পুঁজিবাজারে আসেনি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসহ বহুজাতিক কোম্পানির সরকারি অংশ

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর

Printed Edition

নাসির উদ্দীন চৌধুরী

জনস্বার্থে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে শুধু সরকারের সদিচ্ছাই যে যথেষ্ট নয়, তা আবারো প্রমাণিত হলো। দেশের পুঁজিবাজারের গভীরতা বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে আগের সরকারগুলোর মতো অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারও ব্যর্থ হয়েছে। হাতে মাত্র ক’টা দিন। আর এ সময়ের মধ্যে কোনোভাবেই তা সম্ভব নয়। আর এভাবে বিগত সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারও ব্যর্থ হলো খোদ সরকারের মালিকানায় থাকা এসব প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে যা ছিল পুঁজিবাজারের দীর্ঘ দিনের দাবি।

২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেয়ার পর কিছুটা দেরিতে হলেও দীর্ঘ দিন ধরে চরম অনিয়ম ও অবহেলায় থাকা পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ওই বছরের ১৮ আগস্ট পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ দেয় অর্থমন্ত্রণালয়। পরবর্তী সময়ে কমিশনকে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি পুঁজিবাজারের সংস্কার কর্মকাণ্ডকে ত্বরান্বিত করতে বিশেষ সহকারীর নিয়োগ দেয় এ ক্ষেত্রে দক্ষ ড. আনিসুজ্জামানকে। কিন্তু আগের সরকারের আমলের পুরো ১৫ বছরের ও বেশি সময় ধরে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার শিকার পুঁজিবাজারকে ঠিক করা এত সহজ ছিল না। এরই মধ্যে নতুন কমিশনের সাথে বিএসইসির কর্মকর্তা কর্মচারীদের বনিবনা নিয়েও নিয়ন্ত্রক সংস্থায় চলছিল ঠাণ্ডা যুদ্ধ। এ খবর একপর্যায়ে বাজারে ছড়িয়ে পড়লে বাজার আচরণে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ধারাবাহিকতা পতনের শিকার হতে থাকে পুঁজিবাজার। একপর্যায়ে অর্থমন্ত্রণালয়ের সম্মতি নিয়ে কঠোর অবস্থানে যায় কমিশন। চাকরিচ্যুত করে বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে।

পরবর্তী সময়ে প্রধান উপদেষ্টার পুঁজিবাজারবিষয়ক সহকারীর নেতৃত্বে পুঁজিবাজারের সবপর্যায়ের স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা করে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পুঁজিবাজার সংস্কার কমিটি গঠিত হয়, যারা সংশ্লিষ্ট সবার সাথে আলাপ- আলোচনার মাধ্যমে কমিশনে নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর সুপারিশ জমা দেয়। আর এভাবে আইনগত বেশ কিছু সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে গেলেও পুঁজিবাজারের গভীরতা বৃদ্ধির জন্য ভালো কোম্পানির শেয়ারের প্রবাহ বৃদ্ধির বিষয়টি বরাবরের মতো অধরাই রয়ে যায়। অথচ এরই মধ্যে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক পতন ঘটতে থাকে। বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ রাস্তায় নেমে আসে। এক দিকে বিক্ষোভ চলতে থাকলেও পুঁজিবাজারের পতন থামে না। দিনের পর দিন বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, ডিএসই ও আইসিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০২৫ সালের ১১ মে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় তারই নেতৃত্বে অর্থ মন্ত্রণালয় ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে পুঁজিবাজারের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর প্রধান উপদেষ্টা বেশ কিছু দিকনির্দেশনা প্রদান করেন, যার অন্যতম ছিল পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারের প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে তালিকাভুক্তির বাইরে থাকা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়া। আর একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুততম সময়ে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসা, যাতে বাজারে মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ার বৃদ্ধি পায়।

পরবর্তী সময়ে প্রধান উপদেষ্টার দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নে পুঁজিবাজার সংস্কার কমিটি বেশ কয়েকবার এ বিষয়ে উদ্যোগ নিলেও ওই বছর তার উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। সর্বশেষ গত ৭ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ে অর্থ উপদেষ্টার সভাপতিত্বে এ-সংক্রান্ত সব পক্ষকে নিয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় যেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থাকা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরাসহ বহুজাতিক কোম্পানির প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেন তাদের বৈঠক সফল হয়েছে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বে¡ থাকা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। খুব দ্রুতই কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেয়া হবে। আর বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে দ্রুততম সময়ে তাদের পর্ষদ সভা করার মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়সীমা শেষ হতে চললেও এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।

৭ জানুয়ারির ওই বৈঠকে আলোচনায় উঠে আসা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে- কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড, সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেড, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড, ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড, সিনোভিয়া বাংলাদেশ লিমিটেড, নোভার্টিস (বাংলাদেশ) লিমিটেড ও নেসলে বাংলাদেশ পিএলসি।

এদের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর পুরো শেয়ারই সরকারের। এ ছাড়া বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভার বাংলাদেশের মোট শেয়ারের ৩৯ শতাংশ বাংলাদেশ সরকারের মালিকানায় রয়েছে। এ ছাড়া নোভার্টিস বাংলাদেশ যেটি সম্প্রতি দেশীয় কোম্পানি রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যাল অধিগ্রহণ করে নিয়েছে তাতে সরকারের শেয়ার রয়েছে ৪০ শতাংশ। বিগত সরকারগুলো জনস্বার্থে বিভিন্ন সময় উল্লিখিত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের সরকারি অংশ বাজারে ছাড়তে চাইলেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্রতিনিধিরা বরাবরই তাদের পর্ষদ সভার সিদ্ধান্তের দোহাই দিয়ে তা দীর্ঘায়িত করে থাকে। এ ছাড়া নেলে বাংলাদেশ দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশে ব্যবসা করে এলেও পুঁজিবাজারে শেয়ার ছাড়ার ক্ষেত্রে তারা কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

এর আগে ২০০৬ সালে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের সময় রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ খাতের দু’টি কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) পুঁজিবিাজারে তালিকাভুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জা আজিজুল ইসলামের সময় রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বাজারজাতকরণ কোম্পানি যমুনা অয়েল ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বিগত সরকারের আমলে দু-দু’বারের অর্থমন্ত্রী ড. আবুল মাল আবদুল মুহিতও বারবার চেষ্টা করেছেন এসব প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিাবাজারে আনতে। বরাবরই তিনি আক্ষেপ করে গেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অসহযোগিতার কারণে তা পেরে ওঠেননি।

রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আনতে হলে সাধারণত রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) মাধ্যমেই আসে। কিন্তু এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি এ-সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব পায়নি। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদের কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, সবশেষ ৭ জানুয়ারির মিটিংয়ে যা আলোচনা হয়েছে এর বাইরে কিছুই এগোয়নি। এ সরকারের হাতেও আর সময় নেই। এ অবস্থায় নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে তাদেরকেই এ দায়িত্ব¡ নিতে হবে।

বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিধ আরো বলেন, সরকার শুধু সিদ্ধান্ত নিয়েই দায়িত্ব শেষ করলে হবে না। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ও যেসব বহুজাতিক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার রয়েছে তার একটি অংশ বাজারে ছাড়তে কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করতে হবে। কারণ এটা রাষ্ট্রের সম্পত্তি। সরকার চাইলে কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে বাধ্য। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে যেটা ঘটে তা হলো যারা এগুলোর দায়িত্বে রয়েছে তারা কোম্পানিগুলো থেকে এখন যেসব সুযোগ-সুবিধা পায়, তা হারানোর ভয় করছে।

পক্ষান্তরে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এ দেশে ব্যবসা করলেও তারা সবসময়ই ঝামেলা মুক্ত থাকতে চায়। এ ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করতে হবে অথবা তালিকাভুক্তির বাইরে থাকতে হলে তাদেরকে আরো বেশি পরিমাণ শুল্ক আরোপের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আবার কোম্পানিগুলো যাতে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত হয় সে জন্য তালিকাভুক্তির পর শুল্ক কমানোও যেতে পারে। এভাবে আলোচনাসাপেক্ষে যেকোনো মূল্যেই তাদের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

জানতে চাইলে পুঁজিাবাজরের সবচেয়ে বড় স্টেক হোল্ডার ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট মো: সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা খুবই হতাশ। আমরা আশা করেছিলাম অতীতে রাজনৈতিক সরকারগুলো যেটা পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার সেটি পারবে; কিন্তু তারাও পারল না। থবে আমরা আশা করব ভবিষ্যতে যে দলই ক্ষতমায় আসুক তারা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুততম সময়ে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে উদ্যোগ নেবে। কারণ এখন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পুঁজিবাজার একটি বড় অংশ। এটি দিনের পর দিন বাড়তে থাকবে; কিন্তু আমাদের পুঁজিবাজার সে দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। যারাই আগামীতে ক্ষমতায় আসুক তাদেরকেই এ দায়িত্ব নিতে হবে।