ঋণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেবে সরকার -অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

ঋণনির্ভর অর্থনীতি টেকসই হয় না, অর্থনীতিকে টেকসই করার জন্য দরকার বিনিয়োগ তথা মালিকানা নির্ভর অর্থনীতি। নতুন সরকার অর্থনীতিকে বর্তমান ভঙ্গুর অবস্থা থেকে টেকসই অবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে, যেখানে থাকবে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। গতকাল দেশের পুঁজিবাজার বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরাম আয়োজিত ‘পুঁজিবাজার চলমান চ্যালেঞ্জ ও নতুন সরকারের করণীয়’ শীর্ষক আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমির এসব কথা বলেন।

রাজধানীর একটি হোটেলে সংগঠনের সভাপতি মনির হোসেনের সভাপতিত্বে ও আহসান হাবিব রাসেলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খোন্দকার রাশেদ মাকসুদ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো: আবদুর রহমান খান। এ ছাড়া ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মো: মোমিনুল ইসলাম, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান, বিএসইসি কমিশনার মো: সাইফুদ্দিন এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানি (বিএপিএলসি)’র সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের এমডি মো: মনিরুজ্জামান।

অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, সারা বিশে^ শিল্প ও সেবা খাতে বিনিয়োগের বেশির ভাগ জোগান দিয়ে থাকে পুঁজিবাজার। এর মাধ্যমে জনগণকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশের শিল্প ও সেবা খাত সব সময়ই ছিল ব্যাংক নির্ভর। আমাদের পুঁজিবাজার কোনো সময়ই এ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। পুঁজিবাজারের মাধ্যমে অর্থনীতি অংশগ্রহণমূলক হয় যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকে। বিগত সরকার নিজেদের খেয়ালখুশি মতো দেশের অর্থনীতিকে ব্যবহার করেছে। ফলে অর্থনীতি এখন পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। এখান থেকে বেরিয়ে এখন অংশগ্রহণ ও মালিকানা নির্ভর অর্থনীতি গড়তে হবে। শিল্প ও সেবা খাতে জনগণের অংশীদারিত্বকে প্রাধান্য দিতে হবে। এতে অর্থনীতির আকার যেমন বাড়বে, তেমনি তৈরি হবে গতিশীলতা।

তিনি বলেন অর্থনীতি যদি ভোগ নির্ভর হয় তা হলেও তা টেকসই হয় না। বিপরীতে আমাদের বিনিয়োগ নির্ভর অর্থনীতির দিকে এগোতে হবে। এখন উদ্যোক্তরা ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেরাই সব কিছুর মালিক হয়ে বসে থাকে। ফলে ভোগ নির্ভর হয়ে ওঠে অর্থনীতি। অথচ এটিকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিলে বিনিয়োগ নির্ভর অর্থনীতির এ সুযোগ তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে।

দেশের অর্থনীতির মূল সূত্রের উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিনিয়োগ ও এর মাধ্যমে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বশেষ কর ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের জোগান যার মাধ্যমে জনমানুষের কল্যাণ করা সম্ভব হয়। আর পুঁজিবাজারকে কার্যকর করতে হলে এটিকে অভ্যন্তরীণভাবে স্বচ্ছতার সাথে পরিচালিত করতে হবে। পুঁজিবাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো যার যার অবস্থান থেকে স্বচ্ছতার সাথে তার দায়িত্ব পালন করলে বাজারে আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এটাই করা হয়নি। আমরা এখন পুঁজিবাজারকে সাধারণ মানুষের আস্থায় নেয়ার পাশাপাশি ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে ইমার্জিং মাকেটে পরিণত করতে চাই। এ জন্য প্রয়োজন সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। প্রয়োজনে একটি ইসলামিক পুঁজিবাজার প্রতিষ্ঠাও আমাদের পরিকল্পনায় রয়েছে যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও এখানে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে। এমনকি প্রবাসীরাও যাতে এ বাজার থেকে উপকৃত হতে পারে।

সেমিনারের বিশেষ অতিথি বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ তার বক্তব্যে বিগত আটারো মাসে পুঁজিবাজার সংস্কারে কমিশনের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে বলেন, পুঁজিবাজারে আইনগত দিকগুলোর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি। এগুলো কার্যকর করা গেলে অতীতের ভুলগুলো থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারবো। তিনি এ প্রসঙ্গে তিনটি মৌলিক বিষয় মার্জিন রুলস, মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা প্রণয়ন ও আইপিও রুলস পরিবর্তনের উল্লেখ করে বলেন, এসব বিধিমালা বাস্তবায়ন করা গেলে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা যেমন আসবে তেমনি বাজারের প্রতি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে তা সহায়ক হবে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বিগত সময়ে পুঁজিবাজারে যেসব অনিয়ম সংগঠিত হয়েছে কমিশন গত আঠার মাসে বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে তার ওপর ব্যাপক অনুসন্ধান করে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। এ পর্যন্ত এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এক হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ববোর্ড চেয়ারম্যান মো: আবদুর রহমান খান বলেন, সারা বিশে^ শিল্প ও বীমা খাতের মূলধন জোগানে বরাবরই ভূমিকা ছিল পুঁজিবাজারের। কিন্তু আমাদের দেশে ঘটেছে উল্টোটা। আমাদের চিন্তা করতে হবে কেন উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারের চাইতে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে চায়। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে টাকা নিলে তা দ্রুত পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ পুঁজিবাজার থেকে মূলধন নিলে তা কখনো শোধ করতে হয় না। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উৎপাদনশীলতার সাথে যুক্ত করা হয়। আমাদের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানে কেমন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব যাদের ওপর রয়েছে, তারা দায়িত্বটি ঠিকভাবে পালন করেননি। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির যে নীতিমালা রয়েছে, তা কখনো যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি। ফলে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গায় বরাবরই ঘাটতি ছিল। যে সব কোম্পানি বাজারে আসার কথা নয় সেগুলোই বাজারে এসেছে। আর এ ক্ষেত্রে বেশি দায়ী এই সিস্টেমের সাথে যারা জড়িত তারা ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি।

তিনি আরো বলেন, পুঁজিবাজারকে স্বাভাবিক করতে হলে কোনো বাহ্যিক সুবিধা দিয়ে নয়, বরং নিজ থেকেই এটিকে কার্যকর ও টেকসই করে গড়ে তুলতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বরাবরই পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য এর পাশে ছিল , ভবিষ্যতেও থাকবে।