কেরানীগঞ্জে নকল পণ্য কারখানার ছড়াছড়ি

Printed Edition

শামীম হাওলাদার

ঢাকার কেরানীগঞ্জজুড়ে শিশু খাদ্যসহ নামিদামী কোম্পানির নানা নকল পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। এসব উৎপাদিত পণ্য চকবাজারের কয়েকটি মার্কেটে পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর খুচরা ব্যবসায়ী ছাড়াও গ্রামগঞ্জের দোকানিরা তা কিনে নিচ্ছেন। স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা ও থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে ভোক্তাদের মৃত্যুঝুঁকিতে ফেলছে ওইসব কারখানা মালিক ও অসাধু কিছু ব্যবসায়ী।

জানা গেছে, কেরানীগঞ্জ উপজেলার জিনজিরায় নকল পণ্য উৎপাদিত হয়। বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় নিউজ হওয়ায় থানা পুলিশ ছাড়াও র‌্যাব অভিযান চালিয়ে তা বন্ধ করে দেয়। কিছুদিন বন্ধ থাকার পরে আবার কেউ কেউ তা চালু করে দিব্যি উৎপাদন করে বাজারজাত করছে। তবে এখন পুরো উপজেলার বিভিন্ন স্পটে দেশ-বিদেশের নামিদামী কোম্পানির নানা পণ্য তারা উৎপাদন করছে। আমেরিকার কোম্পানি মারকার এসপেন্সের নানা পণ্য ছাড়াও শিশু খাদ্য কিটক্যাট, লজেন্স, আচার, পাউডার ও তরল দুধ, চিপস ছাড়াও সিগারেট, কসমেটিকস, গুড় ও মিষ্টিসহ শত শত পণ্যের নকল কারখানা রয়েছে। এমনকি ওষুধ ভেটনোভিট সি, এন ভানর, ক্রেক, বিগার্ড ও ইজ গার্ড তৈরি করা হচ্ছে। এসব কারখানা থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেয় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও থানা পুলিশ।

সূত্র জানায়, কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন স্পটে নকল পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। আর এসব পণ্য চকবাজারের খান মার্কেট, আশিক টাওয়ার, ফেন্সি মার্কেট, আমিন মার্কেট, ন্যয়না মার্কেট, মুনসুর খান ও ইকরামুল প্লাজার বিভিন্ন দোকানে পাওয়া যাচ্ছে। তারা খুরচা কোনো মালামাল বিক্রি করছে না। রাজধানী ছাড়াও দেশের জেলা উপজেলার বড় ব্যবসায়ীরা কিনে খুরচা বিক্রি করছে। এসব নকল পণ্য মৌলভী বাজার তুষার স্টোরের মালিক দুই সহোদর সামসু ও আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে তৈরি করা হচ্ছে। ওই সব কারখানার মালিকদের অগ্রিম টাকা দিয়ে এসব নকল পণ্য উৎপাদন করে তার দোকানে পাঠায়। বরিশুর খেয়াঘাট থেকে নদী পাড় হয়ে সোয়ারীঘাট দিয়ে মালামাল আনা হয়।

শিশুখাদ্য : উপজেলার গদাবাগে জনতা বিস্কুট কোম্পানির আড়ালে শিশু খাদ্য ভারতীয় কিটক্যাট, লজেন্স, পাউডার দুধ লেকটোজেনসহ চিপস ও নামিদামী কোম্পানির নানা পণ্য উৎপাদন করছে। যদিও এ কোম্পানি খুলনায় অবস্থিত। ওখানে নকল পণ্য উৎপাদন করা যাবে না বলে এখানে উৎপাদন করছে। ওই কারখানার মালিক আতিয়ার রহমান। তার উৎপাদিত পণ্য জিনজিরা বাজার ছাড়াও রাজধানীর চকবাজারের খান মার্কেট, আশিক টাওয়ার ও ফেন্সী মার্কেটের বিভিন্ন দোকানে পাওয়া যাচ্ছে।

ওষুধ : বরিশুর বাজার সংলগ্ন বেড়িবাঁধের পাশে কারখানা করে নকল ওষুধ ভেটনোভিট সি, ভেটনোভিট এন ভানোর, ক্রেক, বিগার্ড ও ইজি গার্ড নামক মলম উৎপাদন করা হচ্ছে। সামসু নামে এক অসাধু ব্যবসায়ী এই কারখানার মালিক। চকবাজারের আমিন মার্কেট, ন্যয়না মার্কেট, মুনসুর খান ও ইকরামুল প্লাজায় মিলে ওই ওষুধ। এ ছাড়া মৌলভী বাজার তুষার স্টোরের মালিক সামসু ও আলাউদ্দিন এ ব্যবসার সাথে জড়িত। এর আগে র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম তাদের কিরুদ্ধে মামলা দিলে বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকার পরে আবার তারা কারখানা চালু করছে।

কসমেটিকস : উপজেলার আটিবাজার, কুইষারবাগ, পশ্চিম বরিশুড় ও বাগবাড়ি এলাকায় বহু কসমেটিকসের নকল কারখানা গড়ে উঠেছে।

আটিবাজার : সোহাগের কারখানায় নামিদামী কোম্পানির আমলা তেল, কুমাড়ি তেল, শিসা, ভাটিকা ও গ্লো এন্ড লাভলী নকল উৎপাদন করছে। এসব মালামাল মৌলভীবাজার তুষার স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে।

কুইষারবাগ : এরিস্টো ফার্মা গলি পুকুর পাড়ে রকি নামে একজনের কারখানায় নকল কসমেটিকস কারখানায় আমলা তেল, কুমাড়ি তেল, শিসা, ভাটিকা, গৌরি ক্রিম ডিউ ক্রিম তৈরি করছে।

পশ্চিম বরিশুড় : হিমেল নামে এক ব্যক্তির কারখানায় জনসনের তেল, শেম্পু, পাউডার, লোশন ও ফেশওয়াস তৈরি করা হচ্ছে। এসব পণ্য মৌলভীবাজার তুষার স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া তরিকুল নামে আরেক জন একই এলাকায় স্যালুনের সব ধরনের ব্লেড ও কসমেটিকস তৈরি করছে। তাও ওই স্টোরে মিলছে।

বাগবাড়ি : এলাকায় বড় দুইটি নকল কসমেটিকস কারখানা রয়েছে। তার মধ্যে একটি পরিচালনা করে সাদ্দাম এবং অন্যটি তরিকুল। সাদ্দামের কারখানায় প্যারাসুট, আমলা, কুমাড়িকা ও বেলীফুল তেল তৈরি করা হয়। আর তরিকুলের কারখানায় সেভেন ওয়েল, জনসন কুমাড়িকা ও আমলা তেল উৎপাদন করা হয়। তাকে র‌্যাব বারবার আটক করে জেল জরিমানা করলেও আবার সে একই ব্যবসা করে আসছে।

চুনকুটিয়া : এলাকার সাবান ফ্যাক্টরি গলিতে আনোয়ার নামে এক ব্যক্তির তামাক কারখানা রয়েছে। ওখানে গোল্ডলিফ ও ব্যানসন সিগারেট ছাড়াও শেখ ও ক্যামেল সিগারেট তৈরি করা হচ্ছে। এসব সিগারেট মৌলভীবাজার বহু স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর আটিবাজার এলাকায় একটি বিলাসবহুল বাড়ির ভেতরে গড়ে তোলা গোপন কারখানায় নকল প্রসাধনী তৈরির অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব-১০ এর ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় অভিযানে তিনটি কারখানা থেকে বিপুল পরিমাণ নকল প্রসাধনী ও ওষুধ জব্দ করা হয়। দুইটি কারখানাকে মোট তিন লাখ টাকা জরিমানা এবং একটি কারখানা সিলগালা করা হয়। এ দিকে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসির বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। অপরাধীদের সাথে সখ্য করে তিনি মাসোহারা নিচ্ছেন।

কেরানীগঞ্জ উপজেলার ইউএনও মোহাম্মদ ওমর ফারুক নয়া দিগন্তকে বলেন, জয়েন্ট করার পর থেকেই জানতে পেরেছি এ উপজেলায় নকল কারখানার অভাব নেই। তাই তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ঢাকা জেলা অতিরিক্ত এসপি ক্রাইম দক্ষিণ মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, নকল পণ্য উৎপাদনকারীকে কোনোভাবেই ছাড় দেয়া হবে না। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।