ফের ৩০০ কোটি টাকার নিচে ডিএসইর লেনদেন
পুঁজিবাজার দু’টির লেনদেনের একটি বড় সময় ধরে নেতিবাচক অবস্থা ছিল
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
দিনভর সূচকের নেতিবাচক প্রবণতায় দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন আবারো নেমে এসেছে ৩০০ কোটি টাকার নিচে। গতকাল পুঁজিবাজারটি ২৯৩ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে। এর আগে সর্বশেষ গত ৭ ডিসেম্বর ৩০০ কোটির নিচে ছিল ডিএসইর লেনদেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি করলে বাজারে বিক্রয়চাপ যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন তারা। গত এক সপ্তাহে টানা পতন ঘটে সূচকের। এরই জেরে বাজারের লেনদেনের এ অবনতি ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগের সপ্তাহের নেতিবাচক প্রবনতার রেশ ধরে গতকাল পুঁজিবাজার দু’টির লেনদেনের একটি বড় সময় ধরে নেতিবাচক অবস্থা ছিল। লেনদেনের শুরুতেই বড় ধরনের সূচক হারায় দুই বাজার। তবে পরবর্তিতে বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে কিছুক্ষণের মধ্যে হারানো সূচকের একটি অংশ ফিরে আসে। তবে দিনের বাকি সময় বড় ধরনের বিক্রয়চাপ না থাকলেও সূচকের নেতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত ছিল। এরই মধ্যে লেনদেন শেষ হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে হঠাৎ ঊর্ধ্বমুখী রূপ নেয় বাজার সূচক। এতে হারানো সূচকের একটি বড় অংশ ফিরে পেলেও লেনদেন খুব বেশি আগায়নি।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪ দশমিক ৯৪ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। চার হাজার ৮৩১ দশমিক ৪১ পয়েন্ট থেকে শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে চার হাজার ৮২৬ দশমিক ৪৭ পয়েন্টে। তবে লেনদেন শুরুর প্রথম ১০ মিনিটেই প্রধান সূচকটির ৪২ পয়েন্ট হারায় ডিএসই। সকাল ১০টা ১০ মিনিটে সূচকটি নেমে আসে চার হাজার ৭৮৯ পয়েন্টে। তবে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহন বাড়লে দ্রুত এ চাপ কিছুটা সামলে নেয় বাজারটি। কিন্তু বেলা দেড়টার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সূচকের ২০ পয়েন্ট অবনতিতেই আটকে ছিল বাজার। কিন্তু দেড়টার পর হঠাৎ ঊর্ধ্বমুখী রূপ নেয় সূচক। ২টার পর সূচকটি পৌঁছে যায় চার হাজার ৮৪৪ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় ১৩ পয়েন্ট। কিন্তু দিনের সমন্বয়শেষে চার হাজার ৮২৬ দশমিক ৪৭ পয়েন্টে স্থির হয় ডিএসই সূচক। একই সময় দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৬ দশমিক ২৬ ও ১ দশমিক ৭১ পয়েন্ট।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৬৬ দশমিক ১১ পয়েন্ট হারায়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৬১ দশমিক ৯৬ ও ৩৮ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তারা মনে করেন, গত দু’দিনের চলতে থাকা দেশের অস্থিরতাকে সামনে রেখে গতকাল দিনের শুরুতে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ বিক্রয়চাপ তৈরি করলে সূচকের বড় ধরনের পতন ঘটে। কিন্তু পরবর্তিতে ক্রমান্বয়ে এ চাপ হ্রাস পায়। এমনকি লেনদেনের শেষদিকে এসে বাজার সূচকের ঊর্ধ্বমুখীপ্রবণতা প্রমাণ করে এ মুহূর্তে বাজার ভালো আচরণের জন্য মুখিয়ে আছে। বিনিয়োগকারীরা নিজেদের পুঁজি রক্ষায় সচেষ্ট থাকলে বাজারগুলো প্রতিদিন দরপতনের শিকার হতোনা। অথচ অল্পতেই তার আতঙ্কিত হয়ে হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে। এতে দিনশেষে লোকসান গুনতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীদেরই। অথচ একটু বিচার বিশ্লেষণ করলেই বুঝা কঠিন নয় যে, এ মুহূর্তে পুঁজিবাজারের মূল্যস্তর আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বিনিয়োগ উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। তাই পুঁজিবাজার থেকে যদি কেউ লাভবান হতে চান তার উচিত বিক্রি নয়, এ মুহূর্তে দরকার শেয়ার কেনা এবং ধৈর্য ধরা।
দিনের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য খাতগুলোর আচরণ বেশ ভালো ছিল গতকাল। বিশেষ করে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো শুরুর দিকে দরপতনের শিকার হলেও শেষদিকে এসে এগুলোই দ্রুত হারানো দর ফিরে পায়। তবে অন্যান্য দিনের মতো গতকালও মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ অবস্থানে স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোর স্পষ্ট প্রাধান্য ছিল। এর বাইরে সব খাতের অপেক্ষাকৃত ভাল কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগকারিদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। এটাই দিনশেষে হারানো সূচক ফিরে পেতে সাহায্য করে।
গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল খাদ্য খাতের রহিমা ফুড করপোরেশন। কোম্পানিটি একটি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গ্রুপের সাথে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয়ায় বিনিয়োগকারীরা এতে অংশগ্রহণ বাড়ালে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে। ১২ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় কোম্পানিটির আট লাখ ৬৯ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১১ কোটি ৯৫ লাখ টাকায় ৪১ লাখ ৬৫ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল প্রকৌশল খাতের ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সিমটেক্স ইনন্ডাস্ট্রিজ, ফাইন ফুডস, সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, মুন্নু ফেব্রিক্স, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, লাভেলো আইসক্রিম, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্ট ও আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং।
ডিএসইতে দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল বস্ত্র খাতের কোম্পানি রহিম টেক্সটাইল। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ১০ শতাংশ। ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল রহিমা ফুড করপোরেশন। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে দেশ গার্মেন্ট, রানার অটোমোবাইলস, বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার, ডরিন পাওয়ার, গোল্ডেন হারভেস্ট, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও কাট্টলি টেক্সটাইলস।
গতকাল ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে ছিল বস্ত্র খাতের কোম্পানি ফ্যামিলিটেক্স। ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। এ ছাড়া ৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ দর হারিয়ে একই খাতের মেট্রো স্পিনিং উঠে আসে দ্বিতীয় অবস্থানে। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল বে লিজিং, সিএপিএম বিডিবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, বিআইএফসি, ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি এএমসিএল সেকেন্ড মিউচুয়াল ফান্ড, আজিজ পাইপ, প্যাসিফিক ডেনিমস ও সি অ্যান্ড এ টেক্সটাইলস।