পারিবারিক পুষ্টি বাগানে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি
Printed Edition
রনী আহম্মেদ কোটালীপাড়া (গোপালগঞ্জ)
কোটালীপাড়ার গ্রামীণ জনপদে পারিবারিক পুষ্টি বাগানের মাধ্যমে কৃষকের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। বাড়ির অব্যবহৃত আঙিনা, পতিত জায়গায় ফুটে উঠছে শাক-সবজির সবুজ সমারোহ। ‘পারিবারিক পুষ্টি বাগান’ নামে পরিচিত এই ছোট পরিসরের চাষাবাদ অনেক কৃষকের জন্য পুষ্টি ও আয়ের নিরাপদ উৎস হয়ে উঠছে। সারা বছর বাগান থেকে তাজা শাকসবজি সংগ্রহ করে পরিবারগুলো একদিকে নিজেদের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে বাড়তি ফসল বিক্রি করে পাচ্ছে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারছে। ফলে এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি বদলে যাচ্ছে। যার ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে কৃষকদের জীবনে।
দেড় শতাংশ জমির একটি পুষ্টি বাগান থেকে বছরে উৎপাদিত হচ্ছে গড়ে ৫৫০ কেজি শাকসবজি। বাজারদর কেজিপ্রতি ৩০ টাকা ধরলেও এসব ফসলের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। উৎপাদন খরচ মাত্র ৩ হাজার ৫০০ টাকা হওয়ায় বছরে প্রায় ১৩ হাজার টাকার মতো লাভ পাচ্ছেন কৃষকরা। শুধু তাই-ই নয়, এসব বাগানের সবজি প্রতিদিন পরিবারের খাবারের বড় অংশ পূরণ করছে। কোনো কোনো পরিবার বলছে তাদের দৈনিক শাকসবজির প্রয়োজনের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই আসে নিজেদের বাগান থেকে। বান্ধাবাড়ী ইউনিয়নের হরিনাহাটি গ্রামের কৃষক ইসমাইল হাওলাদার বলেন, কৃষি অফিসের সহায়তায় ছয় বছর ধরে এই বাগান করে আসছি। সারা বছর শাকসবজি ফলাই। নিজেরাই খাই, আর বাড়তি সবজি যা অতিরিক্ত থাকে তা বিক্রি করে দিই। অল্প জমিতেও কত রকম ফসল ফলানো যায় এটা না করলে বোঝা যেত না। কুশলা ইউনিয়নের মান্দ্রা চৌরখুলি গ্রামের কৃষক মিলন শেখ বলেন, পারিবারিক পুষ্টি বাগান মূলত উত্তম কৃষি চর্চার অংশ। আমরা এখানে একদমই রাসায়নিক সার ব্যবহার করি না। হিরণ ইউনিয়নের মাঝবাড়ি গ্রামের কৃষক মাসুদ দাড়িয়া বলেন, আমার বাগানে উৎপাদিত সবজি একেবারেই বিষমুক্ত। তাই বাজারে এগুলোর চাহিদা বেশি। অন্য সবজির চেয়ে একটু বেশি দামে বিক্রি করতে পারি। শুধু অর্থনৈতিক লাভ বা পুষ্টি পূরণই নয়, পারিবারিক পুষ্টি বাগান কোটালীপাড়ার কৃষকদের জীবনযাত্রায় এনে দিয়েছে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন। পরিবারগুলো এখন স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের দিকে ঝুঁকছে, কমছে বাজারনির্ভরতা, বাড়ছে নিজের উৎপাদিত নিরাপদ খাবারের প্রতি আস্থা। উপজেলায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পরিবার নিজস্ব একটি পুষ্টি বাগান স্থাপন করবে, যা স্থানীয় পর্যায়ে সবজি উৎপাদন বাড়াবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করবে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মুক্তা মণ্ডল বলেন, পারিবারিক পুষ্টি বাগানের মূল উদ্দেশ্য হলো বছরে বারো মাস তাজা, নিরাপদ ও পুষ্টিকর সবজি গ্রহণ নিশ্চিত করা। এটি পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি পূরণ করে। পাশাপাশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশকমুক্ত চাষাবাদ হওয়ায় এসব সবজি স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ। তিনি আরো বলেন, এই চাষাবাদ পরিবেশবান্ধব। জৈব পদ্ধতি অনুসরণ করায় পরিবেশ দূষণ কমে, মাটির উর্বরতা বাড়ে এবং কৃষকের উৎপাদন পদ্ধতি হয় আরো টেকসই। কোটালীপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দোলন চন্দ্র রায় বলেন, পারিবারিক পুষ্টিবাগানের লক্ষ্য শুধু শাকসবজি উৎপাদন নয়; এটি আসলে একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা। এখানে কৃষক পরিবার নিজেরা পুষ্টিকর খাদ্য পায়, একই সাথে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ তৈরি হয়। তিনি জানান, চলতি অর্থ বছরে উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌর এলাকায় মোট ৩৭১টি পুষ্টি বাগান স্থাপন করা হয়েছে। কৃষকদের ১৩ প্রকার শাক-সবজির বীজ, জৈব সার ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দেয়া হয়েছে।
প্রশিক্ষণ ও সার্বক্ষণিক পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে যাতে কৃষকরা দক্ষতার সাথে বাগান পরিচালনা করতে পারেন।