ইসরাইল-সৌদি চাপেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা : বার্নি স্যান্ডার্স
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা যখন নতুন করে বিস্ফোরণের মুখে, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উঠে এলো চাঞ্চল্যকর এক বক্তব্য। মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স দাবি করেছেন, ইরানে সাম্প্রতিক মার্কিন হামলা ছিল না কেবল ওয়াশিংটনের নিজস্ব নিরাপত্তা কৌশল; বরং এর পেছনে ছিল ইসরাইল ও সৌদি আরবের প্রবল চাপ ও লবিং।
তার ভাষায়, ‘আমরা আবারো মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছি- আমাদের জনগণের স্বার্থে নয়; বরং মিত্রদের ভূরাজনৈতিক এজেন্ডা রক্ষায়।’
এই বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে- যুক্তরাষ্ট্র কি নিজের কৌশলে চলছে, নাকি আঞ্চলিক জোট-রাজনীতির চাপে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে?
স্যান্ডার্স কী বললেন?
কংগ্রেসে দেয়া বক্তব্য ও সামাজিক মাধ্যমে পোস্টে স্যান্ডার্স স্পষ্ট ভাষায় অভিযোগ করেন- ইসরাইল দীর্ঘ দিন ধরেই ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় কঠোর পদক্ষেপের জন্য চাপ দিয়ে আসছে। সৌদি আরবও ইরানকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দুর্বল করতে চায়। এই দুই দেশের স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রকে সামনে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। কংগ্রেসের পূর্ণ অনুমোদন ছাড়া সামরিক অভিযান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী।
তার মতে, ‘আমেরিকান তরুণদের জীবন ঝুঁকতে ফেলে অন্য দেশের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণ করা গ্রহণযোগ্য নয়’।
প্রশ্ন হলো- কেন ইসরাইল ও সৌদি চায় ইরান দুর্বল হোক? বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে বহুস্তরীয় ভূরাজনীতি।
ইসরাইলের উদ্বেগের কারণ- ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা, হিজবুল্লাহ ও হামাসের প্রতি তেহরানের সমর্থন, সীমান্ত নিরাপত্তা হুমকি। সৌদি আরবের হিসাব- আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, ইয়েমেন ও উপসাগরীয় রাজনীতিতে প্রভাব, শিয়া-সুন্নি ক্ষমতার ভারসাম্য।
ফলে দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রকে ‘নিরাপত্তা অংশীদার’ হিসেবে ব্যবহার করে কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করছে- এমনটাই ধারণা অনেক গবেষকের।
ওয়াশিংটনের ভেতরে বিভাজন
এই ইস্যুতে মার্কিন রাজনীতিতেও বিভক্তি স্পষ্ট। একদল বলছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দমন করা প্রয়োজন। অন্য দিকে স্যান্ডার্সসহ প্রগতিশীলরা বলছেন- ‘অন্তহীন যুদ্ধ আমেরিকার অর্থনীতি ও গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।’
তাদের যুক্তি- আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ব্যর্থ। সেখানে বিলিয়ন ডলার ব্যয়; কিন্তু স্থিতিশীলতা আসেনি। আর নতুন সঙ্ঘাত মানে নতুন মানবিক বিপর্যয়।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আগুন?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করছেন, এই সঙ্ঘাত যদি বিস্তৃত হয়, তবে- তেলবাজারে অস্থিরতা, উপসাগরীয় জোট পুনর্বিন্যাস, প্রক্সি যুদ্ধ বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ আসবে। অর্থাৎ, এটি কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘাত নয়; বরং পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।
কূটনীতি নাকি যুদ্ধ?
স্যান্ডার্সের বার্তা পরিষ্কার- ‘যুদ্ধ নয়, কূটনীতি’। তিনি ইরানের সাথে নতুন করে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানিয়েছেন এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সামরিক অভিযান বন্ধের দাবি তুলেছেন।
তার মতে, ‘মধ্যপ্রাচ্যে বোমা নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান’।
ইসরাইল ও সৌদির কৌশলগত উদ্বেগ বাস্তব হতে পারে; কিন্তু সেই উদ্বেগ মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র কি সরাসরি যুদ্ধে নামবে- নাকি কূটনীতিকে প্রাধান্য দেবে? বার্নি স্যান্ডার্সের বক্তব্য সেই পুরনো প্রশ্নটাই আবার সামনে এনেছে- আমেরিকার যুদ্ধ কার জন্য?
মধ্যপ্রাচ্যের আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগে এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে জরুরি।