তৃতীয় পক্ষ বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক প্রভাবিত করতে পারবে না : চীনের রাষ্ট্রদূত
ভারত-পাকিস্তান-সৌদি রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ
Printed Edition
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
‘বাইরের কোনো চাপ বা তৃতীয় কোনো পক্ষ চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারবে না’ মন্তব্য করে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিয়ে ঢাকা ও বেইজিং দীর্ঘ দিন ধরে আলোচনা করছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই উদ্যোগের কাজ শিগগির শুরু হবে বলে আমি আশা করছি।
গতকাল রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
প্রসঙ্গত, চীনের আর্থিক ও সামরিক সহায়তা থেকে দূরে থাকতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশ সরকারকে অব্যাহতভাবে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, এ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। অংশীদার দেশগুলোর সামরিক বাহিনীর চাহিদা মেটানোর উপায় আমাদের আছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই চাহিদা মেটাতে না পারলে আমাদের মিত্র দেশগুলো এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। অন্য দিকে ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিতি স্পর্শকাতর স্থানের কাছে অবস্থান হওয়ায় তিস্তা প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে।
সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ইয়াও ওয়েন বলেন, চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমর্থন জানাচ্ছে। একই সাথে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করেছে।
নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে প্রথম বৈঠক সম্পর্কে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, বৈঠকটি আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। উভয় পক্ষ চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও রোহিঙ্গা সঙ্কটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গভীর ও বাস্তবসম্মত আলোচনা করেছে।
জনকেন্দ্রিক সহযোগিতা জোরদার করতে চায় ভারত : ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বলেছেন, আমরা বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে যোগাযোগের জন্য উন্মুখ। আমরা সব ক্ষেত্রে আমাদের জনকেন্দ্রিক সহযোগিতা জোরদার করতে চাই। পারস্পরিক স্বার্থ এবং পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং দূরদর্শী পদ্ধতিতে আমরা একসাথে কাজ করতে চাই।
গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান। হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার গঠনের পর এটি ছিল নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশের সাথে ভারতের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ সম্পর্কে আপনারা অবগত আছেন। নির্বাচনের পরপরই ১৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছিলেন। তারা সে দিন পরে টেলিফোনেও কথা বলেছিলেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আমাদের লোকসভার স্পিকার ভারত সরকারের প্রতিনিধিত্ব করতে ঢাকা এসেছিলেন। তিনি নতুন প্রধানমন্ত্রীর সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করেছেন। এ সময় আমাদের স্পিকার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি চিঠি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে হস্তান্তর করেন।
প্রণয় ভার্মা বলেন, এসব যোগাযোগের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের সাথে আমাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক গড়ে তোলার এবং আমাদের বহুমুখী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে শক্তিশালী করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছি। একই সাথে আমরা একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছি।
বিস্তৃত সম্পর্কের দিকে যেতে চায় সৌদি আরব : সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়া নির্বাচিত সরকারের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে বলেছেন, দু’দেশের বর্তমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি বিস্তৃত সম্পর্কের দিকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকারের সাথে কাজ করতে আমরা আগ্রহী।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালে সৌদি আরব বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য সাত লাখ ৫০ হাজার ওয়ার্ক ভিসা এবং সব মিলিয়ে ১৪ লাখ ভিসা ইস্যু করেছে। সৌদি আরবে অনেক উন্নয়ন কাজ চলছে। এতে দক্ষ ও আধা দক্ষ কর্মীদের কাজের সুযোগ রয়েছে।
গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে সৌদি রাষ্ট্রদূত এসব কথা জানান। সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রদূত তার সরকারের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানান এবং সৌদি আরব-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদার করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
রাষ্ট্রদূতকে স্বাগত জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদি আরবকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত ও দীর্ঘ দিনের অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে ১৯৭৬ সালে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়া ১৯৭৭ সালে সৌদি আরবে একটি ঐতিহাসিক সফরও করেছিলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপশি সৌদি রাষ্ট্রদূতও মুসলিম ঐক্য প্রচারে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্বীকার করেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনুরোধে ১৯৭৯ সালে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে সৌদি আরবের সহায়তার কথা স্মরণ করেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাদের জন্য সৌদি আরবের অব্যাহত মানবিক সহায়তার প্রশংসা করেন এবং মিয়ানমারে টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য রাষ্ট্রদূতের সমর্থন কামনা করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্য এবং মুসলিম উম্মাহজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সৌদি নেতৃত্বের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কর্মীকে কাজের সুযোগ দেয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং উভয় দেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি এবং অন্যান্য অগ্রাধিকার খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সৌদি রাষ্ট্রদূত এর আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে শুভেচ্ছা জানান। প্রতিমন্ত্রী সৌদি ভিশন-২০৩০-এর অধীনে ক্রাউন প্রিন্সের নেতৃত্বাধীন সংস্কার উদ্যোগের প্রশংসা করেন। উভয়েই পারস্পরিক স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
সহযোগিতা জোরদার করতে আগ্রহী পাকিস্তান : পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরো জোরদার ও বিস্তৃত করার জন্য বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানে সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন। খলিলুর রহমান উভয় দেশের জনগণের কল্যাণের জন্য সহযোগিতার নতুন পথ অন্বেষণে সরকারের অভিপ্রায়ের কথা জানান। তিনি দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের সব দেশের জনগণের কল্যাণের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের ওপর জোর দেন।