কর্ণফুলী আ’লীগ নেতাদের ঝুট-চোরাই তেল ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে বেপরোয়া আব্বাস

Printed Edition

চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচিত নাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আব্বাস। আওয়ামী লীগ গত ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার সময় তিনি প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব বজায় রেখে নানা বাণিজ্যকার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এলাকাজুড়ে তার এই অদৃশ্য দাপট নিজ দলের ভেতরেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

২০১০ সালে আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী, হায়দার আলী ও আমীর আহমদের সাথে মিলে তিনি গড়ে তোলেন কর্ণফুলী বিল্ডার্স অ্যান্ড ডেভেলপার প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন নথিতে দেখা যায়, আলী আব্বাসের শেয়ার চার হাজার, আর অপর তিন আওয়ামী লীগ নেতার শেয়ার দুই হাজার করে। এর মধ্যে মোহাম্মদ আলী কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে সদস্য, হায়দার আলী দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং আমীর আহমদ উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। বিএনপির একজন জেলার শীর্ষস্থানীয় নেতা কিভাবে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে যৌথভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন-এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জানতে একাধিকবার ফোন করলেও আলী আব্বাস কোনো মন্তব্য দেননি।

গত বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে গেলেও কর্ণফুলীতে উল্টো দৃশ্য দেখা যায়। এখানকার অনেক আওয়ামী লীগ নেতা প্রকাশ্যে থাকলেও ঝুট ব্যবসা, কারখানার বাতিল মালামাল ব্যবস্থাপনা, নদীপথের তেল ব্যবসা এবং ঘাট নিয়ন্ত্রণে হঠাৎই প্রভাব বাড়তে থাকে বিএনপি নেতা আলী আব্বাসের। অভ্যুত্থানের আগে এলাকায় এসব ব্যবসায় আধিপত্য ছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের। অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি বদলে গিয়ে বেশ কিছু কারখানার ঝুটের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আলী আব্বাসের কাছে।

রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানের একটি চিঠিতে দেখা যায়, গত বছরের ২৭ আগস্ট গ্রুপটির দু’টি তৈরী পোশাক কারখানার বাতিলকৃত ঝুট তদারকির দায়িত্ব দেয়া হয় আলী আব্বাসকে। একইসাথে আরেকটি প্লাস্টিক কারখানার বাতিল মালামালও তার তত্ত্বাবধানে দেয়া হয়। ওই চিঠিতে দু’টি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে বাতিলকৃত ঝুট ক্রয়-বিক্রয়ের কথা থাকলেও আলী আব্বাস একাই নিয়ে যাচ্ছেন। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, এসব কারখানায় মাসিক প্রায় ২০ লাখ টাকার ঝুট ক্রয়-বিক্রয় হয়, যার বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণ করছেন এই বিএনপি নেতা। অভ্যুত্থানের পর নদীপথের চোরাই তেল বাণিজ্য, ঘাটের নিয়ন্ত্রণ এবং তেল ওঠানোর সিরিয়াল নিয়ে বিএনপি নেতা আলী আব্বাস ও স্থানীয় আরেক শীর্ষ বিএনপি নেতার অনুসারীদের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে।

পুলিশ ও রাজনৈতিক সূত্র জানায়, গত ২৮ মে কর্ণফুলীর জুলধা এলাকার বিওসি ঘাটে দুই পক্ষ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী মাঠে নামলে উত্তেজনা থেমে যায়। স্থানীয়দের দাবি, চোরাই তেলের পুরনো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও নতুন করে নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করছেন আলী আব্বাসের অনুসারীরা, যা এলাকায় অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। কর্ণফুলীতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যেও আলী আব্বাসের ব্যবসায়িক বিস্তার ও প্রভাব বাড়ার ঘটনাটি এলাকায় নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এ ব্যাপারে বেশ কয়েকবার আলী আব্বাসের মোবাইলে কল করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।