পণ্য আমদানিতে পরিবহন ব্যয়ে বড় উল্লম্ফনের আশঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে আপাত উদ্বেগ নেই

Printed Edition

নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধপরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে আপাত উদ্বেগ না থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পণ্য রফতানিতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। একই সাথে বৈশ্বিক জ্বালানির এক-পঞ্চমাংশের জোগান থমকে যাওয়ায় পণ্য আমদানিতে পরিবহন ব্যয়ে বড় উল্লম্ফনের আশঙ্কা করছেন শিপিং সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে ৪৮ দিনের পরিশোধিত জ্বালানি তেল মজুদ থাকার পাশাপাশি দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগারেও প্রায় ৫০ দিনের কাঁচামাল মজুদ রয়েছে।

ইরানের সাথে মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের তীব্রতা দিন দিন বাড়তে থাকলেও দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া খুব একটা উদ্বিগ্ন নন জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, হরমুজ ও বাব আল মান্দেব প্রণালী এড়িয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরামকো থেকে ক্রুড আমদানিতে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে জ্বালানি খাত ও শিপিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিশ্চিতভাবেই পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে জ্বালানি সঙ্কটের কারণে। ফলে তা সামগ্রিকভাবে সব সেক্টরকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউএইর ফুজাইরা বন্দর ও সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে বাব আল মান্দেব এড়িয়ে সমুদ্র পাড়ি সম্ভব। ফলে আমাদের সাপ্লাই চেইনে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়, যদি ইনটেন্যাশনালি কিছু না করে।

এ দিকে জ্বালানি সেক্টরে আপাতত উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পণ্য রফতানিতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সবজিসহ নানা কৃষিজপণ্য, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, তৈরী পোশাক, বিড়ি-সিগারেটসহ বাংলাদেশী নানা পণ্যের বাজার রয়েছে। যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে এখন সেদিকে জাহাজ যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশী পণ্য রফতানিতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। ইতঃপূর্বে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আক্রমণের পর হতেই দেশের জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। যুদ্ধের একপর্যায়ে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ব জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সঙ্কটে বন্ধ হয়ে যায়। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ব তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো থেকে এরাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল (এএলসি) ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি থেকে মারবান ক্রুড অয়েল আমদানি করে এই তেল শোধনাগারে পরিশোধন করা হয়। এর বাইরে অন্য কোনো দেশের ক্রুড শোধনের উপযোগী নয় আমাদের রিফাইনারি।

সূত্র জানায়, সাধারণত প্রতি মাসে দুই দেশ থেকে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের দু’টি ট্যাংকার বাংলাদেশে আসে। বর্তমানে ইউএইর ফুজাইরা বন্দর থেকে আসা ট্যাংকার জাহাজ ওমেরা গ্যালাক্সি থেকে চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে ক্রুড অয়েল খালাস চলছে। এ ছাড়া গতকাল সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরে অপর চট্টগ্রাম অভিমুখী অন্য একটি জাহাজে ক্রুড অয়েল বোঝাই চলছিল বলে সূত্র জানায়।

ইআরএল মূলত বর্তমানে কিছু নন-ফুয়েল পণ্যসহ লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), স্পেশাল বয়েলিং পয়েন্ট সলভেন্ট (এসবিপি), মোটর গ্যাসোলিন রেগুলার (পেট্রল), মোটর গ্যাসোলিন প্রিমিয়াম (অকটেন), ন্যাফথা (গ্যাসোলিন), মিনারেল টার্পেনটাইন (এমটিটি), সুপিরিয়র কেরোসিন অয়েল (এসকেও), জেট এ-১ (এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল), হাইস্পিড ডিজেল (এইচএসডি), জুট ব্যাচিং অয়েল (জেবিও), লাইট ডিজেল অয়েল (এলডিও), ফার্নেস অয়েল (এফও) এবং বিটুমিন উৎপাদন করে।

এ দিকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, গতকাল বুধবার পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুদ আছে ৩১ দিনের। এ ছাড়া ৩৬ দিনের অকটেন, ২০ দিনের পেট্রল, ২৫ দিনের ফার্নেস অয়েল ও ২০ দিনের জেট ফুয়েল মজুদ আছে। জ্বালানির এই মজুদ স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি দাবি করে তিনি বলেন, ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আসবে। আগামী আগস্টে ডিজেল আসবে আরো ২ লাখ ৪০ হাজার টন। কাজেই আগামী ৪৮ দিনের মধ্যে জ্বালানি তেলের সঙ্কট হবে না।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন নয়া দিগন্তকে বলেন, সব কিছুই জ্বালানি তেলনির্ভর। তাই সব ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়বে। জ্বালানির একটা অন্যতম উৎস মিডল ইস্ট কেন্দ্রিক। মিডল ইস্টে শ্রম বাজার ছাড়াও আমাদের পণ্য বাজার আছে। সেখানে এখন জাহাজ যাচ্ছেনা, ফলে সেসব পণ্যও যাচ্ছে না। শ্রমিক ছাঁটাইয়ের একটা আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০ শতাংশ বৈশ্বিক জ্বালানির উৎস যেহেতু যুদ্ধপরিস্থিতিতে টালমাটাল অবস্থা ফলে জ্বালানি তেলের দাম স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে। ফলে শিপিং রেন্ট বাড়ার সম্ভাবনা বেশি। তিনি উদাহরণ হিসেবে এর আগের ক্রাইসিসে আমাদের দেশেও উড়োজাহাজের তেলের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দাম বাড়ানোর কথা উল্লেখ করে বলেন, জ্বালানির জোগানের সাথে পরিবহন ব্যয় নির্ভর করে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, সৌদি আরবের ইয়ানবুতে চট্টগ্রামমুখী একটি জাহাজে গতকাল বুধবার থেকে ক্রুড লোড হচ্ছে। আর এ দিকে একটি জাহাজ থেকে রিফাইনারিতে তেল খালাস চলছে। এর বাইরে রিফাইনারিতে আগের কিছু স্টকও আছে। আগের কিছু স্টক বাদ দিলেও যে পরিমাণ তেল এসে পৌঁছেছে তা দিয়ে ৪০ দিন চলবে বলেও ওই কর্মকর্তা জানান।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জন্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে ক্রুড অয়েল আমদানির জাহাজ ভাড়া করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালিক নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা ক্রুড অয়েল আমদানি করি সৌদি আরব ও ইউএই থেকে। এ ছাড়া অন্য দেশের তেল আমাদের রিফাইনারি পরিশোধন করতে পারে না। হরমুজ প্রণালীতো বন্ধ। আমাদের জাহাজ দীর্ঘদিন আটকে ছিল, এখন বের করে নিয়ে আসছি। এখন যে পরিস্থিতি তাতে এই প্রণালীতে ঢোকা ভেরি ডিফিকাল্ট। যেহেতু ইউএইর জেবেল আলীর বিকল্প বন্দর ফুজাইরা রেড সিতে পড়লেও ইয়েমেন থেকে অনেক দূরে। আর সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে আমাদের এখানে জ্বালানি ট্যাংকার আসবে। তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধও খুব একটা ইফেক্ট করবে না, আবার ইয়েমের হুতি বিষয়ও খুব একটা ইফেক্ট করবে না। তবে যদি ইরান মনে করে যে আমরা অ্যাটাক করব সেটা ভিন্ন কথা, কিন্তু কোনো কারণ ছাড়া কেন এটাক করবে? আমাদের সাথে তো তাদের শত্রুতা নেই। তা ছাড়া এগুলো সব ভাড়া করা জাহাজ, সেখানে আমাদের কোনো কনসার্ন নেই। বিএসসির জাহাজ আপাতত ওই অঞ্চলে খুব বেশি পাঠাচ্ছি না। সৌদি ইয়ানবু বন্দর থেকে জাহাজ আসতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।