সালমান-আনিসুলের মামলায় ট্রাইব্যুনালে হৃদয়বিদারক সাক্ষ্য
দুই আঙুল ঢুকে যাচ্ছিল ছেলের মাথার ক্ষতে
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুনানিকালে দুই প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী তাদের ওপর ঘটে যাওয়া নৃশংসতার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। জবানবন্দী দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ সিফাতের বাবা মোহাম্মদ কামাল হাওলাদার এবং পা হারানো যুবক ইমরান হোসেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চে বিচার কার্যক্রম চলছে। অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। গতকাল প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার মো: ইমরান হোসেন। দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার মো: কামাল হাওলাদার।
সাভারের বাসিন্দা ও বর্তমানে মিরপুর-১০ এলাকায় বসবাসরত ৫২ বছর বয়সী মোহাম্মদ কামাল হাওলাদার আদালতে তার ছেলে সিফাত হত্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে হৃদয়বিদারক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বেলা ১টা ১০ মিনিটে তিনি ও তার ছেলে সিফাত মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে কাঁচাবাজার করতে যান। আন্দোলনের কারণে দোকানপাট বন্ধ থাকায় তিনি পাশের একটি টঙ দোকানে যান, আর তার ছেলে ছাত্রদের মিছিলে যোগ দেয়।
কামাল হাওলাদার বলেন, হঠাৎ তিনি দেখেন উত্তর দিক থেকে দুটি এবং দক্ষিণ দিক থেকে একটি- মোট তিনটি সশস্ত্র মিছিল ছাত্রদের ঘিরে ফেলছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন এমপি নিখিল মিয়া, কামাল আহমেদ মজুমদারের ছেলে, এমপি এসএম জাহিদ ও জনি কমিশনারের নেতৃত্বে আসা লোকজন আগ্নেয়াস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে নির্বিচারে গুলি ছুড়ছিল।
তিনি বলেন, ‘হঠাৎ শুনতে পাই সিফাতের গায়ে গুলি লেগেছে। দৌড়ে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিই। আমার শরীর ছেলের রক্তে ভিজে যায়। মাথায় হাত বুলিয়ে ক্ষত খুঁজছিলাম। একসময় দেখি আমার দুই আঙুল ছেলের মাথার গুলির ক্ষতের ভেতরে ঢুকে গেছে।’
তিনি আরো অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ নেতা জনি কমিশনার ও রুহুল আমিন হাওলাদার তার ছেলেকে প্রথমে কেড়ে নিয়ে পাশের একটি বাসায় নিয়ে যান; পরে অনুরোধ করলে ফিরিয়ে দেন। আল হেলাল ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা সিফাতকে মৃত ঘোষণা করেন।
কামাল হাওলাদার জানান, আওয়ামী লীগের বাধার কারণে ঢাকায় ছেলের গোসল বা জানাজা পর্যন্ত করতে পারেননি। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে মাদারীপুরে নিয়ে গিয়ে দাফন সম্পন্ন করা হয়। তিনি সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের পরামর্শে জারি করা কারফিউ ও দমন-পীড়নকে এ মৃত্যুর জন্য দায়ী করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
এর আগে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেয়া ইমরান হোসেন জানান, তিনি ‘এ-ওয়ান’ পেস্ট কন্ট্রোল কোম্পানিতে কাজ করতেন এবং কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন না। ১৯ জুলাই কাজ শেষে মিরপুর-১১ থেকে ফেরার পথে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মিরপুর-১০ গোলচত্বরে পুলিশ ও হেলমেট পরা সশস্ত্র ব্যক্তিদের গুলিবর্ষণের মুখে পড়েন তিনি।
ইমরান বলেন, ‘পালাতে চেষ্টা করলে পেছন থেকে একটি গুলি আমার ডান পায়ে লাগে। ঘণ্টাখানেক অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলাম। জ্ঞান ফিরলে দেখি আশপাশে আরো অনেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছেন।’
তিনি জানান, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), যা পঙ্গু হাসপাতাল নামে পরিচিত, সেখানে ভর্তি হতে গিয়ে নানা হয়রানির শিকার হন। সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় দেয়ার পর রাত ১২টার দিকে তাকে ভর্তি নেয়া হয়। শুরুতে চিকিৎসার জন্য অর্থ দাবি করা হয়; পরে এক আনসার সদস্যের সহায়তায় তার অস্ত্রোপচার হয়।
কারফিউর কারণে তার পরিবার গ্রাম থেকে ঢাকায় আসতে পারেনি। চিকিৎসকেরা প্রথমে পা কেটে ফেলার পরামর্শ দিলেও তিনি বারবার অনুরোধ করেন পা রেখে চিকিৎসা চালাতে। দীর্ঘ ৩২ দিন চিকিৎসা ও ১৬ ব্যাগ রক্ত দেয়ার পরও শেষ পর্যন্ত ২৯ আগস্ট তার ডান পা কেটে ফেলতে হয়।
ইমরান তার পঙ্গুত্বের জন্য শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানসহ তৎকালীন সরকারের নীতি-নির্ধারকদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা ছাত্রদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলার পরই এই গণ্ডগোল ও গুলিবর্ষণ শুরু হয়। আমি আমার এই অবস্থার বিচার চাই।’
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন সরকারের নির্দেশনায় পরিচালিত গণহত্যার অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ দিন দুই সাক্ষীর জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। ট্রাইব্যুনাল তাদের বিস্তারিত বক্তব্য নথিভুক্ত করে মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।