যমুনা-ব্রহ্মপুত্রে নাব্যতা সঙ্কট, অচল নৌপথ

কাজে আসছে না ১৭৫ কোটি টাকার টার্মিনাল

Printed Edition

খাদেমুল বাবুল জামালপুর

জামালপুরের বুক চিরে বয়ে চলা যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদে শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই দেখা দিয়েছে তীব্র নাব্যতা সঙ্কট। নদীতে পানি কমে যাওয়ায় বহু স্থানে চর জেগে উঠেছে, কোথাও আবার ডুবোচরের কারণে নৌচলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফলে জেলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নৌপথে ছোট-বড় প্রায় সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন প্রতিদিন এ পথে যাতায়াতকারী হাজারো যাত্রী। পাশাপাশি লোকসানের মুখে পড়েছেন ফেরি, খেয়া ও কুলঘাটের ইজারাদাররা।

নাব্যতা সঙ্কটের কারণে বাহাদুরাবাদ-বালাসী ও মাদারগঞ্জ-সারিয়াকান্দি নৌপথে বর্তমানে নৌযান চলাচল কার্যত বন্ধ। ছোট ছোট ট্রলারও অনেক ক্ষেত্রে মাঝনদীর ডুবোচরে আটকে যাচ্ছে। ফলে যাত্রীরা নদী পার হতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন।

জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় জেলা পরিষদের আওতায় ১২টি খেয়া ও ফেরিঘাট চলতি অর্থবছরে প্রায় দুই কোটি ৯৯ লাখ ৪৬ হাজার টাকায় ইজারা দেয়া হয়েছে। কিন্তু নদীতে নাব্যতা কমে যাওয়ায় অধিকাংশ ঘাটেই নৌযান চলাচল বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে কোটি টাকার লোকসানের আশঙ্কায় হতাশ হয়ে পড়েছেন ইজারাদাররা।

অন্য দিকে বাহাদুরাবাদ-বালাসী নৌরুট পরিচালনা করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এই রুটে ফেরি চালুর লক্ষ্যে দুই ঘাটে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে টার্মিনালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। ২০২১ সালের জুনে এসব স্থাপনা উদ্বোধন করা হলেও এখন তা প্রায় অচল অবস্থায় পড়ে আছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ফেরি চলাচলের বাস্তব সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই বিপুল ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। ফলে স্থাপনাগুলো এখন কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এলাকাবাসীর দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কোটি কোটি টাকা অপচয় হয়েছে।

জানা গেছে, যমুনা বহুমুখী সেতু চালু হওয়ার পর ২০০০ সাল থেকেই এ অঞ্চলে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবু ২০১৪ সালে উত্তরের ১৩ জেলার সাথে ময়মনসিংহ ও ঢাকার যোগাযোগ সহজ করার যুক্তি দেখিয়ে নতুন করে বাহাদুরাবাদ-বালাসী নৌরুট চালুর পরিকল্পনা নেয়া হয়। পরে ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর একনেক সভায় বালাসী-বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। দুই ঘাটের দূরত্ব প্রায় ২৬ কিলোমিটার।

২০২২ সালের ৯ এপ্রিল তৎকালীন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে নৌপথটি উদ্বোধন করেন। তবে শুরু থেকেই নাব্যতা সঙ্কট দেখা দেয়। ফেরির পরিবর্তে লঞ্চ সার্ভিস চালুর চেষ্টা করা হলেও কয়েক মাসের মধ্যেই সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। বাহাদুরাবাদ ঘাটের নৌযান ইজারাদার মনজুরুল হক বলেন, নাব্যতা সঙ্কটের কারণে প্রায়ই নৌকা ডুবোচরে আটকে যায়। এতে যাত্রীদের চরম ভোগান্তি হয়। বর্তমানে এই রুটে সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে।

এদিকে মাদারগঞ্জ-সারিয়াকান্দি নৌপথেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথে শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই নদীর পানি কমে গিয়ে অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। এই পথে নিয়মিত যাতায়াতকারী ব্যবসায়ী ও যাত্রীরা বলছেন, সড়কপথে মাদারগঞ্জ থেকে বগুড়া যেতে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার ঘুরতে হয়। সময় ও খরচ বাঁচাতে অনেকেই নৌপথ ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন নদীপথ অচল হয়ে পড়ায় বাধ্য হয়ে সড়কপথেই যাতায়াত করতে হচ্ছে।

বগুড়ার ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার বলেন, আগে নদীপথে মালামাল পরিবহন করা হতো। কিন্তু এখন চর জেগে ওঠায় মালবোঝাই নৌকা চলাচল করতে পারে না। ফলে সড়কপথে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে, এতে খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরের কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঢাকায় বিআইডব্লিউটিএর সদর দফতরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কর্তৃপক্ষের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।