হরমুজ প্রণালী জোরপূর্বক খোলার প্রস্তাবে রাশিয়া-চীন-ফ্রান্সের ভেটো
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ প্রণালী জোরপূর্বক খুলতে সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদন চেয়ে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে আনা প্রস্তাব ভেটো দিয়ে আটকে দিয়েছে রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স। খবর নিউ ইয়র্ক টাইমসের। জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেয় ইরান।
ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, প্রণালিটি এখন তাদের নৌবাহিনীর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং শত্রুদের জন্য এটি বন্ধই থাকবে। এই অবরোধের ফলে গত এক মাসে পারস্য উপসাগরে অন্তত দুই হাজার ১৯০টি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়েছে, যার মধ্যে ৩২০টির বেশি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রফতানি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানি সঙ্কট আরো তীব্র হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী খুলতে জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে বল প্রয়োগের অনুমতি চেয়ে নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে বাহরাইন। প্রস্তাবটি ঘিরে গতকাল শুক্রবার ভোট হওয়ার কথা ছিল। তবে ভেটো ক্ষমতাধর তিন দেশ- রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স- এটির বিরোধিতা করায় প্রস্তাবটি পাস হয়নি। দেশগুলো জানায়, সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দেয় এমন কোনো উদ্যোগের তারা নীতিগতভাবে বিপক্ষে। জাতিসঙ্ঘের কূটনৈতিক সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ইস্যুতে চীন ও রাশিয়া প্রায়ই ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে ফ্রান্সের অবস্থান নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, সামরিক অভিযানের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার ধারণা ‘অবাস্তব’। দক্ষিণ কোরিয়া সফরকালে তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগবে এবং এতে নৌ চলাচল আরো ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তিনি আরো জানান, সঙ্ঘাত শেষে হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ও মিত্র দেশগুলোর সাথে যৌথভাবে কাজ করবে ফ্রান্স। একই সাথে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ সঙ্কটের সমাধান কেবল ইরানের সাথে আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।
হরমুজ সচল করতে ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকার ৪০ দেশের জোটের
এ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের প্রভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে ব্রিটেনের নেতৃত্বে একজোট হয়েছে ৪০টি দেশ। হরমুজ খোলার বিকল্প উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে এই দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বৃহস্পতিবার ভার্চুয়াল সম্মেলনে বসিয়েছে ব্রিটেন। তারা একটি বিবৃতি সই করে ইরানকে হরমুজ প্রণালী অবরোধ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে এবং এই নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাযথ প্রচেষ্টায় অবদান রাখার অঙ্গীকার করেছে।
বৃহস্পতিবারের সম্মেলনের সভাপতিত্বকালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেন, নৌপথটি অবরুদ্ধ করে রাখার ইরানের ‘বেপরোয়া আচরণ’ আমাদের ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বিঘিœত করছে।” সম্মেলনের শুরুতে গণমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যে কুপার বলেন, “আমরা দেখছি ইরান একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ দখল করে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে রেখেছে।” তার এই প্রারম্ভিক বক্তব্যের পর বৈঠকের বাকি অংশ রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই সম্মেলনে ৪০টি দেশ অংশ নিলেও যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ছিল না। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এই নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আর তার দেশের কাজ নয়। ট্রাম্প একই সাথে এই যুদ্ধে সমর্থন দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা করেছেন এবং ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেয়ার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
ইরানের সবচেয়ে উঁচু সেতুতে হামলা, ট্রাম্প বললেন ‘আরো আসছে’
এ দিকে ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেয়া হবে- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন হুমকির পর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় ইরানে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে উঁচু সেতু আংশিক ধ্বংস হয়ে গেছে। এ হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছে ও শতাধিক আহত হয়েছে বলে ইরানি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানিয়েছে এনডিটিভি।
নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়া বি-ওয়ান সেতুটি তেহরানের সাথে পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানি শহর কারাজের সংযোগ স্থাপন করত। ১৩৬ মিটার উঁচু এ সেতুটি মধ্যপ্রাচ্যে অনবদ্য প্রকৌশলের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে সেতুটির একাংশ ধসে পড়তে ও সেখান থেকে ব্যাপক ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়।
সেতুটিতে বৃহস্পতিবার কিছু সময়ের ব্যবধানে দুই দফা হামলা চালানো হয়েছে বলে জানায় ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। প্রথম হামলায় দুই বেসামরিক নিহতের কথা নিশ্চিত করে দ্বিতীয় হামলার পর তারা বলে, “কয়েক মিনিট আগে মার্কিন-জায়নবাদী শত্রুরা আরো একবার কারাজের বি-ওয়ান সেতুকে নিশানা করেছে।”
প্রথম হামলায় হতাহতদের সহায়তায় জরুরি পরিষেবা সংস্থার দলগুলো সেতুতে ছুটে যাওয়ার পর দ্বিতীয় হামলাটি হয় বলেও তারা দাবি করেছে। দুই দফা হামলায় মোট আটজন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছে বলে পরে জানায় ইরানি গণমাধ্যমগুলো। ট্রাম্প সেতুটিতে হামলার দৃশ্য ট্রুথ সোস্যালে পোস্ট করে লেখেন, “ইরানের সবচেয়ে বড় সেতুটি গুঁড়িয়ে দেয়া হলো আর কখনোই ব্যবহার করা যাবে না। আরো আসছে।”
এর আগে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধে জয় দাবি করে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর পদক্ষেপে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ‘মূল কৌশলগত উদ্দেশ্য প্রায় পূরণ হওয়ার পথে’ থাকায় ‘দ্রুতই তাদের কাজ শেষ হবে।’
জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে মার্কিন এ কমান্ডার-ইন-চিফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আগামী দুই-তিন সপ্তাহ ইরানে ‘অত্যন্ত কঠোর’ আঘাত হানবে। ভাষণে তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি কোর (আইআরজিসি) বি-ওয়ান সেতুতে হামলার পাল্টায় কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব-বাহরাইন ও জর্দানের আটটি সেতুকে নিশানা করার হুমকি দিয়েছে বলে জানিয়েছে আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফারস।
এই আট সেতুর মধ্যে কুয়েতের শেখ জাবের আল-আজমেদ আল-সাবাহ সমুদ্র সেতু, আরব আমিরাতের শেখ জায়েদ ও শেখ খলিফা সেতু, সৌদি আরব ও বাহরাইনকে সংযুক্ত করা কিং ফাহাদ সংযোগ সেতু এবং জর্দানের কিং হুসেইন সেতুও আছে বলে জানিয়েছে তুর্কি সংবাদমাধ্যম আনাদোলু।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল অনুতপ্ত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরান। দেশটির সশস্ত্রবাহিনীর মুখপাত্র আবোলফজল শেখারচি জানিয়েছেন, আগ্রাসী পক্ষ অনুতপ্ত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে তেহরান। গতকাল শুক্রবার এক বক্তব্যে ইরানের সশস্ত্রবাহিনীর শীর্ষ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবোলফজল শেখারচি বলেন, ইরানের কৌশল শুধু পাল্টা হামলায় সীমাবদ্ধ নয় বরং এমন শাস্তি দেয়া যাতে ভবিষ্যতে কেউ হামলার সাহস না করে। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির পর আবার হামলার সুযোগ সৃষ্টি হোক এটি ইরান চায় না। বরং স্থায়ীভাবে হুমকি নির্মূল করাই তাদের লক্ষ্য।
মার্কিন সেনাপ্রধান অপসারিত
এ দিকে সিবিএস নিউজ ও বিবিসি জানায়, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ রেন্ডি জর্জকে পদত্যাগ করতে বলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল বলেছেন, “জর্জ সেনাবাহিনীর ৪১তম চিফ অব স্টাফের পদ থেকে অবসর নিচ্ছেন, যা এখন থেকেই কার্যকর হচ্ছে।” যুক্তরাষ্ট্রের সেনাপ্রধানরা সাধারণত চার বছরের মেয়াদ শেষেই অবসরে যান। জর্জের বেলায় তার ব্যতিক্রম ঘটল।
ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি অ্যাকাডেমি থেকে ডিগ্রি নেয়া, সামরিক বাহিনীতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জর্জকে ২০২৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সেনাপ্রধান পদে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ ‘খুব দ্রুতই’ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে এমনটা বলার পরই তার প্রশাসন সেনাপ্রধান পদে রদবদলের পথে হাঁটল।
জর্জ প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে পদাতিক বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন; পরে তিনি ইরাক ও আফগানিস্তানেও দায়িত্ব পালন করেন। কেন তাকে সরে যেতে বলা হল, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। “আমরা তার দীর্ঘদিনের কাজে কৃতজ্ঞ, কিন্তু এখন সময় এসেছে সেনাবাহিনীতে নেতৃত্ব বদলের,” নাম প্রকাশে রাজি না হওয়া ঊর্ধ্বতন এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এমনটাই বলেছেন।