ্যে পাটুয়াটুলী জামে মসজিদ যেন এক প্রশান্তির নীড়। শত বছরের পুরনো এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি তার স্থাপত্যশৈলী, বিজ্ঞ আলেমদের দিকনির্দেশনা এবং ইফতারের এই বিশাল মানবিক আয়োজনের মাধ্যমে আজও পুরান ঢাকার গৌরবের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে প্রতিদিনের ইফতার আয়োজন কেবল ক্ষুধা নিবারণ নয়, বরং মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার এক অনন্য শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।