যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা স্থগিতের প্রভাব পড়বে দেশের মর্যাদার ওপর

অন্য দেশের ভিসা পাওয়াও কঠিন হবে

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

ব্যবসায়ী ও পর্যটন ভিসার জন্য বন্ডের বাধ্যবাধকতা আরোপের পর বাংলাদেশীদের অভিবাসন ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করার যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত দেশের ভাবমর্যাদার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বৈদেশিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের কারণে এখন যেসব দেশের ভিসা তুলনামূলকভাবে সহজে পাওয়া যায়, তাও কঠিন হয়ে যাবে।

গত বুধবার বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের অভিবাসন ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, এই দেশগুলোর অভিবাসীরা অগ্রহণযোগ্য হারে আমেরিকান জনগণের কাছ থেকে সামাজিক কল্যাণ সুবিধা গ্রহণ করে। এই স্থগিতাদেশ ততণ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে যতণ না যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারে যে, নতুন অভিবাসীরা আমেরিকান জনগণের কাছ থেকে সম্পদ আহরণ করবে না।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটন ও ব্যবসায়ী ভিসার জন্য বাংলাদেশসহ ৩৮টি দেশকে ১৫ হাজার ডলার (প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা) পর্যন্ত বন্ড বা জামানত নেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসনবিরোধী নীতির আওতায় নতুন পদপে হিসেবে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে সিদ্ধান্ত দু’টি কার্যকর হবে।

এ ব্যাপারে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এসব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের সাথে সম্পর্কিত। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যেসব অভিযোগের কারণে অভিবাসন ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত বা ভিসা বন্ডের বাধ্যবাধকতার তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তার বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। তিনি বলেন, ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এসব সিদ্ধান্তের প্রভাব বাংলাদেশীদের ওপর অবশ্যই পড়বে। তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদার ওপর। আমাদের পাসপোর্টের মান বেশ নিম্নমুখী। বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে বহু দেশের ভিসা পাওয়া যায় না। আবার অনেক দেশ আমাদের ভিসা দেয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসব সিদ্ধান্তের কারণে এখন যেসব দেশের ভিসা তুলনামূলকভাবে সহজে পাওয়া যায়, তাও কঠিন হয়ে যাবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আমেরিকা অনুবিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মাহফুজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সামাজিক সুরক্ষা বা কল্যাণ সুবিধার অতিরিক্ত ব্যবহার বা অপব্যবহারের অভিযোগে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের অভিবাসন ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে। সামাজিক কল্যাণ সুবিধা ও অভিবাসন ভিসা প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকরগুলো খুঁজে বের করতে যুক্তরাষ্ট্র এই স্থগিতাদেশ দিয়েছে। এর মানে হলো, রিপাবলিকানরা এই সামাজিক সুবিধার বিপক্ষে নয়; বরং তার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে। অনেকেই অভিবাসন ভিসার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে গ্রিন কার্ড বা নাগরিকত্ব নিয়ে সামাজিক কল্যাণ সুবিধার আওতায় বিনামূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া সুবিধা, এমনকি নগদ সহায়তাও নিয়ে থাকেন। এসব সুবিধা নিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে না থেকে নিজ দেশে ফিরে আসেন। আবার প্রয়োজনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নানা ধরনের সেবা নিয়ে থাকেন। এগুলো বন্ধ করতেই অভিবাসন ভিসা প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ী ও পর্যটন ভিসা (বি-১,বি-২) পাওয়ার জন্য বন্ডের বাধ্যবাধকতা আরোপ করায় অনেকেই সমস্যার পড়বেন উল্লেখ করে মাহফুজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ থেকে শুধু পর্যটনের উদ্দেশ্যে খুব কম মানুষই যুক্তরাষ্ট্র যায়। বি-২ ভিসার আওতায় বাংলাদেশীরা মূলত তাদের আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করা বা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য গিয়ে থাকেন। বি-১ ভিসার আওতায় যান ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশের বিশেষ করে তৈরী পোশাক খাতের একক বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্র। সে ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের জন্যও সমস্যা হবে। তবে ভিসা বন্ড-সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি। আগামী ২১ জানুয়ারি সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের সময় হয়তো বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে।