তুরস্কের নেতৃত্বে গাজা অভিমুখে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ নৌবহর

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • গাজায় ফের ইসরাইলি হামলায় নিহত ৫
  • কথা বলার ক্ষমতা হারাচ্ছে গাজার অনেক শিশু

ইসরাইলি অবরোধ ভেঙে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে গাজার দিকে আসছে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার ইতিহাসে ‘সর্ববৃহৎ’ নৌবহর। গত ১২ এপ্রিল স্পেনের বার্সোলনা থেকে ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করেছে সর্ববৃহৎ এই নৌ-বহর। তুরস্কের নেতৃত্বে এবারের মিশনে গাজাবাসীর কাছে সহায়তা পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে নিজেদের দৃঢ় প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছে ।

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার বোর্ড সদস্য ফাতিহ ভারোল তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে জানান, তুর্কি প্রতিনিধিদল এই উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা গাজায় ইসরাইলের অবরোধ ভাঙা, মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেয়া এবং সেখানে চলমান পরিস্থিতির প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে। ২০২৫ সালে বিভিন্ন দেশের এনজিও প্রতিনিধি, কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্যোগে এটি গঠিত হয়। বর্তমানে এটি গাজার উদ্দেশে দ্বিতীয় মিশন শুরু করেছে।

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার তথ্যমতে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে গাজায় ইসরাইলি অবরোধ ভেঙে সেখানে মানবিকসহায়তা পৌঁছে দেয়া এবং ফিলিস্তিনিদের মানবিক সঙ্কটের প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করা। আয়োজকরা জানিয়েছে, এই মিশন আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে এবং ফিলিস্তিনি সিভিল সোসাইটি, আইন বিশেষজ্ঞ ও সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞদের সাথে সমন্বয় করে করা হচ্ছে। এতে ‘গ্রিন পিস’ ও ‘ওপেন আর্মস’-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার অংশগ্রহণ রয়েছে এবং বার্সেলোনা সিটি প্রশাসনও সমর্থন দিচ্ছে।

স্প্রিং ২০২৬ মিশনটি ১২ এপ্রিল বার্সেলোনা থেকে যাত্রা শুরু করে, যেখানে প্রায় ৭০টি জাহাজ এবং ৭০টি দেশের প্রায় এক হাজার অংশগ্রহণকারী রয়েছে। এটি সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালের আগের মিশনের তুলনায় অনেক বড়, যেখানে ৪২টি নৌযান এবং ৪৬২ জন অংশগ্রহণকারী ছিলেন।

বোর্ড সদস্য ফাতিহ ভারোল বলেন, ফিলিস্তিনের সাথে তুরস্কের ঐতিহাসিক সম্পর্ক গভীর। গাজায় যে ট্র্যাজেডি চলছে, তা আমরা জাতি হিসেবে আরো গভীরভাবে অনুভব করি। এ ক্ষেত্রে তুরস্কের জনগণের সমর্থন এবং নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর সহায়তা অত্যন্ত শক্তিশালী। ভারোল জানান, তুর্কি প্রতিনিধিদল শুধু বহরের প্রশাসন ও সমন্বয়েই নয়, ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলোতে জাহাজ প্রস্তুতিতেও আর্থিকসহায়তা দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, ২২ এপ্রিল ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল সুমুদ পার্লামেন্টারিয়ানস কংগ্রেসে তুরস্কের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী- উভয় দলের ১০ জনের বেশি সংসদ সদস্য অংশ নেন, যা এই মিশনের কূটনৈতিক অংশ হিসেবে কাজ করছে। ভারোলের মতে, ওই বৈঠকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনপ্রণেতারা নিজ নিজ সংসদে গাজায় ‘গণহত্যা’ বন্ধ, ফিলিস্তিনের অবরোধ প্রত্যাহার, ইসরাইলের আন্তর্জাতিক আইন মানা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচারব্যবস্থাকে সক্রিয় করার দাবি তোলার বিষয়ে একমত হন।

তিনি বলেন, এই উদ্যোগ ইসরাইলের ওপর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে সহায়তা করবে এবং একটি আরো স্বাধীন বিশ্ব গঠনের পথে সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এগিয়ে যাবে। আরেক তুর্কি কর্মী গোরকেম দুরুও জানান, ২০২৬ সালের মিশনের অংশ হিসেবে গাজার উদ্দেশে যাত্রার প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, ভুয়া যুদ্ধবিরতি দখল, অবরোধ বা সহিংসতা বন্ধ করতে পারেনি।

দুরু জানান, ইতালির অগাস্টা বন্দরে শেষ প্রস্তুতি চলছে, আর বার্সেলোনা থেকে ছেড়ে আসা জাহাজগুলো এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে। ২০০৭ সাল থেকে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বর্তমানে তীব্র মানবিক সঙ্কট চলছে। গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে চলমান সঙ্ঘাতে অবকাঠামো, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ১৫ লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ মৌলিক সেবা ও আশ্রয়ের অভাবে ভুগছেন। গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর অবৈধ হামলা এখন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৩২৮ জন নিহত হয়েছে। এ ছাড়া আহত হয়েছে এক লাখ ৭২ হাজার ১৮৪ জন যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।

গাজায় ফের ইসরাইলি হামলায় নিহত ৫; চিকিৎসা সঙ্কট তীব্র

গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরাইলি হামলা থামছেই না। স্থানীয় সূত্র ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, রোববার সকাল থেকে চালানো হামলায় অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। গাজা সিটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল জায়তুন এলাকায় ড্রোন হামলায় দুইজন নিহত হন। দক্ষিণাঞ্চলের আল-মুঘরাকা এলাকাতেও আরেকজনের মৃত্যু হয়েছে। একই দিনে খান ইউনুসে পৃথক হামলায় নিহত হন পাঁচ সন্তানের জননী হুদা জুমা আত্তার।

গাজার সাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও দুইজনের লাশ হাসপাতালে আনা হয়েছে এবং ১১ জন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৮১১ জন নিহত ও দুই হাজার ২৭৮ জন আহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৫৮৭ এবং আহত এক লাখ ৭২ হাজারের বেশি। এখরনা হাজারো মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ দিকে গাজায় চিকিৎসা সঙ্কটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে ৫৭ জন রোগীসহ মোট ১৩৮ জনকে রাফাহ ক্রসিং দিয়ে বাইরে পাঠানো হয়েছে। তবে সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে মাত্র সীমিতসংখ্যক রোগী চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রায় ১৮ হাজার গুরুতর অসুস্থ ও আহত ব্যক্তি এখনো গাজা ছাড়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

কথা বলার ক্ষমতা হারাচ্ছে গাজার অনেক শিশু

বাড়ির কাছে তীব্র বোমাবর্ষণের পর পাঁচ বছর বয়সী জাদ জোহুদ হঠাৎ কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সে একা নয়, গাজার অনেক শিশুর অবস্থা এখন জাদের মতো। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, যুদ্ধজনিত আঘাত বা মানসিক আঘাতের কারণে কথা বলতে অক্ষম শিশুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। কারো কারো ক্ষেত্রে এর কারণ শারীরিক, যেমন- মাথায় আঘাত, স্নায়বিক ক্ষতি বা বিস্ফোরণের আঘাত। আবার অন্যদের ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান ক্ষত থাকে না। বারবার সহিংসতার শিকার হওয়ার ফলেই তাদের এই নীরবতা নেমে আসে, যা তাদের উপলব্ধি বা যোগাযোগের ক্ষমতাকে ছাপিয়ে যায়। শিশু মনোচিকিৎসক ক্যাটরিন গ্লাটজ ব্রুবাক, যিনি ডক্টরস উইদাউট বর্ডারসের সাথে গাজায় দুবার কাজ করেছেন, তিনি এটিকে ‘নীরব যন্ত্রণা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এটি প্রায়শই ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। গাজা শহরের হামাদ হাসপাতালে চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের মধ্যে কথা বলার ক্ষমতা হারানোর ঘটনা বাড়ছে।

পশ্চিমতীরে সহিংসতা বৃদ্ধি

অধিকৃত পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে হামলা ও সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনায়, রামাল্লাহর কাছে তুরমুসাইয়া এলাকায় অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা প্রায় ৪০০টি জলপাই গাছ কেটে ফেলেছে। ফিলিস্তিনি কৃষকদের জীবিকার প্রধান উৎস এই জলপাই গাছগুলো ধ্বংসের ঘটনা নতুন নয়। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন -সংশ্লিষ্ট একটি সংস্থার তথ্যমতে, শুধু মার্চ মাসেই পশ্চিমতীরে এক হাজার ৮১৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া নাবলুসের কাছে দুমা গ্রামে ইসরাইলি সেনা অভিযানে এক দম্পতি আহত হয়েছেন। ২৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গুলি করা হয় এবং তার স্ত্রী মুখে আঘাত পান। একই সময়ে জেরুসালেমের উত্তরে এক ফিলিস্তিনি কিশোর গুলিবিদ্ধ হয়। হেবরনের একটি ভোটকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ছয়জনকে আহত করার অভিযোগও উঠেছে ইসরাইলি সেনাদের বিরুদ্ধে। টিয়ার গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে হামলার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়।

পূর্ব জেরুসালেমে উচ্ছেদ অভিযান

অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেমের সিলওয়ান এলাকায় ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ভেঙে পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা ঘিরে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আল-বুস্তান এলাকায় ইতোমধ্যে বহু ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং আরো শতাধিক বাড়ি ভাঙার ঝুঁকিতে রয়েছে। খবর এএফপির। ৯৭ বছর বয়সী ইউসরা ক্বোয়াইদার পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তাদের বাড়ি ভেঙে ফেলা হলে এটি হবে তৃতীয়বারের মতো উচ্ছেদ। স্থানীয়দের দাবি, নির্মাণ অনুমতি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হওয়ায় অনেক ঘরই ‘অবৈধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ইসরাইলি এনজিও ইর আমিন জানিয়েছে, ২০২৩ সালের পর থেকে উচ্ছেদের হার দ্রুত বেড়েছে। চলতি বছরেই ১৭টি বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এই প্রকল্পটি সিটি অফ ডেভিড পর্যটন কেন্দ্র সম্প্রসারণের অংশ, যা পরিচালনা করে বসতি স্থাপনকারী সংগঠন ইলাড। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে এলাকা দখলের একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ। বাসিন্দারা সতর্ক করে বলেছেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দুই হাজারের বেশি মানুষ উচ্ছেদের ঝুঁকিতে পড়বেন। স্থানীয় এক নেতা বলেন, ‘এটি কেবল উচ্ছেদ নয়, আমাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা।’