বস্তুনিষ্ঠতার সাহসী অভিযাত্রা : গৌরব ঐতিহ্যের পঞ্চান্ন বছরে জাবিসাস

Printed Edition

আতাউর রহমান জাবি

স্বাধীনতার পরপরই, ১৯৭২ সালের ৩ এপ্রিল। একটি স্বপ্ন, একটি প্রত্যয় এবং সত্য বলার অদম্য সাহস নিয়ে যাত্রা শুরু করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (জাবিসাস)। আলবেরুনী হল ক্যান্টিনের কয়েকটি চেয়ার-টেবিল ঘিরে সাতজন স্বপ্নবাজ তরুণের হাত ধরে শুরু হওয়া সেই পথচলা আজ অর্ধশতক পেরিয়ে গৌরব-ঐতিহ্যের পঞ্চান্ন বছরে পদার্পণ করেছে। ক্যাম্পাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠিত প্রথম সাংবাদিক সংগঠনটি সময়ের নানা ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে বর্তমানে দেশের ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার এক অনন্য প্রতীক।

প্রতিষ্ঠালগ্নে পরিসংখ্যান বিভাগের রাশেদ আহমেদ আলীকে সভাপতি এবং অর্থনীতি বিভাগের আবুল কাসেমকে সাধারণ সম্পাদক করে প্রথম কমিটি গঠিত হয়। তৎকালীন ভিসি প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর সহযোগিতায় সংগঠনটি দ্রুতই একটি শক্ত ভিত গড়ে তোলে। শুরু থেকেই ‘সত্য যত তিক্তই হোক, তা বলতে হবে দেশ ও জাতির কল্যাণে’ এই আদর্শকে ধারণ করে বস্তুনিষ্ঠতা, পেশাদারিত্ব ও আপসহীনতার পথে এগিয়ে চলেছে জাবিসাস।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে সংগঠনটির ভূমিকা বরাবরই অগ্রগণ্য। ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান সব ক্ষেত্রেই জাবিসাস দায়িত্বশীল ও সাহসী ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, যেখানে জাবিসাসের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে এই পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। সত্য প্রকাশের কারণে বহুবার ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়তে হয়েছে সংগঠনটির সদস্যদের। ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ ও সহিংসতার মধ্যেও জাবিসাস সদস্যরা দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি। হামলায় আহত হওয়ার পরও তারা তথ্য সংগ্রহ ও সংবাদ পরিবেশন অব্যাহত রাখেন। এই দৃঢ়তা ও পেশাদারিত্বই জাবিসাসকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বস্তুনিষ্ঠতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি। আন্দোলনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অবদান তুলে ধরতে এবং তা সংরক্ষণে জাবিসাস প্রকাশ করেছে ‘অরুণোদয়’ শীর্ষক একটি স্যুভেনির, যা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জাবিসাস কেবল সাংবাদিক সংগঠন নয়; এটি একটি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মও। এখানে নিয়মিত সেমিনার, কর্মশালা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং তথ্যচিত্র নির্মাণসহ নানা সৃজনশীল আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করতে প্রতি বছর প্রদান করা হয় ‘সেরা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার’, যা নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের অনুপ্রাণিত করে। পাশাপাশি সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচির আয়োজন করে সংগঠনটি। ফ্যাসিবাদ পতনের পর জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতাবিষয়ক সেমিনার আয়োজনও জাবিসাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ।

এ ছাড়া প্রতি বছর সদস্যদের নিয়ে শিক্ষামূলক ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ‘জাবিসাস সার্ক ট্যুর ২০২৬’এর অংশ হিসেবে ২০ জন সদস্য নেপালে শিক্ষা ও বিনোদনমূলক সফরে অংশ নেন। সেখানে ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সঙ্গে একটি সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয় এবং বিভিন্ন বিভাগের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন সদস্যরা।

সংগঠনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর গণতান্ত্রিক কাঠামো। সদস্যদের সরাসরি ভোটে নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত হয় যা দেশের ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখান থেকে উঠে আসা অনেকেই আজ দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।

জাবিসাসের সাধারণ সম্পাদক রাজিব রায়হান বলেন, দীর্ঘ পথচলায় জাবিসাস শুধু সংবাদ পরিবেশনই করেনি, বরং বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যের সন্ধানে ক্যাম্পাসের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল ভাবমূর্তি তুলে ধরতে আমাদের কলম সবসময় সচল ছিল। ভবিষ্যতেও এই নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতার ধারা বজায় রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর।

সংগঠনের সভাপতি মাহ্ আলম বলেন, জাবিসাস শুধু একটি সংগঠন নয়, এটি পঞ্চান্ন বছরের এক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। অতীতের মতোই ভবিষ্যতেও ক্যাম্পাসের সব অন্যায়, অবিচার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান দৃঢ় থাকবে। সত্য, ন্যায় ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চার পাশাপাশি সৃজনশীলতা ও মুক্তচিন্তার বিকাশে জাবিসাস অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। শিক্ষার্থীদের কাছে এটি শুধু একটি সংগঠন নয় সত্য, ন্যায় ও সাহসের প্রতীক। সময়ের পরিবর্তনে চ্যালেঞ্জের ধরন বদলালেও জাবিসাসের আদর্শ অপরিবর্তিত। আগামীতেও এই ধারা অটুট রেখে জাবিসাস বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার শক্ত ভিত আরো সুদৃঢ় করবে।