এক দিন ভালো কাটিয়ে ফের নেতিবাচক ধারায় পুঁজিবাজার

প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তি মেলেনি বিনিয়োগকারীদের

Printed Edition
artho-1
এক দিন ভালো কাটিয়ে ফের নেতিবাচক ধারায় পুঁজিবাজার

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

ধারাবাহিক পতনের পর এক দিনের জন্য ভালো আচরণ উপহার দিলেও ফের নেতিবাচক প্রবণতার শিকার হলো দেশের পুঁজিবাজার। ভালোভাবে দিন শুরু করলেও দিনশেষে তা ধরে রাখতে পারেনি। গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বাজার আচরণ কিছুটা মিশ্র থাকলেও দু’টি সূচকেরই কমবেশি অবনতি ঘটে। লেনদেন হওয়া কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যেও একটি বড় অংশ দরপতনের শিকার হয়। তবে দেশের অন্য পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সব সূচকের উন্নতি ঘটে। এ সময় উভয় পুঁজিবাজারেই লেনদেনের কিছুটা উন্নতি ঘটে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১৩ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৪ হাজার ৯৭৪ দশমিক ৫২ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি মঙ্গলবার দিন শেষে নেমে আসে ৪ হাজার ৮৬০ দশমিক ৬২ পয়েন্টে। ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দিন শুরু করা সূচকটি বেলা ১১টার দিকে পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯০২ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় প্রায় ২৭ পয়েন্ট। লেনদেনের এ পর্যায়ে বিক্রয়চাপে পড়ে বাজারটি। দিনের বাকি সময় বিক্রয়চাপের খুব বেশি তীব্রতা না থাকলেও তা সামলে উঠতে পারেনি বাজারটি। এ সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচকটি ১ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হলেও ডিএসই শরিয়াহ সূচকের অবনতি ঘটে ৪ দশমিক ২১ পয়েন্ট।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সব সূচকের কমবেশি উন্নতি ঘটে গতকাল। এখানে প্রধান সূচক সিএএসপিআই ১২ দশমিক ২০ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। বিশেষায়িত দুই সূচকের মধ্যে সিএসই-৩০ ৬৩ দশমিক ৯৮ ও সিএসসিএক্স ১১ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ঢাকা শেয়ারবাজারের মতো এখানেও দিনের শুরুতে বাজার আচরণ যতটুকু ইতিবাচক ছিল দিনশেষে তা ধরে রাখা যায়নি।

বিনিয়োগকারীরা দিনের বাজার আচরণে হতাশা প্রকাশ করেছেন। আগের দুই দিনের বাজার আচরণ তাদের মাঝে যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিলেন গতকালের বাজার আচরণে সে আলোকে প্রাপ্তি ছিল না। কারণ এ মুহূর্তে পুরো দেশ নির্বাচনমুখী। দীর্ঘদিন পর দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোটে অংশগ্রহণ করা জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। তাই এ সময় পুরো দেশ হয়ে উঠবে উৎসবমুখর। কমে যাবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আর একই সাথে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালোর দিকে মোড় নেবে। সব মিলিয়ে সামনের দিনগুলো পুঁজিবাজারের ভালো যাবে। কিন্তু গতকালের বাজার আচরণ তাদের হতাশ করে। তবে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মনে করেন, সামনে টানা তিন দিন পুঁজিবাজার বন্ধ থাকবে। এ কারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার চেয়ে বিক্রিতেই বেশি মনোযোগী ছিলেন, যা নেতিবাচক আচরণ তৈরি করে। আবার বছরের শেষ দিকে এসে প্রতিষ্ঠানগুলো বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে এমনিতেই বিক্রয়মুডে থাকে।

দিনের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গতকাল ভালো কোম্পানিগুলো লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধিতে আগের দিনগুলোর চেয়ে এগিয়ে ছিল। আর এর প্রতিফলন ঘটে দুই বাজারেই মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো নিয়ে গড়া সূচকের উন্নতি। আবার দরপতনের শীর্ষ কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুর্বল কোম্পানিগুলো। খাতওয়ারি বিশ্লেষণে দেখা যায় ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ কোম্পানির পাশাপাশি সিমেন্ট ও সিরামিকস খাতের শতভাগ কোম্পানির দরপতন ঘটে গতকাল। তবে পতনের বাজারেও অন্যান্য খাতের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো উঠে আসে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায়।

বাজার সংশ্লিষ্টরা সূচকের পতনের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হিসাব বছরের শেষ দিকে মুনাফা তুলে নেয়ার প্রক্রিয়াকেই দায়ী করেছেন। কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো আর্র্থিক বছর শেষে তাদের লাভ লোকসান নির্ণয়ে যে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করেন তাতে বিক্রয়চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তা ছাড়া সামনে তিন দিন টানা বন্ধ থাকছে পুঁজিবাজার। এ সময় তারা নতুন করে বিনিয়োগে যেতে চান না। তবে তারা আশাবাদী সব কিছু ঠিক থাকলে অচিরেই বাজার ভালোর দিকে মোড় নেবে।

গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। ২৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ২৩ লাখ ৮০ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকায় ৮২ লাখ ৬৮ হাাজর শেয়ার বেচাকেনা করে সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ উঠে আসে দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সায়হাম কটন মিলস, রহিম টেক্সটাইলস, শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি, মুন্নু ফেব্রিক্স, রহিমা ফুড করপোরেশন, সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস ও খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ।

গতকাল ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকার প্রথমেই ছিল এপেক্স ফুডস। খাদ্য খাতের এ কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানটি দখলে নেয় মিউচুয়াল ফান্ড খাতের গ্রিন ডেল্টা ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির ও ফান্ডের অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে রিলায়েন্স ওয়ান ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি, এপেক্স ফুটওয়্যার, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, ইস্টার্ন লব্রিকেন্ট, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।

ডিএসইতে দিনের দরপতনের শীষে উঠে আসা বেশির ভাগই ছিল আর্থিক খাতের দূর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো। এদের মধ্যে প্রিমিয়ার লিজিং ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ দর হারিয়ে দিনের শীর্ষে ছিল। ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ দর হারিয়ে একই খাতের এফএএস ফিন্যান্স ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসই’র দরপতনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ফারইস্ট ফিন্যান্স, প্রাইম ফিন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স, রেনউইক যজ্ঞেশ^র, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স লি.।