শপথের উত্তাপ ছড়াতে পারে প্রথম অধিবেশনেই

সংসদকে প্রাণবন্ত রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাশা বিএনপির

Printed Edition

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

আগামী ১২ মার্চ শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। জানা গেছে, সংসদকে প্রাণবন্ত এবং জবাবদিহিতামূলক করতে বিএনপি বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। একই সাথে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও জনস্বার্থে সংসদে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাদের সদস্যদের নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সংসদকে কার্যকর করার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম অধিবেশনেই ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ইস্যুতে উত্তপ্ত হতে পারে জাতীয় সংসদ। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সংসদ-সদস্যদের (এমপি) শপথ গ্রহণের পর থেকেই দেশে রাজনীতিতে কিছুটা উত্তাপ ছড়িয়েছে। তবে এই উত্তাপ সঙ্কটে রূপ নেয় কি না, তা দেখার জন্য সংসদের প্রথম অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, নির্বাচনের পর সরকারি দলের নির্বাচিতরা শুধু সংসদ-সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আর বিরোধী দলের সদস্যরা নিয়েছেন দু’টি শপথ। একটি সংসদ-সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। তাদের মতে, একই দেশে দুই নিয়ম চলতে পারে না।

সূত্র মতে, দীর্ঘ দেড় যুগ পর ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রায় ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দেশে অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন এই নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে। সংসদীয় স্বৈরাচার থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে জনগণের প্রত্যাশা ও সংগ্রামের ফসল। এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছে। কিছু আসনে ভোট গণনায় কারচুপির অভিযোগ উঠলেও বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে সহজ-সরলভাবে প্রধান বিরোধী দলের দায়িত্ব গ্রহণের বার্তা রাজনীতিতে এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যদিও সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুতে সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দলগুলো ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে।

প্রসঙ্গত, ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে জাতীয় নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটের ব্যালটে জুলাই সনদের ৮৪টি ধারা বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট ৪টি প্রশ্ন ছিল। এগুলো হলো-জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ পাস, তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, নির্বাচনে সাধারণ মানুষের ভোটের আনুপাতিক হার অনুসারে সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন, জুলাই সনদে দলগুলো যেসব ইস্যুতে একমত হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন এবং এর বাইরে সনদের অন্যান্য ধারা রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করতে পারবে। আবার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে উল্লেখ ছিল সংসদ-সদস্যরা দু’টি শপথ নেবেন। প্রথমত সংসদ-সদস্য হিসেবে এবং দ্বিতীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। গণভোটে অংশ নেয়া ভোটারদের মধ্যে ৬৮ শতাংশই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন। অর্থাৎ তারা এসব প্রস্তাব সমর্থন করছেন। কিন্তু নির্বাচনের পর বিতর্ক শুরু হয়। বিএনপির সদস্যরা সংসদ-সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। তারা বলছেন, এ ধরনের কিছু বর্তমান সংবিধানে নেই।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি গণভোটে স্বীকৃতি মিলেছে। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় সংবিধানের চেয়ে কম নয়। আমি মনে করি, আরো বেশি। বিএনপির উচিত ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়া। এই রায় না মেনে সরকারের সামনে আমি কোনো বিকল্প দেখছি না। তিনি বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনেই এটা নিয়ে সদস্যদের মাঝে উত্তাপ ছড়াতে পারে। শেষ পর্যন্ত এর সমাধান কী- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আদালতে একটি রিট হয়েছে। এখন আদালত রায় দেবে। রায়ের পর বোঝা যাবে বিষয়টি কোনদিকে যাচ্ছে।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে বিএনপির সংসদ-সদস্যরা সংবিধান-পরিপন্থী কোনো কাজ করেননি। কারণ, সংবিধানে বলা আছে কে শপথ নেবে, কিভাবে শপথ নেবে, কার কাছে শপথ নেবে। কিন্তু বর্তমান সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ বলে কিছু নেই। সংবিধানে যদি এই পরিষদ যোগ করা হয়, তখন শপথ নেয়ার প্রশ্ন আসবে। যেহেতু সংবিধানে এখন নেই, তাই শপথ নেয়ার প্রশ্ন আসে না। ফলে বিএনপির অবস্থান ঠিক আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সঙ্কট তৈরি হয়েছে। আর এ সঙ্কট কতটা ঘনীভূত হবে, সংসদ অধিবেশন শুরুর পর তা বোঝা যাবে।

শপথের আগের সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্যের শপথ নিয়ে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমে বলেছিলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ফরম থাকলেও আমরা (বিএনপি) কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি। এ ছাড়া সংবিধানে বিষয়টি এখনো অন্তর্ভুক্ত বা ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা আগে সংবিধানে ধারণ করতে হবে। একই সাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের কে শপথ পড়াবেন, সেটারও বিধান করতে হবে। তিনি আরো বলেন, সব অধ্যাদেশ ও আদেশ, যা ইন্টেরিম সময়ে পাস হয়েছে সেগুলো প্রত্যেকটা আগে সংসদে উত্থাপন করতে হবে। করলে এটা আইনে পরিণত হবে। সংসদ গঠন করার পর ওইগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত সংসদে পাস না হবে, ততক্ষণ কিন্তু এগুলো আইন না।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রথম বৈঠকে স্পিকার নির্বাচনের পর সংসদের অধিবেশন ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি দিয়ে নতুন স্পিকারের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি। এরপর নতুুন স্পিকারের সভাপতিত্বে মুলতবি বৈঠক বসবে। নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শোক প্রস্তাব পাঠসহ সংসদের বৈঠকের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। এ ছাড়া এ দিনের বৈঠকে বিগত সংসদের পর থেকে এ পর্যন্ত যতগুলো অধ্যাদেশ জারি হয়েছে, তার সব উপস্থাপন করা হবে। আইনমন্ত্রী অধ্যাদেশগুলো উপস্থাপন করবেন। প্রথম বৈঠকের পর দ্বিতীয় বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব তোলা হবে। ওই ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর সংসদ সদস্যরা দীর্ঘ আলোচনায় অংশ নেবেন।

সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, সংসদে দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে জনগণের সাথেই তারা থাকবেন। জনগণ ও দেশের স্বার্থ সংরক্ষণে সজাগ দৃষ্টি রেখেই দায়িত্ব পালন করবেন তারা। সম্প্রতি রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সাথে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি আরো বলেন, কার্যকর ও গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে দুনিয়ার সভ্য দেশগুলো যেভাবে দায়িত্ব পালন করে, সেই সংস্কৃতিটা সংসদে দেখাতে চাই।

সংসদকে প্রাণবন্ত করতে বিরোধী দলের ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাশা করে পানিসম্পদমন্ত্রী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী বলেন, রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকতে পারে। সব ইস্যুতে বিরোধিতা না করে দেশ গড়ার স্বার্থে সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।

জুলাই জাতীয় সনদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ঠিক করার জন্য প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে সরকারের পক্ষ থেকে মৌখিক ও সাক্ষাতে অফার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, স্পিকার নির্বাচনের দিনই যেন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংসদ সদস্যদের (এমপি) ভূমিকা নিয়ে জনগণের মনে দীর্ঘদিনের কিছু ক্ষোভ ও প্রশ্ন রয়েছে। জনগণ চায়, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শুধু ঢাকায় ফ্ল্যাট বা প্লট বরাদ্দের পেছনে না ছুটে, বরং নিজের এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের সহযাত্রী হবেন। সংসদ সদস্যদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখা। সংসদকে কার্যকর করতে হলে বিরোধী মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং গঠনমূলক বিতর্কের মাধ্যমে জাতীয় সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। জনগণ আর ‘হাঁ-না’ ভোটের সংসদ দেখতে চায় না, তারা যুক্তিনির্ভর প্রাণবন্ত সংসদ চায়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে সবাইকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুুক্তিমূলক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে এখনকার সবচেয়ে বড় কাজ।

সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের কিছু নৈতিক পদক্ষেপ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার, নিজ খরচে জ্বালানি বহন, প্রটোকলের নিরাপত্তা বহর ছোট করা নির্বাচন-পরবর্তী বিরোধী নেতাদের বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ ইতিবাচক বার্তা দেয়। আশাব্যঞ্জক নানা ঘটনার মাঝেও শপথ গ্রহণের দিনই রাজনীতিতে দেখা দেয় এক নতুন জটিলতা। সংবিধান সংস্কার বা গণপরিষদের শপথ ও গণভোটের ফল মূল্যায়ন প্রসঙ্গে ঐকমত্যের ঘাটতি রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জামায়াত-এনসিপি জোট প্রথমে দ্বিধায় থাকলেও পরে শপথ গ্রহণ করেছে। অন্য দিকে, বিএনপি সাংবিধানিক যুক্তি তুলে ধরে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের শপথ থেকে আপাতত সরে দাঁড়িয়েছে। যদিও তারা বলছে, যেসব বিষয়ে ঐকমত্য আছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করবে তবুও ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ও উচ্চকক্ষ গঠন পদ্ধতি নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা ও অনীহা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি দল যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহঙ্কারে একগুঁয়ে আচরণ না করে এবং বিরোধী দল যদি গঠনমূলক সমালোচনার পথ বেছে নেয়, তবে ঐকমত্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। কারণ জুলাই জনগণের রক্ত, সংগ্রাম ও প্রত্যাশার ফসল। তারা আরো বলছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, দমন-পীড়ন ও অনিশ্চয়তার পর দেশে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনেকের কাছেই নতুন আশার দ্বার খুলে দিয়েছে। যদি নতুন ক্ষমতাসীনরা পুরনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি করেন, তবে জনগণের আশা আবারো হতাশায় রূপ নেবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডা: এজেডএম জাহিদ হোসেন দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, কেবল বক্তৃতা নয়, বাস্তব নীতি ও প্রয়োগ নির্ধারণই এই সংসদের অন্যতম কাজ হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাস্তব সংস্কার, এসব নিয়েই সংসদকে প্রাণবন্ত রাখতে চাই। সবার প্রত্যাশা নতুন সংসদ হবে প্রাণবন্ত, বিতর্কসমৃদ্ধ, প্রতিহিংসামুক্ত ও গতিশীল। ক্ষমতার অহঙ্কার নয়, জনগণের প্রতি থাকবে দায়বদ্ধতা। ত্রয়োদশ সংসদ সত্যিই ইতিহাসে স্থান করে নেবে একটি পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে।