সংসদে বাজেট ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

- ব্যাংকিং খাত ‘সম্পূর্ণ বেহাল অবস্থায়’-রেজা কিবরিয়া

- চার মাসে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ কোটি টাকা - আখতার

- দুর্নীতির প্রমাণ পেলে পদত্যাগের চ্যালেঞ্জ দিলেন হাসনাত

- ম্যাজিক চশমা পরায় বাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায় না : বুলবুল

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ও দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য উপস্থাপিত হয়েছে। আলোচনায় অর্থনৈতিক দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট, ঋণ ব্যবস্থাপনা, জুলাই আন্দোলনের চেতনা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা বিতর্কে জড়ান।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে (বাজেট) আলোচনায় এ বিতর্ক দেখা দেয়। মধ্যাহ্ন বিরতি, আসর ও মাগরিব নামাজের বিরতি দিয়ে রাত পর্যন্ত চলে এই অধিবেশন। স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল পর্যায়ক্রমে সভাপতিত্ব করেন।

রেজা কিবরিয়ার কঠোর সমালোচনা

বাজেট আলোচনার শুরুতে ব্যাংকিং খাতের সঙ্কট নিয়ে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নেন রেজা কিবরিয়া। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিশ্বের বহু দেশে ৬ শতাংশ খেলাপি ঋণ হলেই তা সঙ্কট হিসেবে ধরা হয়, অথচ বাংলাদেশে এই হার ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে। তার ভাষায়, ‘এতে ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণভাবে বেহাল অবস্থায় রয়েছে’।

তিনি আরো অভিযোগ করেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তনের মাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতিকে আড়াল করা হচ্ছে। আগে ৯০ দিন সুদ না দিলে ঋণ খেলাপি ধরা হলেও এখন এক বছর সময় নেয়া হচ্ছে, যা ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা নষ্ট করছে।

রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘সৎ ব্যবসায়ীরা ঋণ পাচ্ছে না, কিন্তু খেলাপিরা সুবিধা পাচ্ছে- এটা ডিফল্ট সিস্টেমে পরিণত হয়েছে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যাংকিং খাতে কঠোর সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়।

সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠী অতিরিক্ত আয়ের প্রায় পুরোটাই খরচ করে অর্থনীতিতে গতি আনে, কিন্তু ধনীক শ্রেণীর অতিরিক্ত আয় অনেক সময় নিষ্ক্রিয় থাকে- ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব সীমিত হয়।

চার মাসে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ কোটি টাকা : আখতার

বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে এনসিসির সদস্যসচিব আখতার হোসেন দাবি করেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র চার মাসে দেশের ঋণের পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকার বেশি বেড়ে গেছে।

তার ভাষায়, ‘এই সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় ঋণ ছিল প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা, এখন তা ২৪ লাখ কোটির কাছাকাছি।’ তিনি অভিযোগ করেন, অর্থনৈতিক সংস্কারের অভাব, খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে অর্থনীতি ক্রমশ ঝুঁকির দিকে যাচ্ছে।

আখতার হোসেন আরো বলেন, আইএমএফ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতে বড় ধরনের সংস্কার চেয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়ন না হওয়ায় কাক্সিত সহযোগিতা আসেনি। তার মতে, ব্যাংক খাতে এক ধরনের ‘অরাজকতা’ চলছে এবং একীভূত হওয়া কয়েকটি ব্যাংকের মালিকানা পুরনো মালিকদের হাতে ফেরানোর সুযোগ রাখা হয়েছে, যা অর্থনৈতিক শুদ্ধতার পরিপন্থী।

তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগের সময়কালে ২৪০ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ রয়েছে এবং দেশের অর্থনীতি এখন ‘ঝুপড়ির মতো অবস্থায়’ পৌঁছেছে। একই সাথে তিনি সতর্ক করে বলেন, সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

দুর্নীতির প্রমাণ পেলে পদত্যাগ করব -হাসনাত

ময়মনসিংহ-১০ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান অভিযোগ করেন, কিছু ব্যক্তি ‘জুলাই চেতনা’ বিক্রি করে ব্যক্তিগতভাবে সুবিধা নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘যারা আগে রিকশায় চলতেন, এখন তারা প্রাডো গাড়িতে চলেন।’ তার বক্তব্যে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়।

পরে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন, তাকে ও তার রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ করে বলা হয়েছে- তারা আগে রিকশায় চলতেন, এখন গাড়িতে চলেন। এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি ঢালাও অভিযোগ। যদি প্রমাণ থাকে, তাহলে তদন্ত হোক।’

হাসনাত আব্দুল্লাহ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ডিজিএফআই, এনএসআই ও পুলিশের মাধ্যমে তদন্ত করা হোক। যদি এক টাকার দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগ করবেন।

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা কোথাও বলিনি যে আমাদের বরাদ্দ বঞ্চিত করা যাবে না; আমরা বলেছি আমার এলাকার মানুষ যেন বঞ্চিত না হয়।’ তার মতে, ব্যক্তিগত চরিত্র হননের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিতর্ককে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।

বসুন্ধরা গ্রুপের সমালোচনা

বাজেট অধিবেশনে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলার অগ্রগতি ও সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দায়ের হওয়া এই মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সংসদ ও জনগণের সামনে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে দুদকের মামলার অগ্রগতি কী অবস্থায় রয়েছে, তা সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে। একই সাথে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই মামলার েেত্র কোনো ধরনের ‘আন্ডারটেবিল সমঝোতা’ হয়েছে কি না, সেটিও জনসমে প্রকাশ করা জরুরি।

তিনি বলেন, প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যখনই আইনি পদপে নেয়া হয়, তখন তার বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান থাকে না। ফলে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয় যে, নেপথ্যে কোনো সমঝোতা বা চাপের রাজনীতি কাজ করছে কি না। তার ভাষায়, যদি এমন কোনো সমঝোতা না হয়ে থাকে, তাহলে আইনগত প্রক্রিয়া এগোতে বাধা কোথায়-এ প্রশ্নের জবাবও জনগণকে জানানো উচিত।

হাসনাত আব্দুল্লাহ আরো দাবি করেন, বিভিন্ন সময় প্রকাশিত শ্বেতপত্রে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। তিনি বলেন, যারা অর্থপাচার, ব্যাংক দখল এবং অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত, তাদের অনেকেই এখনো সমাজে প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রেখেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়।

তিনি অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া ব্যক্তিদের ওপর নানা ধরনের চাপ তৈরি করা হয়। তার মতে, কিছু েেত্র গণমাধ্যম ব্যবহার করে ভিন্নমত দমনের চেষ্টা করা হয়, যা স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তিনি আরো বলেন, প্রতিশোধ নয়, বরং ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব হওয়া উচিত। দুর্নীতির অভিযোগে যেসব মামলা চলমান রয়েছে, সেগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেয়া না হলে জনমনে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস তৈরি হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

৫০ বছরেও আ’লীগের ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ীণ

বাজেট আলোচনায় ময়মনসিংহ-৭ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ডা: মাহবুবুর রহমান বলেন, আগামী ৫০ বছরেও আওয়ামী লীগের ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ীণ। তার মতে, তিনটি প্রজন্ম-স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের আন্দোলন রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছে।

পটুয়াখালী থেকে নির্বাচিত ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, বাজেটের প্রকৃত সফলতা সংসদের টেবিল চাপড়ানো নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। তিনি স্বাস্থ্য খাতে প্রশ্ন তুলে বলেন, দেশে ৩০০ শিশু হামে মারা গেলেও কোনো জবাবদিহি হয়নি। ড. মাসুদ স্বাস্থ্য ও শিা খাতে বরাদ্দ ঘাটতির সমালোচনা করেন এবং মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন।

সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, অর্থবছর পরিবর্তন করে ডিসেম্বর-জানুয়ারি বা এপ্রিল করা উচিত।

গাজীপুর থেকে নির্বাচিত সালাহউদ্দিন আইয়ুবী বাজেটকে ‘ঋণনির্ভর’ এবং ’গরিব ও মধ্যবিত্তবিরোধী’ বলে মন্তব্য করেন। এটি ‘গরিবকে হয়রানির বাজেট’ হিসেবেও উল্লেখ করেন।

চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত জহিরুল ইসলাম ব্যাংক খাত, শিা ও রেল খাতের অবহেলার সমালোচনা করেন এবং মৎস্যজীবীদের জন্য তিপূরণ বৃদ্ধির দাবি জানান।

ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব:) আবদুল বাতেন সরকারি হাসপাতালের সঙ্কট ও শিা-স্বাস্থ্য খাতে দুর্বলতার কথা তুলে ধরেন।

ঢাকা-১৪ আসনের ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, বাজেটে গুম-খুনের শিকার পরিবারগুলোর জন্য কোনো বরাদ্দ নেই।

ম্যাজিক চশমা পড়ায় বাজারে গেলে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায় না : বুলবুল

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকাকে আবাসন খাতে সাদা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। যেটা অগ্রহণযোগ্য, এটা করা হয়েছে। বাজেটে কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন নেই। এটা গতানুগতি, ট্র্যাডিশনাল। এই বাজেটে দুর্নীতি অপচয় রোধে সঠিক নির্দেশনা নেই। আগের ধারাবাহিকতার অংশ।

সরকার সুকৌশলে বাজেট পেশের কয়েকদিন আগেই জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন কিছুর দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে উল্লেখ করে নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ম্যাজিক চশমা পড়ে থাকার কারণে বাজারে গেলে বাজার দরের ঊর্ধ্বগতি দেখা যায় না।

তিনি বলেন, এস. আলমসহ তার দোসরদের বসানো প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। প্রকৃত মালিক তথা এই ব্যাংক তার আগে যারা মালিকানায় ছিল তাদের হাতে দিতে হবে। নইলে গ্রাহকের আস্থা ফিরে আসবে না। বাজেট বাস্তবায়নে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাজেট আলোচনায় মো: জাকির হোসেন, মো: হারুনুর রশীদ, জয়নাল আবেদীন, হাফিজ ইবরাহিম, আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁঁইয়া, কামাল হোসেন (ঢাকা-৫), শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল (কিশোরগঞ্জ), সাঈদ আল নোমান (চট্টগ্রাম-১০), হেলাল উদ্দিন (কিশোরগঞ্জ-২) ও মঞ্জুরুল ইসলাম (দিনাজপুর-১) অংশ নেন।

খুলনা থেকে নির্বাচিত আলী আজগর লবি, নওগাঁ থেকে নির্বাচিত শেখ মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের ফজলুর রহমান।

আগামী শনিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হয়।