বাজেট প্রণয়নে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেই এগিয়ে যেতে হবে : মীযানুল করীম
Printed Edition
বাংলাদেশ একটি জনবহুল ও এখনো মূলত কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশ। এমন বাস্তবতায় জাতীয় বাজেট প্রণয়ন নিছক একটি হিসাব-নিকাশের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি জটিল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। ফলে বাজেট তৈরির কাজ যতটা কারিগরি, তার চেয়ে বেশি কৌশলগত।
গত এক দশকে রফতানিমুখী শিল্পের কিছু অগ্রগতি হলেও নতুন বাজার সৃষ্টির ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত সাফল্য আসেনি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলার সঙ্কট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সমতার সীমাবদ্ধতা- সব মিলিয়ে অর্থনীতি এক ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাজেট প্রণয়ন আরো কঠিন হয়ে উঠেছে।
আগের নিয়ম অনুযায়ী জুলাই থেকে বাজেট কার্যকর হলেও, পাকিস্তান ও ভারতের মতো এপ্রিল থেকে অর্থবছর শুরুর চিন্তা করা হচ্ছে- যা বাস্তবতার সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু ক্যালেন্ডার বদলালেই সমস্যা মিটবে না; মূল চ্যালেঞ্জ রয়ে যাবে রাজস্ব সংগ্রহ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জায়গায়।
চ্যালেঞ্জগুলো স্পষ্ট ও গভীর : বিভিন্ন পরিসংখ্যান পরিস্থিতির কঠিন চিত্র তুলে ধরে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের চাপ; ছয় মাসে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি; মূল্যস্ফীতি কমার গতি অত্যন্ত ধীর; এক বছরে বেকার বেড়েছে প্রায় দেড় লাখ; বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা; সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ এবং দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি ৬০ লাখ। এ বাস্তবতা বলে দেয়- শুধু বড় অঙ্কের বাজেট ঘোষণা করলেই উন্নয়ন হয় না; বরং অদক্ষ ব্যয়, অপচয় ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা বাজেটকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
নতুন সরকারের সামনে প্রত্যাশা : অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রাথমিক প্রস্তুতি নিলেও এখন দায়িত্ব নতুন নির্বাচিত সরকারের। জনগণের প্রত্যাশা- একটি ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তবমুখী এবং জনগণকেন্দ্রিক বাজেট। বাজেট যেন কেবল কাগজে-কলমে প্রবৃদ্ধির গল্প না বলে; বরং মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।
এক্ষেত্রে শুধু আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি নয়, প্রয়োজন নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি। রাজস্ব আহরণে প্রযুক্তির ব্যবহার, কর ফাঁকি রোধ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্প গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
সবচেয়ে বড় কথা- বাজেট যেন ‘কতিপয় লোকের সুবিধা’ হয়ে না দাঁড়ায়। জনগণের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে বাজেট কখনোই কার্যকর হবে না।
কী কী বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া জরুরি : নতুন সরকারের বাজেট প্রণয়নে কিছু মৌলিক বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে হবে-
১. সময়মতো প্রস্তুতি ও সমন্বিত পরিকল্পনা
২. সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও পরিমাপযোগ্য ফলাফল
৩. দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
৪. খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ
৫. সংসদ সদস্যদের নীতিগত ভূমিকা, অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ পরিহার
৬. রাজস্ব ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ ও অপচয় রোধ
শেষ কথা : বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বাজেট শুধু অর্থের হিসাব নয়; এটি ভবিষ্যৎ পথনকশা। চ্যালেঞ্জ থাকবে-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে চ্যালেঞ্জকে অজুহাত বানালে চলবে না; বরং সেগুলোকে স্বীকার করে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণই হবে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ।
একটি দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও মানবিক বাজেটই পারে অর্থনীতিকে গতিশীল করতে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। এখন সময় কথার নয়- কার্যকর সিদ্ধান্তের।