ট্রাম্প ইরানে হত্যাকাণ্ড কমতে দেখলেও সামরিক হস্তেেপর শঙ্কা কাটেনি
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানজুড়ে বিােভ দমনে যে হত্যাকাণ্ড চলছিল তা কমে এসেছে এবং তারা আর বিপুলসংখ্যক বিােভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা ভাবছে না বলেই তার ধারণা। দেশটির কর্তৃপরে বিরুদ্ধে গত কয়েকদিন ট্রাম্প যে হুমকি-ধমকির সুরে কথা বলেছিলেন, বুধবার ওভাল অফিসে করা মন্তব্যে তার ছিটেফোঁটাও ছিল না। তা সত্ত্বেও দেশটিতে মার্কিন হস্তেেপর শঙ্কা কমেনি বলে ইঙ্গিত বিশ্লেষক ও কূটনীতিকদের। ট্রাম্প নিজেও ইরানে সামরিক হস্তেেপর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
তবে একাধিক বিশেষজ্ঞ ও আঞ্চলিক কূটনীতিকের আশঙ্কা, মার্কিন সামরিক হস্তপে বিােভকারীদের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। ওই পদপে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ওপর দমনপীড়নের তীব্রতা বাড়াতে পারে, পাল্টা পেণাস্ত্র হামলার ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি বড়সড় অভিযান চালায়, তেমন েেত্র তড়িঘড়ি সরকার পতন ৯ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে তুমুল বিশৃঙ্খলার জন্ম দিতে পারে, সংখ্যালঘু কুর্দি ও বেলুচদের বিদ্রোহ চাঙ্গা হতে পারে এবং ইরানের পারমাণবিক ও পেণাস্ত্র কর্মসূচি অনিরাপদ কারো হাতে পড়তে পারে।
বিষয় সম্বন্ধে অবগত চারটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, সাম্প্রতিক এ বিােভ ইরানের শাসকদের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হলেও এতে সরকার পতনের লণ দেখা যাচ্ছে না বলে একাধিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নেও আভাস দেয়া হয়েছে।
‘আমাদের অনেকগুলো অস্থির জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী রয়েছে। ছড়ানো-ছিটানো অঘোষিত ফিসাইল পদার্থ রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় পেণাস্ত্রের ভাণ্ডার রয়েছে, যেগুলোর ওপর কোনো কমান্ড বা নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শরণার্থীদের প্রবাহ দেখছি, উল্লেখ করার মতো বর্বরতাও ঘটছে। ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনে সংশ্লিষ্ট সব আশঙ্কা প্রকট হয়ে উঠবে,’ বলেছেন ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিজের বিশ্লেষক বেহনাম বেন তালেবলু।
১৯৭৯ সালে বিপ্লবের মাধ্যমে মতা নেয়া ইরানের মোল্লাতন্ত্র দেশের অভ্যন্তরে এবারের বিােভের মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে আর পড়েনি। এবার দেশটিতে সরকার থউৎখাত করতে চাওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষ নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে জড়িয়েছিল।
২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ বিােভে দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ইরানি এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা একটি গোষ্ঠী নিহতের সংখ্যা দুই হাজার ৬০০-এর বেশি বলে দাবি করছে। হতাহতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি বলে অনেক বিশেষজ্ঞের অনুমান। এসব নিয়ে রয়টার্স হোয়াইট হাউজ ও জাতিসঙ্ঘে ইরানের প্রতিনিধিদলের সাথে যোগাযোগ করলেও তাৎণিকভাবে তাদের দিক থেকে সাড়া পায়নি। বুধবার ট্রাম্প বলেছেন, ইরানি দমনাভিযানে হত্যাকাণ্ডের পরিমাণ কমেছে বলে ‘অপর পাশের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলো’ জানিয়েছে। এর পাশাপাশি তেহরান বিপুলসংখ্যক বিােভকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পরিকল্পনা করছে না বলেও তার ধারণা। তবে তিনি ইরানে মার্কিন সামরিক হস্তেেপর সম্ভাবনা উড়িয়েও দেননি। বলেছেন, ‘আমরা দেখব পরিস্থিতি কী দাঁড়াচ্ছে।’ মার্কিন প্রশাসন ইরান থেকে একটি ‘খুব ভালো বিবৃতি’ পেয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
আকাশসীমা বন্ধের হুঁশিয়ারি সৌদি আরবের
এ দিকে মিডল ইস্ট মনিটর জানায়, ইরানের ওপর সম্ভাব্য সামরিক হামলা ঠেকাতে কাতার ও ওমানকে সাথে নিয়ে বিশেষ কূটনৈতিক উদ্যোগে নেমেছে সৌদি আরব। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, সৌদি আরব আশঙ্কা করছে যেকোনো সঙ্ঘাত বৃদ্ধি তাদের অর্থনীতিকে বড় ধরনের তির মুখে ফেলতে পারে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো- এ ধরনের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হলে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। কূটনৈতিক মহলের মতে, সৌদি আরবের এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ইরানের ওপর হামলা হলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর নিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারে বলেও উদ্বিগ্ন আরব রাষ্ট্রগুলো। উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রবেশপথে অবস্থিত এই সঙ্কীর্ণ জলপথটি ইরানকে তার প্রতিবেশী আরব দেশগুলো থেকে আলাদা করেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানিতেল পরিবহনের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হয়ে থাকে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র তার উপসাগরীয় মিত্রদের সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলার পরই এই পদপে নেয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনের এই সতর্কবার্তা উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজধানীতে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। তারা এই সঙ্ঘাতের আঞ্চলিক পরিণতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর স্থিতিশীলতা এবং নিজেদের ভূখণ্ডে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরব, কাতার ও ওমান হোয়াইট হাউজকে বলেছে, ইরানের সরকার উৎখাতের যেকোনো চেষ্টা তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করবে এবং শেষপর্যন্ত তা মার্কিন অর্থনীতিরই তি করবে। সৌদি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আরো জানিয়েছে, রিয়াদ ইতোমধ্যে তেহরানকে আশ্বস্ত করেছে যে, তারা কোনো সম্ভাব্য সঙ্ঘাতের অংশ হবে না। মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রকে সৌদির আকাশসীমা ব্যবহার করে হামলা চালানোর অনুমতি দেবে না বলেও জানিয়ে দিয়েছে রিয়াদ। জানা গেছে, উপসাগরীয় দেশগুলো ওয়াশিংটনকে তেহরানে ‘সরকার পরিবর্তনের’ কোনো প্রচেষ্টা না চালানোর জন্যও সতর্ক করেছে। তাদের মতে, এ ধরনের পদপে গোটা অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
পাঁচ ঘণ্টা পর আকাশসীমা খুলল ইরান
আলজাজিরা জানিয়েছে, হঠাৎ করেই আকাশসীমা বন্ধ করে দেয় ইরান, যা নিয়ে শুরু হয় নানা জল্পনা-কল্পনা। অনেকেই মনে করেছিলেন, আসন্ন মার্কিন হামলা ঠেকাতেই তেহরান এ পদপে নিয়েছে। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবারো আকাশসীমা চালু করেছে দেশটি। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার অচলাবস্থা কাটিয়ে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোরে বিমান চলাচল স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেয় ইরান। কূটনৈতিক মহলের মতে, এ সিদ্ধান্ত সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে নতুন বার্তা বহন করছে। সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কায় বুধবার গভীর রাতে হঠাৎ করেই আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তেহরান। মার্কিন ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নোটিশ অনুযায়ী, বুধবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ১০টা ১৫ মিনিট থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। সে সময় আন্তর্জাতিক আগমন ও প্রস্থানকারী বিশেষ অনুমোদিত ফাইট ছাড়া সবধরনের বাণিজ্যিক বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তবে গ্রিনিচ মান সময় বৃহস্পতিবার রাত ৩টার কিছু আগে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। ফাইট ট্র্যাকিং সার্ভিস ফাইট রাডার-টোয়েন্টিফোর জানিয়েছে, আকাশসীমা খোলার পরপরই ইরানের অভ্যন্তরীণ বেশ কিছু ফাইট পুনরায় যাত্রা শুরু করেছে।
রেজা পাহলভির নেতৃত্ব নিয়ে সন্দেহ
রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের মতাচ্যুত শাহের পুত্র ও বিরোধী নেতা রেজা পাহলভিকে ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ইরানের জনগণ তাকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে কি না, সে বিষয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বুধবার ওভাল অফিসে রয়টার্সকে দেয়া এক বিশেষ সাাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর পতনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই পরিস্থিতিতে রেজা পাহলভি নেতৃত্বের শূন্যস্থান পূরণ করতে পারবেন কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। কূটনৈতিক মহলের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।