ডিপ্লোম্যাটিক ফেলিউর বলছেন শিপিং সংশ্লিষ্টরা
৬ বাংলাদেশী জাহাজ আদৌ হরমুজ অতিক্রমের অনুমতি পেয়েছিল
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা চট্টগ্রাম
বাংলার জয়যাত্রাসহ ছয় বাংলাদেশী জাহাজ কি আদৌ হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের অনুমতি পেয়েছিল কি না সে প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। তথ্য বলছে ইরানি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশী জাহাজগুলোকে মৌখিকভাবে হরমুজ অতিক্রমের অনুমতির কথা বললেও বাস্তবে লিখিত অনুমতি মিলেনি। ফলে শিপিং সংশ্লিষ্টদের মতে বাংলাদেশী ছয়টি জাহাজকে হরমুজ অতিক্রমের অনুমতি দিতে সুপারিশ করা হয়েছিল। যা ভুলভাবে হয়তো অনুমতি দেয়া হয়েছে বলা হচ্ছে। বিএসসি সংশ্লিষ্টরাও বিষয়টির সাথে একমত। শিপিং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, এটি আমাদের ডিপ্লোম্যাটিক ফেলিউর। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যহীনতার মাশুল গুনছে ৩১ নাবিকসহ বাংলাদেশী পতাকাবাহী বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি। যুদ্ধ বিরতি শুরুর পর গেল দুই সপ্তাহ ধরে অনুমতি চেয়েও নট অ্যাপ্রুভড রিপ্লাই পেয়ে পারস্য উপসাগরের মিনা সাকরের আন্তর্জাতিক পানিসীমায় নোঙর করে আছে জাহাজটি।
শিপিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলা এবং সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ সামরিক-বেসামরিক নেতৃবৃন্দের মৃত্যুর পর বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে ইরান সন্তুষ্ট নয়। ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি জাহানাবাদি অনেকটা প্রকাশ্যেই বাংলাদেশের বিবৃতিতে তেহরান যে সন্তুষ্ট নয় উল্লেখ করেছে। একই সাথে তিনি বাংলাদেশের অবস্থান সুস্পষ্ট করার কথাও বলেছিলেন। শিপিং সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন- এর মাশুল গুনছেন বাংলাদেশী পতাকাবাহী জাহাজ এবং আমাদের নাবিক-ক্রুরা।
ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত সে সময় বাংলাদেশের ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার অনুমতি দেয়ার কথাও জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন-বিএসসির কর্মকর্তারা সে সময় জানিয়েছিলেন ওই ছয়টি জাহাজের মধ্যে বাংলার জয়যাত্রার নামও রয়েছে।
গত ৮ এপ্রিল বুধবার ভোরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর জাহাজটি সম্ভাব্য তিনটি গন্তব্য সামনে রেখে হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার জন্য অগ্রসর হচ্ছিল। ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাতে হরমুজ থেকে ৬০ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে থাকা অবস্থায় বেতারবার্তায় ইরানের বাহিনীর কাছে অনুমতি চাওয়া হয়। তারা নট অ্যাপ্রুভড বলেছে। পরে দুই সপ্তাহের যুদ্ধ বিরতির মধ্যে হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত ঘোষণা করলে আবার হরমুজের দিকে অগ্রসর হয় বাংলার জয়যাত্রা। কিন্তু আইআরজিসির অনুমতি না পাওয়ায় আবারো আগের অবস্থানে ফিরে যেতে হয়।
এর আগে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে সারবোঝাই করার পর জাহাজটি পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশে অপেক্ষমাণ ছিল দাম্মাম বন্দরে। সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে প্রায় ৩৭ হাজার টন এমওপি সারবোঝাই করে হরমুজ অতিক্রম করে জাহাজটির পরবর্তী গন্তব্য ছিল সাউথ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবানে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোয়িনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরীর মতে এটা আমাদের ডিপ্লোম্যাসির ফেলিউর। ঢাকায় ইরানিয়ান অ্যাম্বাসেডরের কথাতেই সেটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ‘তিনি বলেছেন- এই যুদ্ধে কে ইরানের বন্ধু আর কে বন্ধু নয় সেটা পরিষ্কার হয়ে গেছে।’ মেরিন অফিসারদের এই নেতা দাবি করেন, এখনো চীনা এবং ভারতীয় জাহাজ প্রণালী অতিক্রম করছে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, জাহাজটিকে হরমুজ পার করানোর জন্য ইরানের অনুমোদন পেতে কূটনৈতিক চ্যানেলে জোর তৎপরতা চলছে। জাহাজটি এখন মিনা সাকার-এ আছে, যা হরমুজ প্রণালী থেকে ২০ মাইল দূরে। আমরা ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেলে জোর তৎপরতা চালাচ্ছি। ফরেন মিনিস্ট্রি যেভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে তাতে আমরা আশা রাখি দ্রুতই হরমুজ পার হওয়ার অনুমতি পাবো। কিন্তু ফুল ট্রাস্ট রাখাও তো কঠিন, কয়দিন লাগবে বুঝতে পারছি না। এখন আমরা প্ল্যান করছি শিগগির জাহাজে কিছু পানি ও খাবার ২/১ দিনের মধ্যে দিয়ে দেব। আমরা তৈরি থাকব যখনই ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেলে কাজ হয়ে যাবে, আমরা বের হয়ে চলে আসব।
যে ছয়টি জাহাজের পারমিশন দিয়েছিল সেখানে জয়যাত্রা ছিল কি না এমন প্রশ্নে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, পারমিশনটাতো ভারবাল, মুখেই বলছে, কিন্তু কোথাও লিখিত আসে নাই। লিখিত কেউ আনতে পারে নাই তো। ‘আমার মনে হয় কি- এটা পারমিশন দেয়নি, ছয়টা জাহাজের রিকমেন্ডেশন পাঠিয়েছিল ইরানিয়ান এম্বাসি। বলার সময় বলে ফেলছে পারমিশন দেয়ার কথা। তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্ডারস্ট্যান্ডিংও এরকম আসলে অনুমোদন হয় নাই, কিন্তু বলার সময় বলে ফেলছে। ওই ৬টার মধ্যে এক লাখ টন ক্রুড নিয়ে আটকা পড়া নরডিক পোলাক্স নেই বলেও তিনি জানান।
প্রসঙ্গত কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে পৌঁছায় বাংলার জয়যাত্রা। এর পরদিনই ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালালে সঙ্ঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একই সাথে ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে বিভিন্ন দেশের জাহাজের সাথে বাংলার জয়যাত্রাও আটকা পড়ে। গত ১১ মার্চ জেবেল আলি বন্দরে জাহাজটি থেকে পণ্য খালাস শেষ হয়। সেখানে নোঙররত থাকা অবস্থায় জাহাজটির দুই শ’ মিটারের মধ্যে মিসাইল হামলা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে নিরাপদে জাহাজটি ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসসি। সে অনুযায়ী জাহাজটি হরমুজ প্রণালীর দিকে যাত্রা শুরু করলেও নিরাপত্তার কারণে আগের অবস্থানে ফিরে যেতে হয় জাহাজটিকে। যুদ্ধবিরতির পর আবার যাত্রা শুরু করে দুই দফায় ইরানি ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অনুমতি না পেয়ে মিনা সাকার নোঙর এলাকায় ফিরে যেতে হয় জাহাজটিকে।