সুন্দরবনে বাঘের চেয়েও বনদস্যু আতঙ্কে মৌয়ালরা

Printed Edition

গোলাম রব্বানী কয়রা (খুলনা)

সুন্দরবনের গহিনে বহুল প্রতীতি মধু আহরণ মৌসুম গতকাল ১ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। আগামী দুই মাস বনজীবীরা সুন্দরবনের মানচিত্রজুড়ে মৌচাক থেকে মধু ও মোম সংগ্রহে ব্যস্ত থাকবেন। তবে প্রতি বছর বাঘের আক্রমণের ভয় থাকলেও এবারের মৌসুমে মৌয়ালদের প্রধান দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্ধর্ষ বনদস্যুদের উৎপাত।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের আওতাধীন খুলনার কয়রা, পাইকগাছা ও সাতীরার শ্যামনগর উপজেলার কয়েক হাজার মানুষের প্রধান জীবিকা বনজ সম্পদ আহরণ। প্রতিবছর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। স্থানীয় মৌয়ালদের দাবি, গত জুলাই বিপ্লবে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সুন্দরবনে বনদস্যুদের তৎপরতা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। এতে জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ালদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

কয়রা এলাকার অভিজ্ঞ মৌয়াল মোকছেদ আলী তার শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, অভাবের তাড়নায় ধারদেনা করে সরঞ্জাম গুছিয়ে বনে যাচ্ছি। কিন্তু দস্যুদের হাতে পড়লে সব খুইয়ে আসতে হবে। দস্যুদের হাতে পড়লে জীবন নিয়ে ফিরে আসাও মুসকিল হয়ে পড়ে। এ কারণে বাঘের চেয়ে বনদস্যুদের ভয়ই আমাদের বেশি তাড়া করে ফেরে। আরেক মৌয়াল আমিরুল আপে করে বলেন, বাজারে চাল-ডাল কেনা না হলে এবার হয়তো দস্যু আতঙ্কে বনে যাওয়ার সাহসই পেতাম না।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সুন্দরবন পশ্চিমের খুলনা রেঞ্জে ৭০০ কুইন্টাল মধু ও ২১০ কুইন্টাল মোম এবং সাতীরা রেঞ্জে এক হাজার ১০০ কুইন্টাল মধু ও ৬০০ কুইন্টাল মোম আহরণের ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিগত কয়েক বছরের সরকারি পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, মধু সংগ্রহের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে ওঠানামা করছে। যেমন : ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট মধু সংগ্রহ হয়েছিল চার হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল, ২০২১-২২ অর্থবছরে তিন হাজার ০০৮ কুইন্টাল, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুই হাজার ৮২৫ কুইন্টাল এবং গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তিন হাজার ১৮৩ কুইন্টাল মধু সংগৃহ হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, অবৈধভাবে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ মধু এই সরকারি হিসেবের বাইরেই থেকে যায়।

মৌসুমের শুরুতে খলিশা ফুলের মধু পাওয়া যায়, যা স্বাদে ও গুণে অনন্য। এ কারণে এই মধুর বাজারমূল্য সবচেয়ে বেশি। এরপর পর্যায়ক্রমে গরান, কেওড়া ও ছইলা ফুলের মধু সংগৃহীত হয়। তবে চলতি বছর সুন্দরবন অঞ্চলে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মধুর গুণগত মান ও পরিমাণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

কয়রা কেয়ার ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক মোহসিন আলম বলেন, উপকূলীয় মানুষ বাঘ, কুমির আর সাপের সাথে লড়াই করেই বেঁচে থাকে। কিন্তু বর্তমানের বনদস্যুদের যে উপদ্রব শুরু হয়েছে, তা দমনে দ্রুত প্রশাসনিক পদপে উচিত। তা না নিলে মৌয়াল ও জেলেদের পেশা চিরতরে হারিয়ে যাবে।

নিরাপত্তার বিষয়ে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেড এম হাসানুর রহমান জানান, মৌয়ালরা যেন নির্বিঘেœ মধু সংগ্রহ করতে পারেন, সেজন্য বন বিভাগের টহল কার্যক্রম আগের চেয়ে জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া বন্যপ্রাণীর আক্রমণ থেকে রা পেতে মৌয়ালদের সতর্কভাবে চলাফেরার পরামর্শ ও কৌশল জানিয়ে দেয়া হয়েছে।