শায়খ আহমাদুল্লাহ

বাউলদের মূল কাজ হলো যৌনাচারের উপাসনা করা

বাউল নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, যে অপসংস্কৃতি আমাদের সমাজে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের লেলিহান শিখা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে তারই ইঙ্গিত দিয়েছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ।

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition
Abdullah

বেশ কয়েক বছর লালন শাহ থেকে বিভিন্ন ফকিরদের আখড়া ঘুরে ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ। অন্তত দেড় বছর ধরে বাউল গবেষকদের বইগুলো পড়েছেন এবং যে উপলব্ধি তিনি পেয়েছেন তা বাংলাদেশের মানুষের বাউল সম্পর্কে ধারণা রীতিমতো ভ্রান্তিকর ও ভ্রান্তির বেড়াজালে আটকানো। নিয়মিত বিভিন্ন সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শায়খ। বাউল নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, যে অপসংস্কৃতি আমাদের সমাজে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের লেলিহান শিখা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে তারই ইঙ্গিত দিয়েছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ।

বাউল মতবাদ ও তাদের নিয়ে সমাজে প্রচলিত ধারণা ও প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ কথা বলেন নয়া দিগন্তের সাথে।

নয়া দিগন্ত : সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বাউল সাধনা এতদিন মনে করা হলেও এ নিয়ে কেন বিতর্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে?

শায়খ আহমাদুল্লাহ : বাঙালির লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে বাউল একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়। সাধারণ জনমানসে বাউলদের চিত্র একতারা হাতে উদাসীন চারণকবি, মরমি সাধক কিংবা অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক হিসেবে অঙ্কিত। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র, সাহিত্য ও গণমাধ্যমে বাউল দর্শনকে মানবতাবাদী ও আধ্যাত্মিক মোড়কে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এর আড়ালে বাউলদের গুহ্য সাধনা, বিকৃত যৌনাচার ও ইসলামী আকিদাবিনাশী দর্শন সম্পর্কে সমাজের বেশির ভাগ মানুষই অজ্ঞাত।

নয়া দিগন্ত : দীর্ঘদিন ধরে তাহলে বাউল সম্পর্কে আমরা ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করছি?

শায়খ আহমাদুল্লাহ : বাউল শব্দের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ মতবাদের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে গবেষকরা ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। সাধারণ অর্থে সংস্কৃত ‘বাতুল’ থেকে বাউল শব্দের উৎপত্তি ধরা হয়। এর অর্থ পাগল বা খ্যাপা। কেউ কেউ চর্যাগীতিকার ‘বাজুল’ শব্দটি বাউলের সমার্র্থবোধক বলে অনুমান করেছেন। তাদের মতে ‘বাজুল’ শব্দটি বাউলের পূর্বরূপ। আবার কেউ কেউ বলেন, বাউল এটি বায়ু+উল থেকে এসেছে। উল বা সন্ধানই তাদের লক্ষ্য। তবে বাউল গবেষক ও লালন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ড. আনোয়ারুল করীম তার ‘বাংলাদেশের বাউল সমাজ, সাহিত্য ও সংগীত’ গ্রন্থের বাউল লোকধর্মের উদ্ভবকালের ইতিহাস অধ্যায়ে বলেছেন, বাউল শব্দটি ‘বাআল’ থেকে এসেছে।

প্রাক-ইসলামী যুগে মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও পারস্য অঞ্চলে ‘বাআল’ নামক এক দেবতার পূজা হতো। এই ‘বাআল’ ছিল মূলত উর্বরতা ও প্রজনন দেবতা। কুরআনে সূরা সাফফাতের ১২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এই পূজার কঠোর নিন্দা করে বলেছেন, ‘তোমরা কি ‘বাআল’-এর ইবাদত করছ এবং সর্বোত্তম স্রষ্টাকে পরিত্যাগ করছ?’ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই প্রাচীন ‘বাআল’ পূজার রীতিনীতি, যা মূলত অবাধ যৌনাচার ও লিঙ্গপূজাকেন্দ্রিক ছিল। কালক্রমে নানা হাত ঘুরে ভারতীয় উপমহাদেশে ‘বাউল’ দর্শনে রূপ নিয়েছে। বাউলদের সাধনার মূল ভিত্তি যে প্রজনন ও যৌনাচার, তা এই ঐতিহাসিক যোগসূত্রকে প্রবলভাবে সমর্থন করে।

নয়া দিগন্ত : কেউ কেউ তো বাউলদের মুসলিমদের একটি আধ্যাত্মিক ধারা মনে করে থাকে?

শায়খ আহমাদুল্লাহ : বাউলদের সম্পর্কে মানুষের ধারণা ও প্রকৃত স্বরূপ একেবারেই উল্টো ও সাংঘর্ষিক। বাউলদের অনেকে মুসলিমদের একটি আধ্যাত্মিক ধারা মনে করেন। তাদের গানে, কথাবার্তায় আল্লাহ, রাসূল ও সাহাবিদের নাম এবং আরবি শব্দের ব্যবহার দেখে বিভ্রান্তও হন অনেকে। বাস্তবতা হলো, বাউলদের বিশ্বাস, আচরণ, সাধনা ও তাদের ধারা পরম্পরায় চলে আসা রীতিনীতির সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং নানা দিক থেকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। বাউলরা মূলত লোকসম্প্রদায়ের একটি সাধন-ভজন গোষ্ঠী বৈ আর কিছু নয়। কোনো ধর্মগ্রন্থে তাদের পরিপূর্ণ বিশ্বাস নেই।

নয়া দিগন্ত : বাউলদের নিয়ে এই যে বিপরীত চিন্তা, এর ভিত্তি কী?

শায়খ আহমাদুল্লাহ : বাংলাপিডিয়া বলছে, বাউল সাধনা মূলত নারী-পুরুষের যুগলসাধনা। তারা একসময় গ্রামগঞ্জে, মরুভূমিতে গান গেয়ে ভিক্ষা করে বেড়াত। বাউলদের মতবাদ প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার হলো রূপক শব্দের ব্যবহার। তারা মুখে বলে একটা, কিন্তু উদ্দেশ্য থাকে আরেকটা। তাদের গানে ও আলোচনায় প্রচুর ইসলামী পরিভাষা ব্যবহৃত হয়। সাধারণ মানুষ মনে করে তারা ইসলামের কথাই বলছে। বস্তুত তারা এসব শব্দ দিয়ে তাদের মনগড়া বিকৃত যৌনাচার ও দেহতাত্ত্বিক চিন্তার প্রতি ইঙ্গিত করে। যেমন তারা জায়নামাজ বলে সেবাদাসী বা নারী সঙ্গিনীকে (সূত্র : বাংলাদেশের বাউল সমাজ, সাহিত্য সংগীত, পৃষ্ঠা ১৪৭)।

নয়া দিগন্ত : ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের বিভ্রান্তির ব্যাখ্যা কী?

শায়খ আহমাদুল্লাহ : ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের লোকদের ‘যিন্দিক’ বলা হয়। যিন্দিক হলো এমন ব্যক্তি যে বাহ্যিকভাবে ইসলামের লেবাস বা পরিভাষা ব্যবহার করে মুসলিম সাজার ভান করে, কিন্তু অন্তরে কুফরি ও ইসলাম বিরোধী আকিদা লালন করে। ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী একজন প্রকাশ্য কাফের বা মুরতাদের চেয়েও একজন যিন্দিক ইসলামের জন্য বেশি ক্ষতিকর এবং এদের বিধানও অত্যন্ত কঠোর। কারণ এরা ইসলামের নামে সুকৌশলে ইসলামের মূল ভিত্তি ধ্বংস করে।

নয়া দিগন্ত : বাউল সম্পর্কে প্রচলিত সামাজিক ধারণার বাইরে আমাদের জ্ঞানের অভাবেই কি এ ধরনের ভ্রান্তির ভিত্তি?

শায়খ আহমাদুল্লাহ : বাউল দর্শন : ‘যা আছে ভাণ্ডে, তাই আছে ব্রহ্মাণ্ডে’ এই ছিল লালনের দর্শন। দৈনিক আনন্দবাজার, ১৯ অক্টোবর ২০২২-এর এক নিবন্ধে এস ডি সুব্রত লিখেছেন, ‘বৈষ্ণব সহজিয়া, বৌদ্ধ সহজিয়া ও সুফিবাদের সংমিশ্রণে মানবগুরুর ভজনা, দেহ-কেন্দ্রিক সাধনাই লালন প্রদর্শিত বাউল মতবাদের মূলমন্ত্র।’ অর্থাৎ মানবদেহের বাইরে তারা কোনো স্বতন্ত্র স্রষ্টা বা আল্লাহকে স্বীকার করে না। তাদের মতে, এই দেহই সব; দেহের ভেতরেই ‘মনের মানুষ’ বা সাঁই বাস করেন। ইসলাম যেখানে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইবাদতের কথা বলে, সেখানে বাউলরা এই নশ্বর দেহকেই উপাস্য জ্ঞান করে।

ড. আনোয়ারুল করীম তার ‘বাংলাদেশের বাউল সমাজ সাহিত্য ও সংগীত’ বইয়ের ১৪৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘এরা কুরআন শরিফে বিশ্বাস করে, তবে সে কুরআন লিখিত নয়। তারা বলেন, কুরআন রয়েছে ছিনায় ছিনায়। একে তারা ‘দেল কুরআন’ নামে অবহিত করেছে। আর এদের নামাজ সন্ধ্যায়, সেবাদাসীকে তারা জায়নামাজ বলে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও গবেষক ড. আহমদ শরীফ তার ‘বাউল তত্ত্ব’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বাউলদের সাধনা মূলত কামাচার বা মিথুনাত্মক যোগসাধনা’। অর্থাৎ নারী-পুরুষের যৌনমিলনই তাদের কাছে ইবাদত। পরকীয়া তাদের কাছে বৈধ। তারা মনে করে, নরনারীর গভীর প্রেম দেহ মিলনের চরম উপলব্ধিতে আধ্যাত্মিকতায় পরিণত হয়। ড. মো: আবদুলওহাব তার ‘বাউল তত্ত্বে নারী ভজনা ও নারী সাধনা’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন :

ক. পরকীয়া রতি করে আরতি/ সেই সে ভজনে সার

খ. পাত্রযোগ্য হলে হবে পরকীয়া রস আস্বাদন/ আত্মা ধীর শান্তরতি, অনিত্য হবে সাধনা

গ. পরকীয়া অধিক উল্লাস/কোন রসেরহলে প্রকাশ/যার অঙ্গে রসিক নির্যাস, পরকীয়া গুণ গায়।

অর্থাৎ যে পরকীয়া রতি গ্রহণ করতে পেরেছে, তার সাধন ভজন সার্থক হয়েছে। যোগ্য সাধিকা পরকীয়া নারী সঙ্গ পেলে আত্মা স্থির হয় ও রতি শান্ত হয়। রতি স্খলিত হয় না। স্বকীয়ার চেয়ে পরকীয়াতেই আত্মা বেশি উজার ও আনন্দ পায়। সাধক যত বেশি নারী স্পর্শ পায়, আত্মা তত বিকশিত হয়। তবে মিলনে যদি নারীর সহানুভূতি না থাকে তবে সাধকের সাধনা পণ্ড হয়ে যায়। (বাঙলা সাহিত্যিকী ৪র্থ সংখ্যা, ফাল্গুন-১৪২২)

উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তার বই ‘বাংলার বাউল ও বাউল গান’-এর ৪৮২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘বাউলদের বিশ্বাস হলো, তারা সর্বেশ্বরবাদী। দেহ ও কামাচার এদের কাছে ঐশ্বরিক। দেহের বাইরে কিছু নেই। এখানেই আল্লাহ, নবী, কৃষ্ণ, ব্রহ্মা, পরমাত্মা একাকার। অর্থাৎ ঈশ্বর ও বিশ্বজগৎ অভিন্ন দুই সত্তা।’

নয়া দিগন্ত : তাহলে বাউল নিয়ে অজ্ঞতা তো আমাদের ঈমানের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক অবস্থানে নিয়ে যায়?

শায়খ আহমাদুল্লাহ : বাউলদের বীভৎস জীবনাচারে চারিচন্দ্রভেদ ও অটল সাধনার দিকে খেয়াল করলে দেখবেন সে প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বাউলদের বাহ্যিক গান-বাজনা ও তথাকথিত আধ্যাত্মিকতার আড়ালে ‘চারিচন্দ্র ভেদ’ বা ‘অটল সাধনা’ নামে এমন এক গুহ্য ও বীভৎস আচার রয়েছে, যা সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। ড. আনোয়ারুল করিম ও ড. আবদুল ওহাব এর বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। বাউল দর্শনে বিশ্বাস করা হয়, মানবদেহ মসজিদ বা মন্দিরের সমতুল্য আর এই দেহের ‘গুরুবস্তু’ বা বীর্য (বিন্দু) রক্ষা করাই হলো মূল সাধনা। তারা মনে করে, অতিরিক্ত বিন্দু ক্ষয়ে আয়ু কমে ও দেহ রোগাক্রান্ত হয়। তাই এই বিন্দু রক্ষা বা অমরত্ব লাভের আশায় তারা মল, মূত্র, রজঃ (মাসিক চলাকালীন রক্ত) ও বীর্য এই চারটি বস্তু বিনা দ্বিধায় সাধনার অঙ্গ হিসেবে সেবন করে। ড. আবদুল ওহাবের ‘বাউল তত্ত্বে নারী ভজনা ও নারী সাধনা’ প্রবন্ধে উল্লেখ আছে, রমণীর ঋতুস্রাবের প্রথম তিন দিন ‘অটল মানুষ’ মস্তক থেকে নেমে মূলাধারে আসে। এই তিন দিনকে তারা মহাযোগ বা অমাবস্যার কাল বলে এবং এ সময় তারা ‘মীনরূপী সাঁই’কে ধরার জন্য ত্রিবেণীর ঘাটে শিকারির মতো বসে থাকে। জরা ও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাস থেকে অনেক সাধক ঋতুস্রাবের প্রথম দিনের ‘প্রথম বর্ষণের বিন্দু’ বা দেহরস পান করে থাকে। আবার কোনো কোনো বাউল এমন ধারণা পোষণ করে যে, মাসিক শেষে চন্দ্রের আবির্ভাবকালে যে শৃঙ্গাররস নিঃসৃত হয় তা পান করলে অটলত্ব প্রাপ্তি ঘটে। এই রসকে সাধকদের ভাষায় অমৃতরস বলা হয়। (বাংলাদেশের বাউল সমাজ, সাহিত্য সংগীত, পৃষ্ঠা-৩৮২)

নয়া দিগন্ত : এত বিয়ে বহির্ভূত কামলীলা যা পারিবারিক ও সামাজিক সুসম্পর্ককে তছনছ করে দেয়?

শায়খ আহমাদুল্লাহ : বাউলদের জীবনদর্শনে বিয়ের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। সাধনার অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে তাদের নারীর প্রয়োজন হয় বটে, তারা তাকে ‘সেবাদাসী’ বা ‘সাধন-সঙ্গিনী’ বলে অভিহিত করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই নারীরা সমাজচ্যুত কিংবা অন্যের স্ত্রী। আধ্যাত্মিক সাধনার দোহাই দিয়ে অন্যের স্ত্রীকে আঁখড়ায় নিয়ে আসা বা সঙ্গিনী হিসেবে রাখা তাদের কাছে স্বাভাবিক বিষয়। আমি নিজে যশোরের বিভিন্ন গ্রামে সরেজমিনে দেখেছি। বাউল মতবাদে দীক্ষিত হওয়ার পর অনেক পুরুষ নিজ স্ত্রীকে অন্যের সাথে সাধন বা যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার অনুমতি দিচ্ছে এবং নিজেরাও নির্দ্বিধায় পরকীয়ায় জড়াচ্ছে। মূলত বৈরাগ্য বা সংসার ত্যাগের আড়ালে চলে অবাধ যৌনতা ও নেশার রাজত্ব। গঞ্জিকা সেবন তাদের নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। এসব অসামাজিক ও অনৈতিক কার্যকলাপ একদিকে যেমন পারিবারিক কাঠামো ধ্বংস করছে, অন্য দিকে যুবসমাজকে মাদক ও ব্যভিচারের অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

নয়া দিগন্ত : লালনের ধর্মবিশ্বাস নিয়েও তো ভ্রান্ত ধারণা বিরাজ করছে সমাজে?

শায়খ আহমাদুল্লাহ : লালনের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে গবেষকদের মাঝে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে, যা তার জীবদ্দশায়ও বিদ্যমান ছিল। তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত প্রবাসী পত্রিকার মহাত্মা লালন নিবন্ধে প্রথম লালন জীবনী রচয়িতা বসন্ত কুমার পাল বলেছেন, “সাঁইজি হিন্দু কি মুসলমান, এ কথা আমিও স্থির বলিতে অক্ষম।” বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় লালনের জীবদ্দশায় তাকে কোনো ধরনের ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতে দেখা যায়নি। লালনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। নিজ সাধনা বলে তিনি হিন্দুধর্ম এবং ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। তার রচিত গানে এর পরিচয় পাওয়া যায়। প্রবাসী পত্রিকার নিবন্ধে বলা হয়, লালনের সব ধর্মের লোকের সাথেই সুসম্পর্ক ছিল। মুসলমানদের সাথে তার সুসম্পর্কের কারণে অনেকে তাকে মুসলমান বলে মনে করতেন। আবার বৈষ্ণ বধর্মের আলোচনা করতে দেখে হিন্দুরা তাকে বৈষ্ণব মনে করতেন। প্রকৃতপক্ষে লালন ছিলেন তথাকথিত মানবতাবাদী। (উইকিপিডিয়া)

নয়া দিগন্ত : সেক্যুলারদের কাছে লালন বেশ জনপ্রিয় বলে মনে হয় কিন্তু কেন?

শায়খ আহমাদুল্লাহ : সেক্যুলার গবেষকরা লালনের এই অবস্থানকে অসাম্প্রদায়িকতা বা মানবতাবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, লালন তথাকথিত মানবতাবাদীর মোড়কে মূলত আসমানি কিতাব ও ওহি নির্ভর ধর্মবিশ্বাসকেই অস্বীকার করেছেন। স্রষ্টার নির্দেশের চেয়ে মানবদেহ বা মানুষকে বড় করে দেখানোর এই দর্শন প্রকারান্তরে ধর্মহীনতারই নামান্তর।

নয়া দিগন্ত : পালাগানে বাউলদের পরিবেশন ও ধর্ম অবমাননা নিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিরক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এসব অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সামাজিকভাবে মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন...

শায়খ আহমাদুল্লাহ : একসময় গ্রামগঞ্জে চিত্তবিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল বাউল গানের আসর। বর্তমানে এর প্রচলন কিছুটা কমলেও কিছু অঞ্চলে এখনো এ ধরনের আসর বসতে দেখা যায়। বাহ্যত একে নিছক বিনোদন বা গ্রামীণ বিতর্ক মনে করা হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে ইসলামের মৌলিক আকিদা ও শরিয়তের বিধানকে হেয় করার এক সূক্ষ্ম এজেন্ডা। সাধারণত এই পালা গানগুলোতে দু’টি পক্ষ থাকে একপক্ষ শরিয়ত, অন্যপক্ষ মারেফাত বা বাউল দর্শনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তর্কে লিপ্ত হয়। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এই বিতর্কের আড়ালে নিয়মিতভাবে আল্লাহ, রাসূল সা:, কুরআন ও শরিয়তের বিধান নিয়ে এমন সব মন্তব্য করা হয়, যা সুস্পষ্ট ধর্ম অবমাননার শামিল। সম্প্রতি বাউল শিল্পী আবুল সরকারসহ বেশ কয়েকজন বয়াতির গাওয়া এমন কিছু বিতর্কিত গানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যা স্পষ্টত ধর্ম অবমাননা।

নয়া দিগন্ত : এই বিভ্রান্তি থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা কিভাবে বেঁচে থাকতে পারে?

শায়খ আহমাদুল্লাহ : সার্বিক বিবেচনায় বাউল দর্শন একটি বিভ্রান্তিকর দর্শন। বাহ্যত এদের সংস্কৃতিজীবী মনে হলেও তাদের মাধ্যমে সমাজে ভুল ও বিভ্রান্তিকর বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। তবে আশার কথা হলো, এখনকার মানুষ যথেষ্ট সচেতন। মানুষ যত বেশি কুরআন-সুন্নাহমুখী হয়েছে, তত বেশি বাউলদের প্রসার কমে গেছে। আমরা আশাবাদী যে, মানুষ দিন দিন আরো সজাগও সচেতন হবে। আর এর মধ্য দিয়ে বিভ্রান্তির দৌরাত্ম্য কমবে ইনশাআল্লাহ।