মাটিহীন কৃষির বৈপ্লবিক যাত্রা : পল্লব শাহরিয়ার

Printed Edition
pas-2
মাটিহীন কৃষির বৈপ্লবিক যাত্রা : পল্লব শাহরিয়ার

ব্রাজিলের সেরাডো সাভানার নির্জন প্রান্তর, যেখানে খরা ও মরুকরণের ছোবলে প্রতি বছর লাখো হেক্টর জমি কৃষির উপযোগিতা হারায়, সেখানে এক দল জৈবপ্রযুক্তিবিদ এক বৈপ্লবিক আবিষ্কার করেছেন ‘অ্যারোস’। এটি এমন এক বীজ, যা মাটি স্পর্শ না করেও অঙ্কুরিত হতে পারে এবং বেড়ে উঠতে পারে শুধু বাতাসের আর্দ্রতা ও সূর্যালোকের ওপর নির্ভর করে। এই প্রযুক্তি শুধু একটি বীজ নয়; বরং কৃষির ধারণাকেই বদলে দিতে পারে। আমাদের এখনকার কৃষি পদ্ধতি প্রায় সম্পূর্ণভাবে মাটির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিয়ন্ত্রিত চাষাবাদের কারণে উপযুক্ত জমির অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। অ্যারোস সেই সঙ্কটের মধ্যেই নিয়ে এসেছে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত। অ্যারোস বীজের প্রকৃত জাদু লুকিয়ে আছে এর সিম্বিওটিক আবরণে- একটি জৈবজেল যা তৈরি করা হয়েছে ইঞ্জিনিয়ার্ড শৈবাল, উপকারী ছত্রাক এবং সিলিকা মাইক্রোক্যাপসুল দিয়ে। এই জেল আবরণটি কয়েকটি কাজ একসাথে করে : এটি বাতাস থেকে নাইট্রোজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, সূর্যালোকের সংস্পর্শে সালোকসংশ্লেষণ চালায় এবং বীজের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি তৈরি করে। এই কার্যক্রম এতটাই নিখুঁতভাবে সংগঠিত যে মাটির জৈব-রাসায়নিক মিথষ্ক্রিয়ার অনুকরণ ঘটে। পরীক্ষাগারে এবং খোলা মাঠে অ্যারোস বীজের কার্যকারিতা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। শিম ও ভুট্টা বীজে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করে দেখা গেছে যেকোনো পাত্র বা মাটি ছাড়া শুধু শিশির ও সূর্যালোকেই ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত অঙ্কুরোদ্গম হয়েছে। একবার শিকড় গজিয়ে উঠলে, এই জেল আবরণ শক্ত হয়ে অস্থায়ী এক ‘মূল অঞ্চল’ তৈরি করে, যা গাছটিকে মাটিতে পৌঁছানো পর্যন্ত সহায়তা করে। এটি এমন জমিতে চাষের সুযোগ তৈরি করে যেখানে ক্ষয়, লবণাক্ততা বা দূষণ মাটির উপরের স্তরকে অযোগ্য করে তুলেছে। এই উদ্ভাবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর জৈব-জলীয় প্রকৃতি। ৩০ দিনের মধ্যে এই আবরণ সম্পূর্ণরূপে ভেঙে যায় এবং কোনো প্রকার পরিবেশ দূষণ বা অবশিষ্টাংশ রেখে যায় না। ফলে এটি পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কৃষির পথপ্রদর্শক হতে পারে।

ব্রাজিলের কৃষকরা প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ হেক্টর জমি খরা ও মাটির অবক্ষয়ের কারণে হারিয়ে ফেলেন। অ্যারোস বীজ সেই জমিগুলোতে পুনরায় কৃষি শুরু করতে সক্ষম হতে পারে। শুধু তাই নয়, পরিত্যক্ত শহুরে ছাদ, পাথরের গাঁথুনি, কিংবা মরুভূমির প্রান্তরে যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় সেখানে এই বীজ দিয়ে গাছ জন্মানো সম্ভব। এখানেই শেষ নয়। অ্যারোস প্রযুক্তির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো এর মডুলার নকশা। প্রতিটি ফসলের জন্য ভিন্ন ধরনের জেল আবরণ ডিজাইন করা হয়। যেমন- সয়াবিনের জন্য নাইট্রোজেন-সমৃদ্ধ কোটিং, টমেটোর জন্য ফসফরাস-ভিত্তিক কোটিং ইত্যাদি। এর প্রতিটি রূপ জলবায়ু ও পরিবেশের উপযোগিতা অনুযায়ী নিরীক্ষা করা হয় বিশেষ গ্রোথ চেম্বারে। এই চেম্বারগুলো পূর্বাভাস দিতে পারে কোন বীজ কোন পরিবেশে কিভাবে সাড়া দেবে। এই মুহূর্তে অ্যারোস প্রযুক্তি ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খরা-আক্রান্ত করিডোরে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা চলছে। সেখানে বৃষ্টিপাত খুবই কম এবং জলবায়ুর প্রতিকূলতায় কৃষকরা পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছেন। এই প্রযুক্তি সাফল্য পেলে এটি শুধু ব্রাজিলেই নয়; বরং আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার মতো খরাপ্রবণ দেশগুলোতেও কৃষি বিপ্লব আনতে পারে।

এই উদ্ভাবনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও বিশাল। এর মাধ্যমে খরার কারণে যে অভিবাসন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বাড়ছে, তা রোধ করা সম্ভব হবে। যেসব অঞ্চল কৃষির বাইরে ছিল সেগুলোও উৎপাদনশীল হয়ে উঠবে। উপরন্তু প্রচলিত কৃষির তুলনায় এখানে সার, কীটনাশক, পানি এবং জমির ব্যবহার কম হওয়ায় এটি পরিবেশবান্ধব ও স্বল্পব্যয়ে কৃষির মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে। হ