অবক্ষয়ে অস্থির সমাজ

Printed Edition
islami logo
অবক্ষয়ে অস্থির সমাজ

মুহাম্মদ সালমানুল হক আনাস

আজকের সমাজ যেন মূল্যবোধহীনতার এক অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত। শিষ্টাচারের জায়গায় অভদ্রতা, সততার জায়গায় প্রতারণা, ন্যায়বিচারের জায়গায় স্বার্থপরতা, পারিবারিক বন্ধনের জায়গায় বিচ্ছিন্নতা দানা বেঁধেছে। এই অবক্ষয়ের ভয়াবহ রূপ আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ছায়া ফেলে। ইসলাম এই সামাজিক অবনতি রোধে কেবল সমাধানই দেয়নি, দিয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ সমাজব্যবস্থার কাঠামো।

কুরআনের দৃষ্টিতে নৈতিক অবক্ষয়ের উৎস : আল্লাহ তায়ালা বলেন- মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, যাতে আল্লাহ তাদেরকে কিছু (অবক্ষয়ের) স্বাদ আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে। (সূরা রুম-৪১) এই আয়াতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, সামাজিক বিপর্যয়ের মূল উৎস মানুষের পাপাচার ও আল্লাহর নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন। দুনিয়ার যেকোনো বিশৃঙ্খলা মূলত আত্মিক ও নৈতিক স্খলনেরই বহিঃপ্রকাশ।

রাসূলুল্লাহ সা:-এর সমাজ সংস্কার পদ্ধতি : জাহেলিয়াতের অন্ধকার যুগে যখন নারীরা ভোগ্যপণ্যে পরিণত, গরিব ছিল পদদলিত, মিথ্যাচার ছিল নিত্যনৈমিত্তিক- ঠিক তখনই নবীজি সা: দুনিয়ায় আসেন আলোকবর্তিকা হয়ে। তিনি বলেন, ‘আমি প্রেরিত হয়েছি চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য।’ (মুসনাদে আহমাদ-৮৯৫২) তিনি মক্কার সমাজে সর্বপ্রথম যে বিপ্লব আনেন তা হলো হৃদয়ের বিপ্লব। মানুষকে ভেতর থেকে ঠিক না করলে বাহ্যিক সমাজ কখনো সুস্থ হয় না এই ছিল তাঁর মূলনীতি।

পরিবার থেকে সমাজ গঠন : ইসলাম মনে করে, সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি পরিবার। পরিবারে যদি আদব-কায়দা, হায়া, আল্লাহভীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে, তবে সেটিই সমাজে ইতিবাচক ঢেউ তোলে।

আল্লাহ বলেন- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সূরা তাহরিম-৬) এই আয়াত নির্দেশ করে পারিবারিক পর্যায়ে সঠিক তাওহিদ, দ্বীন শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের মাধ্যমে বৃহৎ সমাজ সংস্কার শুরু হয়।

ইসলামে অবক্ষয় রোধে সামাজিক দায়িত্ব : ইসলাম প্রত্যেক মুসলমানকে সমাজের দায়ভার দেয়। অন্যায় দেখলে তা রোধ করা, ভালো কাজের আদেশ দেয়া এবং খারাপ কাজ থেকে ফিরানো এই তিনটি ইসলামী সমাজের স্তম্ভ।

রাসূল সা: বলেন, ‘তোমাদের কেউ যদি কোনো মন্দ কাজ দেখে, সে যেন তা নিজ হাতে প্রতিহত করে; না পারলে মুখে বলুক; আর তাও না পারলে অন্তরে ঘৃণা করুক এটিই ঈমানের দুর্বলতম স্তর।’ (মুসলিম-৪৯) এখানে ইসলামী সমাজ গঠনে প্রতিটি ব্যক্তিকে অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে। চুপ থাকা নয়; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই প্রকৃত সমাজবোধ।

প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি অবক্ষয়ের নতুন উৎস : আজকের যুগে বিনোদনের নামে অশ্লীলতা, স্বাধীনতার নামে বেহায়াপনা, মিডিয়ার নামে চরিত্রহীনতা এসবই সামাজিক অবক্ষয়ের নতুন রূপ। ইসলাম এসব বিষয়ে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দেয়। নবীজি সা: বলেন, ‘যখন তুমি কোনো লজ্জাহীনতা দেখবে, তখন জেনে নিও কিয়ামতের সময় খুব নিকটবর্তী।’ (মুসনাদে আহমাদ-১৬৫২২)

সামাজিক অবক্ষয় রোধে ইসলাম কোনো সাময়িক কৌশল নয়; বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি ও নীতিমালার দিশা দেয়। হৃদয়ের তাকওয়া, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং হালাল-হারামের সীমারেখা এই সব কিছু মিলেই গঠিত হয় সুস্থ সমাজ।

আমরা যদি ইসলামের এই আদর্শের পথে ফিরে আসি, তবে সমাজের অস্থিরতা আর অনিয়ম নিশ্চয়ই প্রশান্তিতে রূপ নেবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসা, চট্টগ্রাম