সিয়ামের অনন্য প্রতিদান

Printed Edition

লিয়াকত আলী

ইসলামের অন্যতম বুনিয়াদি ইবাদত সিয়ামের মাস রমজানের আজ অষ্টম দিবস। সিয়াম বা রোজার অনন্যতা প্রসঙ্গে বুখারি ও মুসলিম শরীফে হজরত আবু হুরায়রা (রা:) এর বরাতে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এটি একটি হাদিসে কুদসি । আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : ‘মহান ও মহিমান্বিত আল্লাহ বলেছেন : ‘আদম সন্তানের প্রতিটি কাজ তার জন্য, রোজা ছাড়া; এটি আমার জন্য, এবং আমিই এর প্রতিদান দেবো’। প্রশ্ন হয়, সব ইবাদতই তো আল্লাহর জন্য করা হয়। তাহলে রোজাকেই কেন নির্দিষ্ট করা হলো। এ প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, রোজাকে অনন্য হিসেবে বর্ণনা করাই এখানে উদ্দেশ্য। রোজার অনন্যতার পেছনে বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করা হয়।

রোজা মানুষের কাছ থেকে গোপন থাকে, আল্লাহ ছাড়া কেউ তা জানতে পারে না। অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। নামাজ, জাকাত, হজ ইত্যাদি ইবাদত প্রকাশ্যে আদায় করা হয় এবং মানুষ জানতে পারে। এই অর্থে, রোজা মানুষকে দেখানোর জন্য হতে পারে না। এটি সম্পূর্ণরূপে সর্বশক্তিমান আল্লাহর জন্য।

রোজার মধ্যে ত্যাগ, কষ্ট ও শরীরের ক্লেশ জড়িত। এতে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও শরীরের অন্যান্য আকাক্সক্ষার প্রতি ধৈর্য ধরতে হয়। অন্য দিকে অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রে এমন কোনো কষ্ট বা ত্যাগ নেই। আরো বলা হয়, সব ইবাদত অবশ্যই একমাত্র আল্লাহর জন্য। কিন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উপাসনা রোজার সাথে করা হয়নি। কারণ কাফের ও মুশরিকরা তাদের কোনো উপাস্যকে রোজা দিয়ে সম্মানিত করত না। যদিও তারা তাদের উপাস্যকে সম্মান ও উপাসনা করত, কিছু ধরনের সেজদা, স্মরণ ও প্রার্থনার মাধ্যমে। অতএব, রোজা শুধু সর্বশক্তিমান আল্লাহর জন্য বিশেষ।

আরেকটি কারণ রোজার মধ্যে কোনো ভনিতা জড়িত নেই, অন্য দিকে অন্যান্য বাহ্যিক ইবাদত, যেমন রোজা, হজ্জ, জাকাত এবং দান-খয়রাত, ইত্যাদিকে ভনিতার সন্দেহ থাকতে পারে। ইমাম খাত্তাবি বলেন , রোজার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের একটি কারণ, রোজাদার রোজার সময় কোনো শারীরিক আনন্দ পায় না, তাই রোজা কেবল আল্লাহর জন্য বিশেষ।

এটাও বলা হয়েছে যে, পানাহার থেকে বিরত থাকা আল্লাহর অন্যতম গুণ। যদিও রোজাদার সর্বশক্তিমান আল্লাহর এই গুণের অনুরূপ হতে পারে না, তবুও সে নিজের মধ্যে এই চরিত্র তৈরি করে এক অর্থে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। আল্লাহ ছাড়া কেউ এর প্রতিদানের পরিমাণ জানে না, অন্য দিকে অন্যান্য ইবাদতের প্রতিদান সর্বশক্তিমান সৃষ্টির কাছে প্রকাশ করেছেন। অতএব, এই ইবাদত আল্লাহর জন্য সংরক্ষিত। অন্য সব ইবাদত বান্দার ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণ করবে; কিন্তু রোজা কিয়ামতের ময়দানে এই উদ্দেশ্যে ব্যয় করা হবে না।

রোজা এমন একটি ইবাদত যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানতে পারে না, এমনকি ফেরেশতারাও জানতে পারে না।

রোজার গুরুত্ব আল্লাহর উপস্থিতি এবং মহিমার জন্য, ঠিক যেমন আল্লাহর ঘরের গুরুত্ব কেবল আল্লাহর উপস্থিতি এবং মহিমার জন্য, অন্যথায় সব ঘর আল্লাহর। রোজাদার নিজের মধ্যে ফেরেশতাদের গুণাবলি তৈরি করার চেষ্টা করে, তাই সে আল্লাহর কাছে প্রিয়।

যেকোনো ইবাদত কবুল হওয়া ও প্রতিদানের উপযুক্ত হওয়ার জন্য প্রথম ও প্রধান শর্ত ঈমান। কুরআন মজিদের একাধিক আয়াতে বিষয়টি স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন ইরশাদ হয়েছে- যেকোনো পুরুষ কিংবা নারী কোনো সৎকর্ম করবে এই অবস্থায় যে সে ঈমানদার, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রাপ্য তিল পরিমাণও নষ্ট হবে না। (সূরা নিসা, আয়াত ১২৪)

আরো ইরশাদ হয়েছে, পুরুষ হোক কিংবা নারী যে-ই সৎকর্ম সম্পাদন করে এই অবস্থায় যে, সে ঈমানদার, আমরা অবশ্যই অবশ্যই তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যে উত্তম কাজের করত, তার প্রতিদানে তাদেরকে প্রাপ্য পুরস্কার দেবো। (সূরা নাহল, আয়াত ৯৭)

তেমনি কোনো অবিশ্বাসীর ইবাদত বা সৎকাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ জন্য কোনো প্রতিদান দেয়া হবে না বলে ঘোষণা করা হয়েছে কুরআন মজিদে। যেমন ইরশাদ হয়েছে- যারা আপন পালনকর্তার সত্তার অবিশ্বাসী তাদের অবস্থা এই যে, তাদের কর্মগুলো ছাইভস্মের মতো যার উপর দিয়ে প্রবল বাতাস বয়ে যায় ধূলিঝড়ের দিন। তাদের উপার্জনের কোনো অংশই তাদের করতলগত হবে না- এটাই সুদূর পথভ্রষ্টতা। (সূরা ইবরাহিম, আয়াত ১৮)

আরো ইরশাদ হয়েছে- যারা কাফের, তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকা সদৃশ, যাকে পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে। এমনকি সে যখন তার কাছে যায়, তখন কিছুই পায় না এবং পায় সেখানে আল্লাহকে। তারপর আল্লাহ তার হিসাব চুকিয়ে দেন। আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। ( সূরা নূর, আয়াত ৩৯)