৫ আগস্টের চেতনা এখনো জীবিত, ইনসাফ কায়েম না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে : ডা: শফিক

Printed Edition
first-4
কেরানীগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বশীল সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার বিপ্লব কোনো সাময়িক ঘটনা নয় বরং এটি একটি অবিনাশী চেতনা। যে ছাত্র-জনতা এই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, তারা এখনো সজাগ ও জীবিত। জনগণের প্রকৃত দাবি আদায় এবং একটি ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গঠন না হওয়া পর্যন্ত কোনো অপশক্তির কাছে নতি স্বীকার করা হবে না।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি কনভেনশন সেন্টারে ঢাকা জেলা জামায়াত আয়োজিত এক ‘দায়িত্বশীল সমাবেশে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

জ্বালানি খাতের তীব্র সঙ্কট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত আমির বলেন, “জ্বালানিতেই এ দেশের সমাজের চাকা চলে। অথচ সরকার বলছে দেশে তেলের অভাব নেই বলে দাবি করে। বাস্তবতা হলো, পাম্পে তেল পেতে সাধারণ মানুষকে ৬-৭ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।” তিনি অভিযোগ করেন, একটি কুচক্রী মহল সিন্ডিকেট করে বাঁশবাগানসহ বিভিন্ন স্থানে তেল মজুদ করে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করছে। সরকার এই অসাধু চক্রকে দমনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়ার অপচেষ্টা চলছে উল্লেখ করে তিনি শিক্ষার্থীদের সচেতনতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “একজন শিক্ষার্থী সরকারের চেয়েও বিচক্ষণ। সেই শিক্ষার্থী বলেছিল, একটি ক্লাসে ৬০ জন শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র তিনটি ফ্যান ও দুইটি লাইট ব্যবহার হয়। কিন্তু অনলাইনে ক্লাস করলে ৬০টি ফ্যান ও ৬০টি বাতি জ্বলবে, যা রাষ্ট্রের ওপর বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। শিক্ষার্থীদের এমন কুদরতি মেধা ও দেশপ্রেমের কাছে বর্তমান সরকার আজ অসহায়।”

সরকারি দলের সমালোচনা করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, “বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংবিধান লঙ্ঘন করে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। অথচ সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই দায়িত্ব পালন করবেন। জাতি আজ জানতে চায় এই প্রশাসকরা কাদের দ্বারা নির্বাচিত? আপনারা জনগণের ম্যান্ডেটকে কোনো গুরুত্বই দিচ্ছেন না।”

তিনি আরো বলেন, “সংবিধানের যেসব ধারার অপব্যবহার করে ফ্যাসিবাদ তৈরি হয়, আমরা সেসব ধারা বর্জন করে নতুনভাবে সংবিধান পুনর্গঠন করব। যারা ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, তারা এখনো রাজপথে সজাগ আছে। প্রয়োজনে আবার অভ্যুত্থান হবে; জনগণের অধিকার জনগণের হাতেই ফিরিয়ে দেয়া হবে। জামায়াতে ইসলামী কখনোই অন্যায়ের সাথে আপস করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।”

দেশের বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “১১-দলীয় জোট জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যাবে। আমরা একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং দেশের জাগ্রত বিবেক হিসেবে গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা চাই।”

বিরোধীদের সমালোচনার জবাবে তিনি উল্লেখ করেন, “কেউ কেউ অভিযোগ করছেন যে আমরা সংবিধান ছুড়ে ফেলার কথা বলছি। কিন্তু তাদের মনে রাখা উচিত, বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন যেদিন এ দেশে জনগণের নির্বাচিত সরকার আসবে, সেদিন আওয়ামী লীগের (তৈরি করা বিতর্কিত) সংবিধানকে ছুড়ে ফেলা হবে জনসমক্ষে একই কথা বলেছিলেন।”

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ১১ দলীয় জোট মানুষের মৌলিক অধিকার ও মুক্তির লড়াইয়ে রাজপথে থাকবে। জনগণের রায়ের মাধ্যমেই দেশের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব। সমাবেশে বক্তারা বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানান।

ঢাকা জেলা আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা। ছাত্রনেতৃত্বের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিবির সভাপতি ও ভিপি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিবির সেক্রেটারি ও এজিএস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিবির সভাপতি এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি। এ ছাড়াও ঢাকা জেলা উত্তর ও দক্ষিণের সভাপতিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।

হীন মানসিকতা থেকেই সরকার গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তুলছে : এ টি এম আজহার

শুধু ক্ষমতার হাত বদলের জন্যই জুলাই বিপ্লব হয়নি; বরং রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে সুশাসন ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্যই ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম।

গতকাল শুক্রবার বিকেল ৫টায় রাজধানীর ভাটারায় স্থানীয় একটি মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর আয়োজিত এক ওয়ার্ড দায়িত্বশীল সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।

এ টি এম আজহার বলেন, জুলাই সনদ জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছে। এ জন্য দীর্ঘ সময় সব রাজনৈতিক দলের সাথে কথা বলে তা প্রস্তুত করা হয়েছে। একই অর্ডারে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও শুধু গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, যা সরকারের আদর্শিক দেউলিয়াত্ব ছাড়া কিছু নয়। মূলত পতিতদের আদলে ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার হীন মানসিকতা থেকেই সরকার অনাকাক্সিক্ষতভাবে গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। কিন্তু জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অতীতে কোনো ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের শেষ রক্ষা হয়নি, আর কারো হবেও না। তিনি সময় থাকতে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে অবিলম্বে জুলাই সনদ পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানান।

সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, সরকার জুলাই সনদ অস্বীকার করে গণবিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছে। কারণ চার কোটি ৮০ লাখ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়ে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে স্বতঃস্ফূর্ত রায় প্রদান করেছে। তাই জনগণ বিনা চ্যালেঞ্জে সরকারকে ছেড়ে দেবে না; বরং দুর্বার গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধ্য করবে।

কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমের উপস্থাপনায় সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন- কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মূসা, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, নাজিম উদ্দীন মোল্লা, ডা: ফখরুদ্দীন মানিক ও ইয়াছিন আরাফাত, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য জামাল উদ্দিন, মু: আতাউর রহমান সরকার প্রমুখ।