জমে উঠেছে দণি এশিয়ার বৃহত্তম পাইকারি পোশাকপল্লী

বুড়িগঙ্গার তীরে ৭ হাজার কোটি টাকার হাতছানি

Printed Edition
Back-4
সদরঘাট এলাকায় পোশাকের পাইকারি বাজার : নয়া দিগন্ত

হাবিবুল বাশার

আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এখন মহাব্যস্ত সময় পার করছে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী কেরানীগঞ্জের কালিগঞ্জ, পূর্ব আগানগর ও শুভাঢ্যা এলাকার পোশাকপল্লী। দণি এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম এ পাইকারি বাজারে দিন-রাত চলছে পোশাক তৈরি ও বিক্রির মহোৎসব। ব্যবসায়ী সংগঠন ও স্থানীয় সূত্রমতে, ২০২৬ সালের এ ঈদ মৌসুমে এ এলাকায় প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা লেনদেনের বিশাল ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা এ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পাঞ্চলটি এখন দেশের অভ্যন্তরীণ পোশাক চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান দিচ্ছে। তিন লাধিক শ্রমিকের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হওয়া বাহারি পোশাক এখন শোভা পাচ্ছে দেশের প্রতিটি প্রান্তের ছোট-বড় বিপণিবিতানে।

সত্তর দশক থেকে আজকের ‘গার্মেন্টস ভিলেজ’ : কেরানীগঞ্জের এ বিশাল পোশাকশিল্পের গোড়াপত্তন হয়েছিল মূলত স্বাধীনতার পরপরই। ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে মুষ্টিমেয় কিছু কারিগর পুরনো কাপড় দিয়ে নতুন পোশাক তৈরি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি শুরু করেন। আশির দশকে এই ব্যবসা বাণিজ্যিক রূপ নিতে শুরু করে। সে সময় মূলত ঢাকার ইসলামপুরের পাইকারি কাপড়ের বাজারের নৈকট্য এবং বুড়িগঙ্গা নদীর সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে পুরনো বা ‘ঝুট’ কাপড় দিয়ে সস্তায় শার্ট ও প্যান্ট তৈরি হতো।

নব্বইয়ের দশকে এখানে আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। পুরনো কাপড়ের পরিবর্তে নতুন থানকাপড় ব্যবহার শুরু হয় এবং কালিগঞ্জ ও শুভাঢ্যা এলাকায় কয়েকশ কারখানা গড়ে ওঠে। মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও আধুনিক পোশাকের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে এ এলাকা।

২০০০ সালের পর থেকে কেরানীগঞ্জের পোশাকপল্লী আন্তর্জাতিক মানের ডিজাইন অনুসরণ শুরু করে। এক সময়ের ‘সস্তা পোশাকের বাজার’ এখন অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজারটি কারখানা এবং প্রায় ১২,০০০ শোরুমের এক সুসংগঠিত ‘গার্মেন্টস ভিলেজ’। বিশেষ করে উন্নত মানের জিন্স, গ্যাবার্ডিন প্যান্ট এবং পাঞ্জাবির একচ্ছত্র বাজার তৈরি হয়েছে এখানে।

বিশাল কর্মযজ্ঞ ও ল্যমাত্রা

কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমবায় সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এ পোশাকপল্লীতে প্রত্য ও পরোভাবে প্রায় তিন লাখ শ্রমিক নিয়োজিত। তবে ঈদের মৌসুমে কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত আরো প্রায় ৫০ হাজার থেকে এক লাখ অস্থায়ী শ্রমিক এখানে যোগ দেন। এখানকার কারিগররা মূলত পিস-রেট ভিত্তিতে মজুরি পান। শবে বরাতের পর থেকেই শ্রমিকরা দিন-রাত কাজ করছেন। একজন দ কারিগর এ মৌসুমে ওভারটাইমসহ মাসে ৪০,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।

২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার বিক্রির ল্যমাত্রা ধরেছেন। গত ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ব্যবসায়ীরা কিছুটা তির সম্মুখীন হলেও, ২০২৬ সালের এ মৌসুমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নতুন ডিজাইনের আধিক্যের কারণে বাজার বেশ চাঙ্গা।

ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ

বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কালিগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী আনোয়ার বলেন : ‘এ বছরের শুরুতেই আমাদের টার্গেট ছিল সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার বাজার ধরা। সাধারণত ১৫-১৬ রমজানের মধ্যেই আমাদের মূল পাইকারি বেচাকেনা শেষ হয়ে যায়। এরপর বাকি সময়গুলোতে আমরা মফস্বলের পাওনা টাকা উত্তোলনের কাজ করি। আমরা এখনও আশাবাদী যে, ল্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাব। এ ছাড়া শ্রমিকদের পূর্ণ বোনাসের ব্যাপারে আমরা ব্যবসায়ীরা বদ্ধপরিকর। আমাদের মার্কেটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বেশ স্থিতিশীল আছে।

তবে বাজারের মিশ্র প্রতিক্রিয়াও পাওয়া গেছে। কালীগঞ্জের মক্কা-মদিনা গার্মেন্টস-এর মালিক আল আমিন জানান, অন্য বারের তুলনায় এবার বেচাকেনা কিছুটা ধীরগতির।

আমরা ১-১৮ বছর বয়সী শিশুদের প্যান্ট-শার্ট বিক্রি করি। ২০ রমজানের মধ্যে আমাদের মূল কাজ শেষ হয়ে যায়। ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম জানান, শীতের সিজনে বিক্রি কিছুটা কম হলেও শবে বরাতের পর থেকে ১৫ রমজানের ভেতর তাদের ল্যমাত্রা অধিকাংশ পূর্ণ হয়ে গেছে।

কেরানীগঞ্জ পোশাকপল্লীর প্রধান আকর্ষণ

আভিজাত্যের পাঞ্জাবি ও কুর্তা : সুতি, লিলেন, সিল্ক ও জ্যাকার্ড কাপড়ের ওপর আধুনিক এমব্রয়ডারি, কারচুপি ও ডিজিটাল প্রিন্টের কাজ করা পাঞ্জাবি। এখানে বড়দের পাশাপাশি ছোটদের জন্যও রয়েছে বর্ণিল পাঞ্জাবির সমাহার।

আধুনিক প্যান্ট (জিন্স ও গ্যাবার্ডিন) : দেশীয় ও আমদানিকৃত প্রিমিয়াম ডেনিম কাপড়ে তৈরি সঙ্কীর্ণ (ঘধৎৎড়)ি ও স্ট্রেট ফিট জিন্স। এ ছাড়া ফরমাল ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন কালারের উন্নত মানের গ্যাবার্ডিন প্যান্ট।

পুরুষদের প্রিমিয়াম কালেকশন

ব্লেজার ও ওভারকোট : আধুনিক ফিটিং ও বিভিন্ন টেক্সচারের ফরমাল এবং ক্যাজুয়াল ব্লেজার। শীতে ও উৎসবে পরার জন্য রয়েছে স্টাইলিশ ওভারকোট।

কোটি (ডধরংঃপড়ধঃ) : পাঞ্জাবির সাথে মানানসই জ্যাকার্ড ও কন্ট্রাস্ট কাপড়ের বাহারি ডিজাইনের কোটি।

শার্ট : অফিসিয়াল ফরমাল শার্ট থেকে শুরু করে তরুণদের পছন্দের ডিজিটাল প্রিন্টেড ও চেক ক্যাজুয়াল শার্ট।

পায়জামা : পাঞ্জাবির সাথে পরার জন্য আলীগড়, চুড়িদার ও প্যান্ট কাট পায়জামা।

ছোটদের পোশাক : ছেলে ও মেয়ে

বাবা সেট : ১-১৮ বছর বয়সী ছেলেদের জন্য প্যান্ট ও শার্টের আকর্ষণীয় ম্যাচিং সেট।

শিশুদের উৎসবের সাজ : ছোটদের জন্য পাঞ্জাবি-পায়জামা সেট এবং বিশেষ ডিজাইনের কোটি।

মেয়ে শিশুদের ফ্রক ও টপস : রঙিন ফেব্রিক ও নেটের তৈরি আকর্ষণীয় ফ্রক, কুর্তি এবং আধুনিক টপস।

ছোটদের লেহেঙ্গা : উৎসবের আমেজে তৈরি শিশুদের বর্ণিল লেহেঙ্গা সেট।

নারীদের আধুনিক পোশাক

থ্রি-পিস ও টু-পিস : সাধারণ সুতি থেকে শুরু করে গর্জাস ডিজাইনের পার্টি ওয়্যার থ্রি-পিস।

আধুনিক কুর্তি : তরুণীদের পছন্দের সমকালীন ডিজাইনের শর্ট ও লং কুর্তি।

ব্যবসায়ী সমিতি কর্তৃপ বলেন, কেরানীগঞ্জের এ বাজারে বর্তমানে পাঞ্জাবি ও প্যান্টের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকলেও, ক্রেতাদের রুচিভেদে ব্লেজার ও কটির এক বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। সাশ্রয়ী মূল্যে আধুনিক ও মানসম্মত পোশাক সারা দেশে পৌঁছে দেয়াই আমাদের প্রধান ল্য।

পাওনা আদায় ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্যমতে, ১৫ রমজানের পর অধিকাংশ পাইকারি লেনদেন শেষ হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় বকেয়া টাকা আদায়ের পালা। তবে এ েেত্র কিছু সমস্যাও পোহাতে হয় ব্যবসায়ীদের। অনেকের দাবি, ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বকেয়া লেনদেন করার পর অনেক সময় টাকা উঠাতে বেগ পেতে হয়।

কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের মতো কিছু চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা এ হাব নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখছেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও রাজশাহীসহ দেশের প্রতিটি জেলা থেকে পাইকারি ক্রেতারা এসে এখান থেকে পণ্য নিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে বুড়িগঙ্গার তীরের এ পোশাকপল্লী কেবল দেশের চাহিদা নয়, বরং বিদেশেও রফতানির বড় ত্রে হয়ে উঠতে পারে।