অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনকে ঘিরে গুরুত্ব
চ্যালেঞ্জ ও নতুন সূচনার প্রত্যাশা বিএনপির সামনে
Printed Edition
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
দেড় দশকের একচ্ছত্র শাসনের অবসানের পর জনগণের প্রত্য ম্যান্ডেটে গঠিত প্রথম বৈধ সংসদের যাত্রা শুরু হচ্ছে আগামী ১২ মার্চ। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর এটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। দীর্ঘদিন রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা সংসদীয় রাজনীতির ভেতর কিভাবে প্রতিফলিত হয়, সেটিই এখন দেখার অপোয় দেশবাসী।
বহু বছর ধরে একপেশে কার্যক্রমের অভিযোগে সমালোচিত জাতীয় সংসদ এবার নতুন বাস্তবতায় যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংসদে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি হবে নীতি, যুক্তি ও জনস্বার্থের প্রশ্নে। মতবিরোধ ও বিতর্ক থাকলেও সেই বিতর্কই সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত করে তুলবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সংসদীয় প্রক্রিয়া নয়; বরং রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার, ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের প্রত্যাশা এবং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনার দিকনির্দেশনা বহন করতে পারে। বিশেষ করে মতাসীন দল হিসেবে বিএনপির জন্য এই অধিবেশনটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক দিক থেকে চ্যালেঞ্জপূর্ণও।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, প্রথম অধিবেশনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসবে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, রাষ্ট্র সংস্কারসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং জুলাই আন্দোলনের ঘোষিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের অগ্রগতি। যদিও জুলাই সনদের কিছু বিষয় আদালতে বিচারাধীন রিটের ওপর নির্ভর করছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, সংসদের প্রথম দিনই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে এবং নির্বাচিত ব্যক্তিরা শপথ গ্রহণ করবেন। বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, দলটি সংসদের শীর্ষ পদগুলোতে অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের দেখতে চায়।
দলীয় সূত্র আরো জানিয়েছে, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর জন্য ডেপুটি স্পিকার পদটি ছাড়তে সম্মত হয়েছে বিএনপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি সংসদে নতুন ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিত বহন করে।
এ ছাড়া সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা বিভিন্ন অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হবে এবং সেগুলোর আইনগত বৈধতা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী, এসব অধ্যাদেশ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদন না পেলে কার্যকারিতা হারাতে পারে। ফলে নতুন সংসদের সামনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপতি আগামী ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন। ওই অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো সংসদে উত্থাপন করা হবে। এ ছাড়া শোক প্রস্তাব গ্রহণ এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণও অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের আহ্বানে ১২ মার্চ বেলা ১১টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। অধিবেশনকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদ ভবনে নিরাপত্তা জোরদারসহ সার্বিক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও চলছে শেষ পর্যায়ে।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়েই অধিবেশন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। তার ভাষায়, শেরেবাংলা নগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা জাতীয় সংসদ ভবন এখন নতুন সংসদ সদস্যদের বরণ করে নেয়ার অপোয়। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, নতুন সংসদ হবে প্রাণবন্ত বিতর্ক ও জবাবদিহির একটি কার্যকর মঞ্চ।
এদিকে সংসদের কার্যক্রম সম্পর্কে চিফ হুইপ ও হুইপদের অবহিত করতে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কেবিনেট কে এক বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো: নূরুল ইসলাম এমপি (বরগুনা-২) এতে সভাপতিত্ব করেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন হুইপ আলহাজ মো: জি কে গউছ এমপি (হবিগঞ্জ-৩), রকিবুল ইসলাম এমপি (খুলনা-৩), মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু এমপি (শরীয়তপুর-৩), এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এমপি (নাটোর-২), মো: আখতারুজ্জামান মিয়া এমপি (দিনাজপুর-৪) এবং এ বি এম আশরাফ উদ্দিন (নিজান) এমপি (লক্ষ্মীপুর-৪)।
সভায় সংসদের অধিবেশন পরিচালনা, প্রশ্নোত্তর পর্ব, বিল উত্থাপন ও পাসের প্রক্রিয়া, সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম, সংসদ সদস্যদের প্রশাসনিক ও কারিগরি সহায়তা, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং সংসদ সচিবালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত উপস্থাপন করা হয়।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, সংসদীয় কার্যক্রম সুষ্ঠু ও ফলপ্রসূভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নানা পদপে নেয়া হচ্ছে। সংসদ সদস্যদের কার্যক্রম আরো গতিশীল ও কার্যকর করতে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হবে।
তিনি বলেন, সংসদীয় গবেষণা সহায়তা, নথিপত্র ব্যবস্থাপনা এবং প্রশিণকার্যক্রমকে আরো উন্নত করা হবে, যাতে সংসদ সদস্যরা তাদের দায়িত্ব আরো দতার সাথে পালন করতে পারেন। গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী করতে সংসদের কার্যক্রমকে আরো স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম অধিবেশনে স্পিকার নির্বাচন করা সংসদের প্রথম কাজ। সাধারণত বিদায়ী স্পিকার এই প্রক্রিয়ায় সভাপতিত্ব করেন। তবে বিদায়ী স্পিকার নিজে প্রার্থী হলে বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার সভাপতিত্ব করেন।
কিন্তু এবার বিদায়ী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দু’জনেরই অনুপস্থিতিতে প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির সিনিয়র নেতা ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে পারেন।
স্পিকার পদে সম্ভাব্য কয়েকটি নামও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে সাবেক শিামন্ত্রী ওসমান ফারুক, বর্তমান মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীনের নাম উল্লেখযোগ্য। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানও এই পদে আলোচনায় রয়েছেন।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সামনে রেখে সরকারি দল বিএনপি ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটি নতুন সংসদ সদস্যদের জন্য প্রশিণ কর্মশালার আয়োজন করেছে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, অনেক নতুন সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সংসদীয় কার্যপ্রণালী সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। তাই তাদের জন্য সংসদীয় আচরণবিধি, বিল প্রণয়ন ও পর্যালোচনা, বাজেট বিশ্লেষণ এবং সংসদে নীতিগত প্রস্তাব উপস্থাপনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেয়া হবে।
এ ছাড়া অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যরা তাদের অভিজ্ঞতা নতুন সদস্যদের সাথে ভাগ করে নেবেন। এর মাধ্যমে সরকার পরিচালনায় দতা বৃদ্ধি এবং সংসদীয় কার্যক্রমকে আরো কার্যকর করার ল্য নেয়া হয়েছে।
বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের সূত্রে জানা গেছে, দুই দিনব্যাপী এই কর্মশালা ৬ ও ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম দিনের সকালে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টারা অংশ নেবেন। বিকেলে রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা ও ফরিদপুর বিভাগের সংসদ সদস্যরা অংশ নেবেন। দ্বিতীয় দিনের সকালে ঢাকা জেলা, ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের সদস্যরা অংশ নেবেন এবং বিকেলের সেশনে সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের সংসদ সদস্যরা অংশ নেবেন।
দলটির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কর্মশালায় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কার্যক্রম, পয়েন্ট অব অর্ডার উত্থাপনের নিয়ম, বিল প্রণয়ন, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা রার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কেও বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেয়া হবে।
তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা কিভাবে নিজ নিজ এলাকার সমস্যা ও চাহিদা সংসদে উপস্থাপন করবেন এবং নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম কিভাবে তদারকি করবেন, সেসব বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হবে।
জানা গেছে, সরকার ও দলের কার্যক্রম সমন্বয় এবং সংসদীয় কৌশল নির্ধারণে গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে ধারাবাহিক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী শুক্রবার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের সাথে এবং পরদিন শনিবার দলীয় সংসদ সদস্যদের সাথে বৈঠক করার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া সরকারদলীয় চিফ হুইপ ও হুইপদের সাথেও একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। মূলত নতুন সংসদে দলীয় কৌশল নির্ধারণ, অভ্যন্তরীণ করণীয় ঠিক করা এবং সদস্যদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়ার ল্েযই এসব বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে।