জামায়াত পরিচয়ে সাফাই সাক্ষী জানেন না আমিরের নাম

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

জামায়াতে ইসলামীর কর্মী পরিচয় দিয়ে রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন জুয়েল মাহমুদ। তবে সাক্ষ্যের সময় তিনি জামায়াতের মৌলিক তথ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করায় বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে।

গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।

সাক্ষ্য দেয়ার সময় জুয়েল মাহমুদ দাবি করেন, তিনি জামায়াতে ইসলামীর একজন কর্মী। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকে নানা সময়ে পুলিশি হেনস্তা ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তবে সাক্ষ্য শেষে প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ তাকে জামায়াতের সাংগঠনিক বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দিতে ব্যর্থ হন।

প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ জানতে চান, তিনি কোন এলাকার জামায়াতের কর্মী। জবাবে জুয়েল বলেন, তিনি ঢাকা দক্ষিণের ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের কর্মী। এ সময় প্রসিকিউটর জামায়াতের আমিরের নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, বলতে পারব না। পরে ওয়ার্ডের রুকনের নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকার রুকন একজন মহিলা, তবে এখন আমার নাম মনে নাই।’

জামায়াতের আমির বা রুকনের নাম না জানলেও ওই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম জানেন বলে প্রসিকিউটরের সামনে উল্লেখ করেন জুয়েল মাহমুদ। পরে তিনি সাংবাদিকদের কাছে নিজের বাড়ি বরিশালের গৌরনদী থানায় বলে পরিচয় দেন। মামলার আসামি শাহবাগ থানার তৎকালীন পরিদর্শক (অপারেশন) মো: আরশাদ হোসেনের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জুয়েল মাহমুদ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল ১০টায় তারা সায়েদাবাদ জনপথের মোড় থেকে মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের সামনে পুলিশের বাধার মুখে আসামি আরশাদ হোসেনের সাথে তাদের দেখা হয়। জুয়েল দাবি করেন, পরিচিত হওয়ায় আরশাদ হোসেন তাদের শহীদ মিনারে যাওয়ার অনুমতি দেন। তিনি আরো বলেন, ওই দিন দুপুরে তিনি আরশাদ হোসেনকে বলেছিলেন সরকারের পতন হয়ে গেছে। এরপর আরশাদ হোসেন কিছুক্ষণ চানখাঁরপুল মোড়ে গিয়ে ২০-২৫ জন পুলিশ সহকারে আবার ফিরে আসেন।

আসামির সাথে দীর্ঘদিনের পরিচয়ের কথা উল্লেখ করে জুয়েল বলেন, ২০১৪ সাল থেকেই তিনি আরশাদ হোসেনকে চেনেন। তখন আরশাদ যাত্রাবাড়ী থানায় কর্মরত ছিলেন। তিনি দাবি করেন, পরিচয়ের সূত্র ধরে আরশাদ হোসেন তাকে একাধিকবার পুলিশি হেনস্তা থেকে রক্ষা করেছেন।

তবে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলামের জেরায় জুয়েলের সাক্ষ্যে বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়ে। ২০১৪ সালে আরশাদের পদবি এবং ৫ আগস্টের ঘটনার সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি। এ ছাড়া ঘটনার দিন রাত ১০টার আগে তিনি চানখাঁরপুলে যাননি বলে স্বীকার করেন। সেখানে কারা গুলি করেছে বা হত্যাকাণ্ডটি কিভাবে ঘটেছে, তা তিনি দেখেননি বলে জানান।

১৫ ডিসেম্বর যুক্তিতর্কের দিন ধার্য

এর আগে ৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে নিজের পক্ষে নিজেই সাফাই সাক্ষ্য দেন আরশাদ হোসেন। জবানবন্দীতে জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে নিজের সরকারি দায়িত্ব পালন ও চানখাঁরপুলে কোনো ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেননি বলে জানিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া ওই দিন জবানবন্দী দিয়েছেন মো: সোলাইমান। সবমিলিয়ে আরশাদসহ তিনজন সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের জেরা শেষে যুক্তিতর্কের জন্য ১৫ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন প্রথমে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে প্রসিকিউশন।

ট্রাইব্যুনালে বুধবার প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলামসহ অন্যরা। এ ছাড়া আরশাদের আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন অভিসহ অন্যান্য আসামির আইনজীবীরা ছিলেন।

গত ৩০ নভেম্বর আরশাদ হোসেনের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য নেয়ার আবেদনের ওপর শুনানি করেন আইনজীবী অভি। পরে তার আবেদন মঞ্জুর করে তিনজন সাফাই সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়ার অনুমতি দেন ট্রাইব্যুনাল। গত ২৭ নভেম্বর এ আবেদন করেন তিনি। ওই দিন এ মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ আট আসামির বিরুদ্ধে মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো: মনিরুল ইসলামের জেরা শেষ করেন স্টেট ডিফেন্স ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। ১৯ নভেম্বর টানা তৃতীয় দিনের মতো তার সাক্ষ্য সম্পন্ন হয়। জবানবন্দী শুরু হয় ১২ নভেম্বর। সাক্ষ্যে গত বছরের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার পেছনে নিজের করা তদন্তের আদ্যোপান্ত উপস্থাপন করেন তিনি। জব্দকৃত সব তথ্যপ্রমাণাদি নিয়েও বর্ণনা দেন। এরপর জেরা শুরু করেন স্টেট ডিফেন্স ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। সবমিলিয়ে ২৩ কার্যদিবসে ২৬ সাক্ষীর সাক্ষ্য-জেরা নেন ট্রাইব্যুনাল।

এ মামলার গ্রেফতার চার আসামি হলেন শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো: আরশাদ হোসেন, কনস্টেবল মো: সুজন মিয়া, মো: ইমাজ হোসেন ইমন থও মো: নাসিরুল ইসলাম।

পলাতক আসামিরা হলেন- সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো: আখতারুল ইসলাম ও রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল। চলতি বছরের ১৪ জুলাই আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে গুলি চালায় পুলিশ। এতে বহু হতাহতের ঘটনার পাশাপাশি শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ জুনায়েদ, মো: ইয়াকুব, মো: রাকিব হাওলাদার, মো: ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক নিহত হন।