লাল সোয়েটার : ফারহানা খানম

Printed Edition
agdum-3
লাল সোয়েটার : ফারহানা খানম

জানুয়ারির শুরুতেই শীতের খবরটা আসে। ভোরে ঘুম ভাঙতেই নিঃশ্বাসে ধোঁয়া, জানালার কাচে শিশির, আর উঠোনে ঘাস ভিজে চকচক করছে। ১৪ বছরের রিহান কম্বল মুড়ি দিয়ে বলে, এত শীত! স্কুল কেন বন্ধ করে না কেউ? মা হেসে উত্তর দেয়, শীত বন্ধ করা যায় না বাবা, সামলাতে হয়।

রিহান জানে, শীত মানে শুধু কম্বল আর চা না। শীত মানে সকালের কুয়াশা, হাত-পা জমে যাওয়া, আর রাস্তার পাশে বসে থাকা কিছু মানুষ, যাদের গায়ে কিছুই নেই।

সেদিন স্কুলে অ্যাসেম্বলিতে হেডস্যার ঘোষণা দিলেন, আগামী সপ্তাহে আমাদের স্কুল থেকে শীতবস্ত্র সংগ্রহ করা হবে। যাদের বাড়িতে পুরনো কিন্তু ব্যবহারযোগ্য জামা আছে, তারা নিয়ে আসবে। বন্ধুরা কেউ কেউ ফিসফিস করে হাসল, পুরনো জামা কে দেবে? রিহান চুপ করে রইল।

তার মনে পড়ছে আলমারির ভেতরে রাখা একটি লাল সোয়েটার, দুই বছর আগে দাদু কিনে দিয়েছিলেন। এখন একটু ছোট হয়ে গেছে, কিন্তু খুব প্রিয়।

সন্ধ্যায় রিহান আলমারি খুলে সোয়েটারটা বের করল। নরম; কিন্তু কিছু জায়গায় সেলাইয়ের দাগ। দাদু বলেছিলেন, শীতে গরম জামা শুধু শরীর গরম রাখে না, মনও গরম রাখে।

দাদু এখন নেই। কিন্তু সোয়েটারটা পরলেই কেমন যেন দাদুর হাতের উষ্ণতা টের পায় রিহান। মা বলল, দিতে চাও? রিহান চুপ করে রইল। ভেতরে একটা টান। দেবে, নাকি রাখবে? পরদিন খুব ভোরে রিহান বের হয় স্কুলে যাওয়ার জন্য। চারদিক কুয়াশায় ঢাকা। রাস্তার মোড়ে একটি ছোট ছেলে বসে আছে। বয়স সাত-আট হবে। গায়ে পাতলা শার্ট, কাঁপছে। রিহান থেমে তাকাল। ছেলেটা তাকিয়ে বলল, ভাইয়া, শীত।

এই এক শব্দ। আর কিছু না। রিহানের বুকটা কেঁপে উঠল। স্কুলে পৌঁছে রিহান আর ক্লাসে মন দিতে পারল না। তার চোখে বারবার ভেসে উঠছে সেই ছোট ছেলেটার কাঁপা হাত। টিফিনের সময় সে বাড়ি ফিরে এলো। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এত তাড়াতাড়ি? রিহান আলমারি খুলে লাল সোয়েটারটা হাতে নিলো। একটু সময় নিলো, তারপর বলল- মা, আমি এটি দিতে চাই।

মা কিছু বললেন না। শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। রিহান আবার রাস্তায় গেল। কুয়াশা তখনো পুরো কাটেনি। সে সেই ছোট ছেলেটাকে খুঁজে পেল। দোকানের পাশে বসে আছে। রিহান কাছে গিয়ে সোয়েটারটি এগিয়ে দিলো।

এটা পরো।

ছেলেটা প্রথমে ভয় পেলো, তারপর নিলো। গায়ে দিতেই তার মুখে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। ‘গরম’ সে বলল। এই এক শব্দে রিহানের চোখ ভিজে উঠল। পরদিন স্কুলে রিহান লাল সোয়েটার ছাড়াই গেল। বন্ধু জিজ্ঞেস করল- তোর লাল সোয়েটার কই? রিহান হেসে বলল, ওটা এখন কারো শীত কমাচ্ছে। অ্যাসেম্বলিতে হেডস্যার বললেন, আজ তোমরা সবাই একটা কাজ করেছ। শীতকে একটু হারিয়েছ। রিহান বুঝল, শীত শুধু ক্যালেন্ডারের ঋতু না। শীত আসে মানুষের জীবনে, আর মানুষই পারে মানুষকে উষ্ণ রাখতে।

সন্ধ্যায় রিহান ছাদে উঠে দাঁড়ায়। আকাশ পরিষ্কার, ঠাণ্ডা বাতাস। সে মনে মনে দাদুকে বলে, দাদু, তুমি ঠিক বলেছিলে। কুয়াশার ভেতর কোথাও হয়তো একটি ছোট ছেলে লাল সোয়েটার গায়ে দিয়ে উষ্ণ হয়ে হাসছে। আর সেই হাসিটাই এই শীতের সবচেয়ে সুন্দর গল্প।