প্রচারণায় শহরে অবকাঠামো গ্রামে জীবিকা গুরুত্ব পাচ্ছে
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা কিংবা দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর নির্বাচনী মাঠে যেখানে মেট্রোরেল, যানজট, আবাসন কিংবা কর্মসংস্থান বড় রাজনৈতিক দল দু’টির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে, সেখানে একই নির্বাচনে গ্রামাঞ্চলের ভোটারদের অগ্রাধিকার ঘুরপাক খাচ্ছে গ্রামীণ রাস্তা নির্মাণ ও পাকাকরণ, ব্রিজ-কালভার্ট, সেচ, ফসলের ন্যায্য দাম, বিদ্যুৎ এবং স্থানীয় নিরাপত্তা ঘিরে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটকে সামনে রেখে এই দ্বৈত বাস্তবতা এখন বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে শহর ও গ্রামের ভোটারদের মনস্তত্ত্ব বোঝার প্রতিযোগিতায় নেমেছে রাজনৈতিক দলগুলো। আর সেখানেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের রাজনৈতিক প্রতিফলন।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং রাষ্ট্রকাঠামো, শাসনব্যবস্থা এবং সংস্কার এজেন্ডাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতীয় নির্বাচনের দিনই একই সাথে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ঘিরে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বড় বিতর্কের ইস্যুতে পরিণত হয়েছে এবং এটি নির্বাচনী প্রচারণাকেও প্রভাবিত করছে। ফলে এবারের নির্বাচন শুধু দলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের লড়াই হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
গ্রাম ও শহরের ভোটারদের অগ্রাধিকার পার্থক্য মূলত জীবনযাত্রার কাঠামোগত পার্থক্যের ফল। শহরের ভোটারদের কাছে উন্নত গণপরিবহন, যানজট কমানো, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, নগর পরিকল্পনার পাশাপাশি ফুটপাথ দখল এবং চাঁদাবাজি বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে গ্রামীণ ভোটারদের কাছে কৃষি উৎপাদন খরচ, সার ও সেচ সুবিধা, রাস্তাঘাট, বাজার সংযোগ, স্থানীয় কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামাজিক নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী প্রচারণায় এই পার্থক্য এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান; শহরে উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের ভাষা বেশি জোর পাচ্ছে, আর গ্রামে জীবিকা ও টিকে থাকার প্রশ্নই প্রধান হয়ে উঠছে।
প্রার্থীদের প্রচারণা কৌশলেও এই বৈচিত্র্য স্পষ্ট। গ্রামাঞ্চলে দলগুলো পরিবারভিত্তিক সহায়তা, কৃষি সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্য দিকে শহরে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি খাত, পরিবহন উন্নয়ন, আবাসন এবং নাগরিক সেবা ডিজিটালাইজেশনের প্রতিশ্রুতি সামনে আনা হচ্ছে। বিশেষ করে বড় রাজনৈতিক দলগুলো এখন একই আসনের শহর ও গ্রাম অংশের জন্য আলাদা বার্তা তৈরি করছে, যা নির্বাচনী কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এবারের নির্বাচনের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কাঠামো বদলে যাওয়া। দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেন্দ্রিক নির্বাচনী রাজনীতি থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন রাজনৈতিক জোট, তরুণ নেতৃত্ব এবং আন্দোলনভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি নির্বাচনী মাঠে প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলনের পর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে এবং জনসমর্থন সংগঠনের নতুন পদ্ধতি তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় অতীত রাজনৈতিক ঘটনাও বড় ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন দল তাদের আন্দোলনে ভূমিকা, নির্যাতনের ইতিহাস এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ সামনে আনছে। একই সাথে স্থানীয়পর্যায়ে চাঁদাবাজি, জমি দখল, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ইস্যুও প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে জাতীয় রাজনীতির বড় বিতর্ক স্থানীয় বাস্তবতার সাথে মিশে গিয়ে ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। বিএনপির প্রচারণায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।