ভোলার চরে শুঁটকি মৌসুমের ব্যস্ততা শ্রমিকদের ঘামে জীবিকার স্বপ্ন
Printed Edition
ভোলা প্রতিনিধি
উপকূলের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এখন শুঁটকি মৌসুমের শেষ ভাগের ব্যস্ততা। মাঠজুড়ে রোদে বিছানো ছোট মাছ, চিংড়ি ও ছেউয়া দূর থেকে সোনালি কার্পেটের মতো দেখায়। আবহাওয়ার পরিবর্তনের আগে রোদের প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগাতে নারী-পুরুষ শ্রমিকরা দিনভর নিরলস পরিশ্রম করছেন।
ভোলা জেলার চরাঞ্চল, বিশেষ করে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ঢালচরে গিয়ে দেখা যায়, নদী থেকে ট্রলারে করে মাছ আসছে ঘাটে। শ্রমিকরা মাছ ধুয়ে পরিষ্কার করছেন, আলাদা করছেন চিংড়ি ও ছেউয়া। এরপর বাঁশের চাটাই বা জাল শিটের ওপর সারিবদ্ধভাবে মাছ বিছিয়ে রোদে শুকানো হচ্ছে। কেউ মাছ উল্টাচ্ছেন, কেউ আলাদা করছেন, আবার কেউ বস্তাবন্দি করছেন। সূর্য ডোবার আগেই দিনের উৎপাদন গুছিয়ে রাখতে সবার মধ্যে তাড়া।
শুঁটকি উৎপাদনে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। অনেক গৃহিণী মৌসুমে বাড়তি আয়ের আশায় এ কাজে যুক্ত হয়েছেন এবং পুরুষদের সাথে সমানতালে শ্রম দিচ্ছেন।
স্থানীয় জেলে ছালাউদ্দিন জানান, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর মেঘনায় ছেউয়া মাছের পরিমাণ বেশি। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে। নদী থেকে মাছ ধরে চরেই শুকানো হয়, আর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে সরাসরি কিনে নিয়ে যান। চলতি মৌসুমে কয়েক লাখ টাকার লেনদেন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মাঝি হারুন পণ্ডিত বলেন, ঢালচরের শুঁটকি উৎপাদন পুরোপুরি প্রাকৃতিক রোদনির্ভর। আধুনিক ড্রায়ার বা সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় হঠাৎ বৃষ্টি, অতিরিক্ত আর্দ্রতা বা ঝড়ো হাওয়ায় বড় ক্ষতির ঝুঁকি থাকে, বিশেষ করে মৌসুমের শেষ দিকে।
শ্রমিক আলমগীর বেপারী ও বিধবা রেনু বেগম জানান, প্রতিদিন সকালে কাজ শুরু হয়। রোদে শুকানো থেকে বাছাই ও বস্তাবন্দী সব কাজই করতে হয়। প্রতিটি কেন্দ্রে গড়ে ১০-১২ জন শ্রমিক কাজ করেন। কেউ দৈনিক ৭০০-৮০০ টাকা মজুরিতে, কেউ মৌসুমি চুক্তিতে কাজ করেন। কয়েক মাসের এই আয়ই অনেক পরিবারের সারা বছরের ভরসা।
ঢালচরের শুঁটকি আড়ৎদার শাহে আলম ফরাজি জানান, এ বছর শুঁটকির চাহিদা ও পরিচিতি বেড়েছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে। চিংড়ির শুঁটকি মণপ্রতি ছয়-সাত হাজার টাকা, মাটিতে শুকানো ছেউয়া এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা এবং জাল শিটে শুকানো ছেউয়া তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চরফ্যাসন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, ঢালচরের শুঁটকি খাতকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে কাজ চলছে। উৎপাদকদের কেমিক্যালমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে উৎপাদনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। মান নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা গেলে এই খাত উপকূলের অর্থনীতিতে আরো বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।