সঙ্কটে ছোট দলগুলো

ভোটের স্বচ্ছতায় বড় চ্যালেঞ্জ ‘এজেন্ট সুরক্ষা’

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন এখন একটাই- ভোটকেন্দ্রে কারা উপস্থিত থাকবেন, কারা পাহারা দেবেন ব্যালট, আর কিভাবে নিশ্চিত হবে ভোটের স্বচ্ছতা। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের দিন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতিই কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ হিসেবে কাজ করে।

তবে এবারের নির্বাচনে ইসলামী ধারার একাধিক দল অভিযোগ করছে, তাদের পোলিং এজেন্টদের হুমকি, ভয়ভীতি ও চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রভিত্তিক এজেন্ট অনুপস্থিত থাকলে কেবল প্রশাসনিক নিরাপত্তা দিয়ে নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক মানে গ্রহণযোগ্য করা কঠিন। কারণ ভোটগ্রহণ, ব্যালট ব্যবস্থাপনা ও গণনার প্রতিটি ধাপে এজেন্টরাই সরাসরি প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে কাজ করেন।

এজেন্ট সঙ্কট

মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছোট ও মাঝারি দলগুলোর জন্য সব কেন্দ্রে এজেন্ট নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় চাপ এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক এলাকাতেই এজেন্ট সঙ্কট দেখা দিয়েছে। খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুল হাফিজ খসরু জানান, যেখানে দলীয় প্রার্থী রয়েছে সেখানে এজেন্ট নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রস্তুতিও সন্তোষজনক। কিছু বিচ্ছিন্ন অভিযোগ রিটার্নিং কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার আশা, ভোটাররা নির্বিঘেœ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব শেখ ফজলে বারী মাসুদ মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিকে ‘মিশ্র’ বলে উল্লেখ করেন। তার দাবি, প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে এজেন্ট নিয়োগ সম্পন্ন হলেও বাকি কেন্দ্রগুলোতে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অনেক এলাকায় ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সাথে সাক্ষাতের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, তাদের দল সব কেন্দ্রে এজেন্ট নিশ্চিত করেছে। তবে বিভিন্ন স্থানে প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের আরো সক্রিয় ভূমিকা চান তিনি।

ব্যালট পাহারায় কারা

দলীয় এজেন্টদের উপস্থিতি অনিশ্চিত হলে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা অনেকাংশেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় ১০ লাখ সদস্য নির্বাচনী দায়িত্বে থাকবে।

ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম কেন্দ্রে সেনাবাহিনীর টহল, স্ট্রাইকিং ফোর্স এবং জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ব্যালট সুরক্ষার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, প্রশাসনিক পাহারার পাশাপাশি দলীয় এজেন্ট ও ভোটারদের সক্রিয় উপস্থিতিই প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তাদের ভাষায়, ভোটারের উপস্থিতিই অনেক সময় সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রহরা।

বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এজেন্টবিহীন কেন্দ্রগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো বুথে যদি একপক্ষের এজেন্ট থাকে বা কেউ না থাকে, তাহলে স্বচ্ছ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রিজাইডিং কর্মকর্তার জন্যও কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কেন্দ্র দখল, ব্যালট স্টাফিং বা ভোট কারচুপির অভিযোগ সহজেই ওঠে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও একতরফা এজেন্ট উপস্থিতিকে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার জন্য নেতিবাচক হিসেবে দেখেন।

নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি

এজেন্ট সঙ্কট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন বেশ কিছু বিকল্প ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে সিসিটিভির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় মনিটরিং, প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের বিশেষ ক্ষমতা এবং গোলযোগের প্রমাণ মিললে তাৎক্ষণিক ভোট স্থগিতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষক দলকে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়া হচ্ছে, যাতে তারা ভোটকেন্দ্রের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।

বিশ্লেষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত এবারের নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর- পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতি, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। বিরোধী দলগুলোর এজেন্ট যদি কেন্দ্রে টিকে থাকতে না পারেন, তবে নির্বাচন আবারো বিতর্কের মুখে পড়তে পারে- এই আশঙ্কাই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।