খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে এখন কী হবে-

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির মৃত্যু হলেও দেশটি হঠাৎ নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েনি। বরং ইরানের সংবিধান ও ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আগে থেকেই নির্দিষ্ট উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া নির্ধারিত আছে, যাতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি না হয়।

ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো একটি মিশ্র মডেল- একদিকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট, অন্যদিকে ‘রাহবার’ বা সর্বোচ্চ নেতার হাতে চূড়ান্ত রাষ্ট্রক্ষমতা। ফলে নেতৃত্ব পরিবর্তন এখানে কেবল রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং সামরিক, ধর্মীয় ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সমন্বিত রূপান্তর।

প্রথম ধাপ : অস্থায়ী নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ: খামেনির মৃত্যু ঘোষণার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। রাজধানী তেহরান, সামরিক ঘাঁটি ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়।

এই পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণে থাকবে ইসলামী বিপ্লবী রক্ষীদলের (আইআরজিসি), যারা ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। সম্ভাব্য বিক্ষোভ, নাশকতা বা বিদেশী হামলার ঝুঁকি মোকাবেলায় তারা সরাসরি মাঠে নামে। লক্ষ্য একটাই- রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেঙে পড়তে না দেয়া।

দ্বিতীয় ধাপ : ধর্মীয় পরিষদের মাধ্যমে নতুন নেতা নির্বাচন : সংবিধান অনুযায়ী নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদ। এই পরিষদের সদস্যরা জনগণের ভোটে আট বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তারা জরুরি বৈঠকে বসে কয়েক দিনের মধ্যে নতুন নেতা নির্ধারণ করবে।

এ নির্বাচন জনগণের ভোটে নয়; ধর্মীয় ও রাজনৈতিক যোগ্যতার ভিত্তিতে পরিষদের অভ্যন্তরীণ ভোটে হয়। প্রার্থীর থাকতে হবে উচ্চ ধর্মীয় জ্ঞান, প্রশাসনিক দক্ষতা ও বিপ্লবী আদর্শে বিশ্বস্ততা।

তৃতীয় ধাপ : ক্ষমতার বাস্তব প্রতিযোগিতা : কাগজে-কলমে এটি ধর্মীয় সিদ্ধান্ত হলেও বাস্তবে এখানে বড় ভূমিকা রাখে ক্ষমতার ভারসাম্য। তিনটি শক্তি প্রভাব ফেলতে পারে- প্রথমত, আইআরজিসি, যাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি; দ্বিতীয়ত, কুমের ধর্মীয় আলেমগোষ্ঠী; তৃতীয়ত নির্বাচিত সরকারপন্থী রাজনীতিকরা, যারা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে তুলনামূলক মডারেট নেতৃত্ব চায়।

চতুর্থ ধাপ : নতুন নেতার ক্ষমতা গ্রহণ : নতুন সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেয়ার পরই তিনি হবেন সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ও সামরিক কমান্ডার নিয়োগের ক্ষমতাও তার হাতে। যুদ্ধ বা শান্তি-চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তার। অন্যান্য, স্থানীয় বিকল্প বদলায় না; সুপ্রিম লিডার বদলালেই রাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত দিকনির্দেশনা বদল হয়।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫ ‘বেলায়ত-ই-ফকিহ’ প্রচারের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করে। অনুচ্ছেদ ১০৭ বিশেষজ্ঞদের পরিষদকে নির্বাচনের দায়িত্ব দেয়। অনুচ্ছেদ ১০৯ যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে। ধারা ১১০ সুপ্রিম লিডারের বিস্তৃত ক্ষমতা নির্দিষ্ট করে। আর অনুচ্ছেদ ১১ মৃত্যু বা অক্ষমতা অস্থায়ী ‘নেতৃত্ব পরিষদ’ দায়িত্ব নেবে এবং দ্রুত নতুন নির্বাচন করবে বলে নির্ধারণ করে।

বাস্তবতা বনাম আইন : আইন বলছে ধর্মীয় পরিষদ সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- আইআরজিসির সমর্থন ছাড়া কেউ ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। তাই আইনি বৈধতা ও সামরিক শক্তির সমন্বয়েই চূড়ান্ত নেতৃত্ব নির্ধারিত হয়।

সম্ভাব্য চিত্র : বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দ্রুত নির্বাচন হবে এবং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক ‘হার্ডলাইনার’ নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনাই বেশি। স্বল্পমেয়াদে দমননীতি ও সামরিক কড়াকড়ি বাড়তে পারে, আর যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের সাথে আপসের সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। সব মিলিয়ে বলা যায়, খামেনির মৃত্যুর পর ইরান বিশৃঙ্খলায় নয়, বরং কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা হস্তান্তরের পথেই হাঁটবে। গণতান্ত্রিক উদারীকরণের চেয়ে নিরাপত্তানির্ভর শাসনই তখন বেশি বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট হয়ে উঠবে।