স্বচ্ছ ব্যাংকিং ও শক্তিশালী ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন দিকনির্দেশনা

সংস্কারের রোডম্যাপে আইএমএফের চাপ

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে আরো স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং দক্ষ করে তুলতে একটি সুস্পষ্ট ও সময়সীমাবদ্ধ সংস্কার রোডম্যাপ চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। সংস্থাটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এই পরিকল্পনাটি লিখিত আকারে জমা দিতে বলেছে, যা দেশের আর্থিক খাত সংস্কারের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সাথে বৈঠক করে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল। এ বৈঠকে দেশের ব্যাংকিং খাতের চলমান সংস্কার, সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে আইএমএফ বাংলাদেশের আর্থিক খাতে চলমান সংস্কার উদ্যোগের অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করলেও, পুরো প্রক্রিয়াকে আরো কাঠামোবদ্ধ ও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেয়। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, ঋণ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং নীতিগত সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর তাগিদ

আইএমএফ মনে করে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছতার ঘাটতি, খেলাপি ঋণের চাপ এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স দুর্বলতার মতো সমস্যাগুলো বিদ্যমান। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা জরুরি। সংস্থাটির মতে, একটি লিখিত রোডম্যাপ থাকলে তা শুধু নীতিনির্ধারকদের জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে না, বরং বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা দেবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসবে।

ঋণ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব : বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো খেলাপি ঋণের উচ্চ হার। আইএমএফ মনে করে, ঋণ অনুমোদন, বিতরণ এবং পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, যা আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে সংস্থাটি ঋণ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন, ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতি উন্নত করা এবং ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছে। একই সাথে খেলাপি ঋণ কমাতে কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হার

বৈঠকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং বিনিময় হারকে আরো বাজারভিত্তিক করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছে আইএমএফ। বিশেষ করে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো কার্যকর হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করার মাধ্যমে রফতানি প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহও বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।

ঋণ কর্মসূচির ভবিষ্যৎ ও পরবর্তী কিস্তি

বৈঠক প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র ও পরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সংস্থাটির স্প্রিং মিটিংয়ের পর নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, এর আগে একটি রিভিউ মিশন বাংলাদেশ সফর করবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সংস্কারের অগ্রগতি মূল্যায়ন করবে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। উল্লেখ্য, আইএমএফের সাথে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের জুনে এ কর্মসূচির পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে প্রায় ৩৬৪ কোটি ডলার, বাকি রয়েছে ১৮৬ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি, যা সংস্কার অগ্রগতির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত বলে মনে করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বৈঠক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব

আগামী মাসে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক। এ বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো: মোস্তাকুর রহমান এবং অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদারের অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠক বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানেই আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, সংস্কারের অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার বিষয়গুলো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে।

সংস্কারের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অর্থনৈতিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে আইএমএফের সাথে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এই সফরকে এক দিকে সৌজন্য সাক্ষাৎ, অন্য দিকে কারিগরি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএমএফের ইতিবাচক মূল্যায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও, পরবর্তী কিস্তি পেতে হলে সংস্কারের গতি ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে।

সামগ্রিকভাবে, আইএমএফের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে আরো আধুনিক, স্বচ্ছ এবং কার্যকর করে তুলতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সময় মতো সংস্কার সম্পন্ন করা। আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে এই রোডম্যাপ তৈরি করে এবং তা বাস্তবায়নে কতটা সফল হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে দেশের আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা।