গাজায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের বিলম্বে ইসরাইল হামাস পরস্পরকে দোষারোপ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও একাধিক স্থানে ইসরাইলের হামলা
  • ইসরাইলি কারাগারে আরো ১ ফিলিস্তিনির মৃত্যু
  • পশ্চিমতীরে শরণার্থী শিবিরে ২৫টি বাড়ি ভাঙার নির্দেশ

গাজায় যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে বিলম্বের জন্য ইসরাইল ও হামাস একে অপরকে দায়ী করছে। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আসে গাজা সিটির কাছে হামাসের এক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হওয়ার পর। আলজাজিরা জানায়, ইসরাইল দাবি করেছে, ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো শেষ বন্দীর লাশ ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে এবং গাজাকে আবার সামরিকীকরণের চেষ্টা করছে।

হামাসের গাজা প্রধান খালিল আল-হাইয়া এক ভিডিও বার্তায় জানান, গত শনিবার ইসরাইলি হামলায় হামাস কমান্ডার রায়েদ সাআদ নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ইসরাইল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত শান্তি পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। আল হাইয়া বলেন, ‘ইসরাইলের অব্যাহত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং সাআদসহ অন্যদের হত্যাকাণ্ড চুক্তির স্থায়িত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।’ তিনি মধ্যস্থতাকারীদের, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে, আহ্বান জানান যেন ইসরাইলকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে বাধ্য করা হয়।

অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে শর্ত ছিল শত্রুতা বন্ধ, জীবিত বন্দী ও আটক ব্যক্তিদের ফেরত দেয়া, লাশ হস্তান্তর এবং গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করা। এই শর্তগুলো পূরণ হলে দ্বিতীয় ধাপে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, ফিলিস্তিনি নিরস্ত্রীকরণ এবং যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে। তবে ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইল প্রতিদিন গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গাজা কর্তৃপক্ষ বলছে, এ পর্যন্ত প্রায় ৮০০ হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছে এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেয়া হচ্ছে। এ দিকে ইসরাইল বলছে, তারা শেষ বন্দী রান গভিলির লাশ ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় আছে। এটি দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার পূর্বশর্ত।

গত রোববার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেন, হামাস শান্তি পরিকল্পনার মূলনীতি লঙ্ঘন করেছে। তিনি নিহত কমান্ডার সাআদকে ‘গাজায় হামাসের অস্ত্র সংগ্রহ ও শক্তি বৃদ্ধির প্রধান ব্যক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘তিনি অস্ত্র আবার সংগ্রহ ও পাচারের চেষ্টা করছিলেন।’ নেতানিয়াহু বলেন, এসব কর্মকাণ্ড ‘ট্রাম্প পরিকল্পনার মূলনীতির সম্পূর্ণ লঙ্ঘন’। তিনি আরো বলেন, ইসরাইল রান গভিলির লাশ ফেরত আনতে কাজ করছে।

এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে টানাপড়েনের খবরও এসেছে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে দ্রুত দ্বিতীয় ধাপে যেতে চাপ দিচ্ছে; কিন্তু ইসরাইল বলছে- গভিলির লাশ ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত তারা এগোবে না। নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা প্রথম ধাপের শেষ প্রান্তে। আমরা রান গভিলিকে ফেরত আনতে চাই এবং এ বিষয়ে অনেক কাজ করছি, ইসরাইলে, কায়রোতে এবং অন্যান্য জায়গায়।’ যুক্তরাষ্ট্রের চাপের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ইসরাইল তার নীতিতে স্বাধীনভাবে কাজ করবে। ‘আমাদের নীতি শক্তিশালী থাকবে এবং এটি স্বাধীন। আমরা সিদ্ধান্ত নিই কী করতে হবে, কিভাবে প্রতিক্রিয়া দিতে হবে। ইসরাইল ও ইসরাইলি সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যা প্রয়োজন, তা আমরাই ঠিক করি।’

যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় একাধিক স্থানে ইসরাইলের হামলা : ইসরাইলি সেনাবাহিনী সোমবার দক্ষিণ ও উত্তর গাজায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে। ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও এটি আরেকটি বড় লঙ্ঘন। আনাদোলুর খবরে জানা যায়, ইসরাইলি বাহিনী রাফাহ শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে। পুরো রাফাহ এখন ইসরাইলের সামরিক নিয়ন্ত্রিত হলুদ জোনের মধ্যে। তারা আরো জানান, রাফাহর উত্তরের দিকে ইসরাইলি সামরিক যান থেকে নির্বিচারে গুলি ছোড়া হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি কামান থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়েছে এবং একই সময়ে হেলিকপ্টার থেকেও গুলি চালানো হয়েছে। উত্তর গাজার জাবালিয়ার পূর্বাংশেও ইসরাইলি হেলিকপ্টার থেকে হামলা হয়েছে। গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলেও সামরিক যান থেকে গুলি চালানো হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলের হামলায় ৩৯০ জনের বেশি নিহত এবং এক হাজার ৬০ জনের বেশি আহত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইল গাজায় প্রায় ৭০ হাজার ৭০০ মানুষকে হত্যা করেছে যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু এবং আহত হয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার ১০০ জনের বেশি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও এসব হামলা অব্যাহত রয়েছে।

ইসরাইলি কারাগারে আরো ১ ফিলিস্তিনি বন্দীর মৃত্যু : ইসরাইলি কারাগারে আরো এক ফিলিস্তিনি বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে এটি চতুর্থ মৃত্যু, যা আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি আরো জোরালো করেছে। খবর প্রেস টিভির। ২৬ বছর বয়সী সাখর আহমদ খলিল জাউল দখলকৃত পশ্চিমতীরের বেইত লাহমের পশ্চিমে হুসান শহরের বাসিন্দা। তাকে ইসরাইলের ওফার কারাগারে আটক রাখা হয়েছিল। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে ফিলিস্তিনি বন্দী বিষয়ক কমিশন এবং ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটি। জাউলকে ১১ জুন থেকে প্রশাসনিক আটকাদেশে রাখা হয়েছিল। এই ব্যবস্থায় কোনো অভিযোগ, প্রমাণ বা বিচার ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দী রাখা হয়। পরিবার জানিয়েছে, তার কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ ছিল না। তার ভাই খলিল জাউলও এখনো ইসরাইলি কারাগারে বন্দী। ফিলিস্তিনি বন্দীদের গণমাধ্যম অফিস বলেছে, জাউলের মৃত্যু ইসরাইলি কারাগারগুলোতে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চালানো ধীর মৃত্যুদণ্ড নীতির অংশ। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, বন্দীদের ওপর কঠোর নির্যাতন, খাদ্যপানির ঘাটতি, চিকিৎসা অবহেলা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ নানামুখী নিষ্ঠুরতা চালানো হচ্ছে, যার ফলে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।

তারা ইসরাইলকে জাউলের মৃত্যুর জন্য সম্পূর্ণ দায়ী করে আন্তর্জাতিক স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি কারাগারগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল পাঠানো, জোরপূর্বক গুম হওয়া বন্দীদের তথ্য প্রকাশ, কারাগারে মারা যাওয়া বন্দীদের লাশ ফেরত দেয়া এবং ইসরাইলি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে। জাউলের মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগে একই শহরের ২১ বছর বয়সী বন্দী আবদুর রহমান আল সাবাতিন দখলকৃত এলাকায় শাআরে সেদেক মেডিক্যাল সেন্টারে মারা যান। ফিলিস্তিনি বন্দী অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সাম্প্রতিক মৃত্যুগুলো ফিলিস্তিনি ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সময় নির্দেশ করছে। ১৯৬৭ সালে পশ্চিমতীর দখলের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইলি কারাগারে মোট ৩২৩ জন ফিলিস্তিনি বন্দীর মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে। বন্দিবিষয়ক কমিশন এবং প্রিজনার্স সোসাইটি জানিয়েছে, ইসরাইলের কট্টরপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেনগভির দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বন্দীদের মৃত্যুর হার আরো বেড়ে গেছে।

পশ্চিমতীরের শরণার্থী শিবিরে ২৫টি বাড়ি ভাঙার নির্দেশ : ইসরাইলি দখলদার বাহিনী উত্তর পশ্চিমতীরের তুলকার্ম শহরের কাছে নুর শামস শরণার্থী শিবিরে ২৫টি আবাসিক ভবন ভাঙার সামরিক নির্দেশ জারি করেছে। দখলদারিত্ব ও অবৈধ বসতি নির্মাণ আরো বিস্তারের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তুলকার্মের গভর্নর আবদুল্লাহ কামিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মানবাধিকার সংস্থা, কূটনৈতিক মিশন ও দূতাবাসগুলোকে তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ করে এই সিদ্ধান্ত বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত ইসরাইলের দখলদারিত্বের ঔদ্ধত্য ও অপরাধের ধারাবাহিকতা, যা তুলকার্ম ও নুর শামস শিবিরের ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। কামিল এই পদক্ষেপকে বেসামরিক মানুষের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তির বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ধ্বংসলীলা ও ভাঙচুর অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেন, যার ফলে শিবিরের বাসিন্দারা জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক নীতি ও মানবাধিকার সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

গভর্নর আবারো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তুলকার্ম ও আশপাশের এলাকায় চলমান আগ্রাসন বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান। ইসরাইলি গণমাধ্যম জানায়, ইসরাইলের তথাকথিত নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা দখলকৃত পশ্চিমতীরে ১৯টি অবৈধ বসতি বৈধ করার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা বলছেন, এটি দীর্ঘ দিনের ভূমি দখল ও জনসংখ্যাগত প্রকৌশল নীতিকে আরো গভীর করছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০০৫ সালের ‘বিচ্ছিন্নকরণ’ পরিকল্পনার সময় ভেঙে দেয়া পশ্চিমতীরের দু’টি আউটপোস্টও আবার চালু করা হচ্ছে।