স্বল্পমেয়াদি বিদেশী ঋণে দশ বছরে তিনগুণ চাপ
২০১৪ সালে যেখানে বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক দায় ছিল ৩.৭৮ বিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬.৪ বিলিয়ন ডলারে। যদিও ২০২৩ ও ২০২৪ সালে প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ২০২৫ সালে আবার ঋণের চাপ নতুন মাত্রায় ফিরে আসে।
Printed Edition
বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ গত এক দশকে বিপজ্জনক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত ‘ইন্সট্রুমেন্ট-ওয়াইজ শর্ট-টার্ম এক্সটার্নাল ডেট’ পরিসংখ্যান বলছে- ২০১৪ সালে যেখানে বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক দায় ছিল ৩.৭৮ বিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬.৪ বিলিয়ন ডলারে। যদিও ২০২৩ ও ২০২৪ সালে প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ২০২৫ সালে আবার ঋণের চাপ নতুন মাত্রায় ফিরে আসে।
এই ঋণের বড় অংশই বায়ার’স ক্রেডিট, ডিফার্ড পেমেন্ট, এক্সপোর্ট বিল ডিসকাউন্টিং, স্বল্পমেয়াদি ঋণ এবং ফরেন ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি এসব উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উৎস থেকে নেয়া, যা মূলত ডলারের ওপর নির্ভরশীল।
২০১৪-২০২৫ : কোন ঋণ কোথা থেকে কত?
২০১৪ থেকে ২০২৫ (সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত সরকারি নথির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে উঠে আসে-
বায়ার’স ক্রেডিট : সবচেয়ে বড় লাফ : ২০১৪ সালে বায়ার’স ক্রেডিট ছিল ১.০১ বিলিয়ন ডলার। ২০২২ সালে তা দাঁড়ায় ৯.৫৬ বিলিয়ন ডলারে, ৯ বছরে ৯৪০ শতাংশ বৃদ্ধি। ২০২৫ সালে মাসওয়ারি হিসাবে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ৫.০৮ বিলিয়ন ডলারের বায়ার’স ক্রেডিট আগস্টে কমে দাঁড়ায় ৪.৫৩ বিলিয়নে, কিন্তু সেপ্টেম্বরে কিছুটা বেড়ে পৌঁছায় ৪.১৫ বিলিয়নে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ডলারের সঙ্কট মোকাবেলায় বৈদেশিক উৎস থেকে ব্যয়বহুল বায়ার’স ক্রেডিট নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়াবে।
ডিফার্ড পেমেন্ট : ধীরে ধীরে বাড়ছে ঝুঁকি : ২০১৪ সালে ৪০১ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৩ সালে তা ৮৬৭ মিলিয়ন ডলার হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ডিফার্ড পেমেন্ট দাঁড়ায় ৬৯৭ মিলিয়ন ডলারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন- ডিফার্ড পেমেন্ট বৃদ্ধি মানে আমদানি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ভবিষ্যতে জমা হয়ে আরো বড় চাপ তৈরি করবে।
এক্সপোর্ট বিল ডিসকাউন্টিং : ২০১৫-২০২৩ এ শূন্য, ২০২০ থেকে উল্লম্ফন : ২০১৫-১৯ সময়কালে এই খাতে কোনো দায় ছিল না। কিন্তু ২০২০ সালে এ খাতে ২.৯৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ঋণ নেয়া হয়, যা ২০২১-২২ সালে আরো বাড়ে। ২০২৩-২৫ সালে মাসওয়ারি হিসেবে ২.২৬ বিলিয়ন ডলার মাত্রায় স্থিতিশীল দেখা যায়।
এটিকে বিশেষজ্ঞরা ‘লিকুইডিটি সঙ্কটের সবচেয়ে বড় নির্দেশক’ বলে মনে করছেন।
স্বল্পমেয়াদি ঋণ : দ্রুত বাড়ছে ডলার নির্ভরতা : ২০২০ সালে যেখানে স্বল্পমেয়াদি ঋণ ছিল মাত্র ৫৭৩ মিলিয়ন ডলার, ২০২৪ সালে তা দাঁড়ায় ১.২৭ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেও এ খাতে দায় ১.১৪ বিলিয়ন ডলার; যা আমদানি ব্যয়চাপ ও ব্যাংকিং খাতের ক্যাশফ্লো সঙ্কটকে তুলে ধরে।
ফরেন ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি : রফতানি খাতে চাপের সূচক : ২০১৪ সালে এই দায় ছিল ২.৩৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালে এটি কমে মাত্র ৭০২ মিলিয়নে নেমে আসে। কিন্তু ২০২৩-২৫ সালে আবার ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দাঁড়ায় ৯৫২ মিলিয়ন ডলার।
মোট স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ- কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?
নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বছরের চিত্র-
বছর মোট দায় (বিলিয়ন মার্কিন ডলার)
২০১৪ ৩.৭৭
২০১৮ ৭.২৮
২০২০ ৯.১৮
২০২১ ১৫.৪৬
২০২২ ১৬.৪১
২০২৩ ১১.৭৯
২০২৪ ১০.১৩
২০২৫ (সেপ্টেম্বর) ৯.৬১
২০২১-২২ সালে বৈদেশিক ঋণ সর্বোচ্চ হয়ে ১৬ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠেছিল, যা দেশের রিজার্ভ-সঙ্কটের সূচনাকাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০২৩-২৫ সালে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেলেও ঋণের কাঠামো এখনো ঝুঁকিপূর্ণ।
কেন বাড়ছে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক দায় : অর্থনীতিবিদদের মতে পাঁচটি প্রধান কারণ হলো- ডলার বাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় ও ইনভেন্টরির ওপর চাপ,ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নতুন রফতানি আদেশ কমে যাওয়া এবং বেসরকারি খাতে উচ্চ ঝুঁকির ঋণ মডেল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এক ডেপুটি গভর্নর বলেন- ‘২০২১-২২ সালে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ে যে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিয়েছিল, তারই দায় এখনো বহন করতে হচ্ছে। রিজার্ভ কম থাকায় পরিশোধের চাপ ভবিষ্যতে বাড়বে।’
২০২৫-এর ট্রেন্ড : স্থিতিশীলতা না নতুন বিপদ?
২০২৫ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণ সামগ্রিকভাবে কমলেও ডাটা বলছে- বায়ার’স ক্রেডিট কমছে খুব ধীরে, এক্সপোর্ট বিল ডিসকাউন্টিং ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি আবার বাড়ছে, স্বল্পমেয়াদি ঋণ এখনো ১ বিলিয়ন ডলারের ওপরে, ডলার-সঙ্কট ও বর্তমান আমদানি প্রবণতার ফলে ভবিষ্যৎ ত্রৈমাসিকগুলোতে ঋণ বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ‘যদি রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রত্যাশামতো না বাড়ে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ মোট স্বল্পমেয়াদি বিদেশী ঋণ আবার ১১-১২ বিলিয়ন ডলারের দিকে যেতে পারে।’
দেশের বেসরকারি খাতের স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ এখনো উচ্চ ঝুঁকির পর্যায়ে রয়ে গেছে। ২০২১-২২ সালের অতিরিক্ত ঋণগ্রহণের প্রভাব ২০২৫ সালেও বহন করছে ব্যাংক খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতি। রিজার্ভ ঘাটতি, ডলারবাজারের অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় এখান থেকে উত্তরণে আরো কৌশলগত ঋণবিন্যাস, আমদানি-রফতানি ভারসাম্য এবং কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে।