সালার জং মিউজিয়াম সভ্যতার অনন্য নিদর্শন : সীমান্ত আকরাম
Printed Edition
সালার জং মিউজিয়াম ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের হায়দ্রাবাদ শহরের মুসি নদীর দক্ষিণ তীরে দার-উল-শিফাতে অবস্থিত একটি শিল্পকলা জাদুঘর। এটি ভারতের উল্লেখযোগ্য জাতীয় জাদুঘরগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং বিশ্বে অনন্য মিউজিয়ামগুলোর মধ্যে একটি। সভ্যতার অনন্য নিদর্শন ও ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী এই জাদুঘর ভারতীয় তিনটি জাতীয় জাদুঘরের একটি। ১০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত মূল ভবন, পশ্চিম ও পূর্ব তিনটি ব্লকে ৩৮টি গ্যালারিতে ৩৫ হাজারের বেশি জিনিসপত্র আর ৫০ হাজারেরও বেশি বইপত্র এই মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে।
জাদুঘর সালার জং পরিবারের ব্যক্তিগত শিল্প সংগ্রহ ছিল, যা সালার জং তৃতীয়ের মৃত্যুর পর জাতিকে দান করা হয়। সালার জং পরিবারটি দাক্ষিণাত্যের ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত পরিবার ছিল। তাদের মধ্যে পাঁচজন হায়দ্রাবাদ-ডেকানের পূর্বতন নিজাম শাসনামলে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। নবাব মীর ইউসুফ আলী খান (১৮৮৯-১৯৪৯), যিনি সালার জং তৃতীয় নামে পরিচিত। তিনি ১৯১২ সালে নবাব মীর ওসমান আলী খান সপ্তম নিজাম কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯১৪ সালের নভেম্বরে দেওয়ান বা প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করেন এবং শিল্প ও সাহিত্যের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার জন্য তার জীবন উৎসর্গ করেন। শিল্পের প্রতি তার প্রগাঢ় ভালোবাসার খবর দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং তার পৈতৃক প্রাসাদ, দেওয়ান দেওদি চিরকাল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্য বিক্রেতাদের ভিড়ে ভিড় করে। বিদেশেও তার এজেন্ট ছিল যারা তাকে সুপরিচিত প্রাচীন জিনিসপত্রের বিক্রেতাদের কাছ থেকে ক্যাটালগ এবং তালিকা পাঠাত। তিনি কেবল এই উৎসগুলোতেই তার কেনাকাটা সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তার বিদেশ ভ্রমণের সময় ব্যক্তিগতভাবেও কেনাকাটা করেছিলেন। তিনি আয়ের একটি বড় অংশ, প্রায় ৩৫ বছর ধরে, বিশ্বজুড়ে শিল্পকর্ম সংগ্রহে ব্যয় করেছিলেন। ১৯৪৯ সালে ২ মার্চ নবাবের মৃত্যুর পর, সংগ্রহগুলো তার পৈতৃক প্রাসাদ দেওয়ান দেবদিতে রয়ে যায়। এই সংগ্রহটি পূর্বে সালার জং জাদুঘর নামে একটি বেসরকারি জাদুঘর হিসেবে সেখানে প্রদর্শিত হতো।
মীর ইউসুফ আলী খান যখন ১০ বছর বয়সে ছিলেন, তখন নিজাম তাকে ‘সালার জং’ পারিবারিক উপাধি দেন এবং তার ‘মনসব’ এবং অন্য খেতাব লাভ করেন। তিনি সে সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের অধিকারী হন এবং ধীরে ধীরে এই অসাধারণ সংগ্রহটিকে একটি শিল্প ভাণ্ডারে পরিণত করেন। তিনি বিপুল সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠেন যখন তিনি ১৪৮০ বর্গমাইল জমিজুড়ে বিস্তৃত ৪৫০টি গ্রামের বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন, যার বার্ষিক আয় ছিল ২৩ লাখ টাকা, যা সেই সময়ে একটি উল্লেখযোগ্য আয় ছিল। তিনি একজন নন্দনতত্ত্ববিদ ছিলেন। তার পরিশীলিত রুচির জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন এবং ভারত, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং সুদূর প্রাচ্যের দেশগুলোর শিল্পকলায় তার আগ্রহ ছিল। ছোটবেলা থেকেই শিল্পকলার প্রতি তার ব্যাপক ঝোঁক ছিল।
নবাব মীর ইউসুফ আলী খান কেবল প্রাচীন জিনিসপত্র, শিল্প এবং বিরল পাণ্ডুুলিপির একজন মহান সংগ্রাহক ছিলেন না, তিনি কবি, লেখক এবং শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতাও করেছিলেন। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক নানান কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করেছিলেন। তিনি তার নিজের পরিবারের সদস্যদের ওপর অনেক বই প্রকাশে ভূমিকা রেখেছেন। তার মৃত্যুর পর পুরো সংগ্রহশালাটি কোনো উত্তরাধিকারী ছাড়াই রয়ে গিয়েছিল।
জাদুঘর আকারে সংগ্রহশালাটি ১৯৫১ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রয়াত সালার জঙ্গের বাড়ি দেওয়ান দেওডিতে উন্মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল এবং ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন। পরবর্তীতে ভারত সরকার পরিবারের সদস্যদের সম্মতিতে একটি আপসপত্রের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জাদুঘরটির দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং জাদুঘরটি ভারত সরকারের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সাংস্কৃতিকবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত হয়। অবশেষে, ১৯৬১ সালে একটি ‘সংসদের আইন’-এর মাধ্যমে সালার জং জাদুঘর এবং গ্রন্থাগারকে ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৬৮ সালে জাদুঘরটি বর্তমান ভবনে স্থানান্তরিত হয়। তখন এর উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন ভারতের রাষ্ট্রপতি ড. জাকির হোসেন। দেওয়ান দেবদি থেকে বর্তমান স্থানে জাদুঘরটি স্থানান্তরের সময় কিছু শিল্পকর্ম হারিয়ে যায় বা চুরি হয়ে যায়। ২০০৩ সালে, জাদুঘরটি ন্যাশনাল মিশন ফর ম্যানুস্ক্রিপ্টসের সাথে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে এবং এটিকে একটি পাণ্ডুুুলিপি সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জাদুঘর প্রশাসন একটি স্বায়ত্তশাসিত বোর্ডের কাছে স্থানান্তরিত হয়, যার চেয়ারম্যান ছিলেন অন্ধ্র প্রদেশের রাজ্যপাল। রাজ্য বিভক্তির পর তেলেঙ্গানার রাজ্যপাল চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এই জাদুঘরে রয়েছে সালার জংদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র ছাড়াও ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতার নিদর্শন। এই জাদুঘরে জাপান, চীন, মিয়ানমার, নেপাল, ভারত, পারস্য, মিসর, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, খোদাই কাজ, বস্ত্র, পাণ্ডুুলিপি, মৃৎশিল্প, ধাতব শিল্পকর্ম, কার্পেট, ঘড়ি এবং আসবাবপত্রের সংগ্রহ রয়েছে। ইউরোপিয়ান বহু দেশের আর্ট সামগ্রী ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, চীন, মিসর ইত্যাদি সব দেশের বহু দুর্লভ নিদর্শন রয়েছে। মিউজিয়ামে আছে টিপু সুলতানের পাগড়ি ও সিংহাসন, আওরঙ্গজেবের তলোয়ার, পান্না দিয়ে তৈরি জাহাঙ্গীরের পানপাত্র ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে পছন্দ হলো ইতালিয়ান ভাস্কর গিওভানি মারিয়া বেনজোনির তৈরি বিখ্যাত ভাস্কর্য ‘ভেইল্ড রেবেকা’। শিল্পী বাইবেলের চরিত্র রেবেকাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ধবধবে সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি এক নারীমূর্তি। অত্যন্ত নিখুঁত আর অপূর্ব সুন্দর ভাস্কর্য। কোনো ভাস্কর্য যে এত নিখুঁত আর জীবন্ত হতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এ যেন পাথরের বুকে একটি কবিতা, যা দর্শকদের একই সাথে মুগ্ধ ও বিস্মিত করে। শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়। এটি তৈরি করতে শিল্পীর সময় লেগেছে ৩৫ বছর।
সালার জং জাদুঘরের সংগ্রহকে মূলত ভারতীয় শিল্প, মধ্যপ্রাচ্যীয় শিল্প, দূর প্রাচ্যের শিল্প, ইউরোপীয় শিল্প এবং শিশু বিভাগ- এই কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। এ ছাড়া সালার জং পরিবারের প্রতি উৎসর্গীকৃত একটি প্রতিষ্ঠাতা গ্যালারি তৈরি করা হয়েছে। এ জাদুঘরে নতুনভাবে সংযুক্ত হয়েছে ইসলামিক আর্ট গ্যালারি। কোনো জাদুঘরের ইসলামী গ্যালারি হিসেবে ভারতে এটি প্রথম এবং বিশ্বে তৃতীয়। এই গ্যালারিতে কুরআন শরিফের বেশ কিছু দুর্লভ ও প্রাচীন পাণ্ডুুুলিপি প্রদর্শিত রয়েছে। এখানে বিভিন্ন দেশ থেকে সংগৃহীত লিপি ও নকশার কুরআনের একটি বিখ্যাত সংগ্রহ রয়েছে, যা ‘স্বর্ণ ও রৌপ্য অক্ষরে লিখিত কুরআন’ নামে পরিচিত। এখানে আরো অনেক ধর্মীয় গ্রন্থের সংগ্রহ, একই সাথে আরবি কুরআনেরও একটি সংগ্রহ রয়েছে।
সভ্যতার অনন্য নিদর্শন সালার জং মিউজিয়াম ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ধারক-বাহক হিসেবে যুগ যুগ ধরে আজও হায়দ্রাবাদ শহরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।