সাহসী কণ্ঠস্বর উসমান খাজার অবসর
Printed Edition
ক্রীড়া ডেস্ক
অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ওপেনার উসমান খাজা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। চলতি অ্যাশেজ সিরিজের শেষ টেস্ট খেলার পরই ৩৯ বছর বয়সী এই বাঁ হাতি ব্যাটসম্যান টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানাবেন। আগামীকাল সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে শুরু হতে যাওয়া টেস্টটিই হতে যাচ্ছে তার ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
এসসিজিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আবেগঘন কণ্ঠে অবসরের ঘোষণা দেন খাজা। তিনি বলেন, ‘আমি এসসিজির খুব কাছেই বড় হয়েছি। ছোটবেলায় এই মাঠে এসে মাইকেল সø্যাটারকে ফেরারি চালাতে দেখতাম। তখন কখনো ভাবিনি এক দিন আমি নিজেই এখানে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট খেলব এবং এখানেই অবসরের ঘোষণা দেবো।’
২০১১ সালে টেস্ট অভিষেক হওয়া খাজা ১৫ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে খেলেছেন ৮৭টি টেস্ট। করেছেন ১৬টি সেঞ্চুরিতে ছয় হাজার ২০৬ রান। ৪০ ওয়ানডে ও ৯টি-২০ মিলিয়ে তার আন্তর্জাতিক রান এক হাজার ৭৯৫। সব ঠিক থাকলে ৮৮তম টেস্ট খেলে ক্রিকেটকে বিদায় জানাবেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এই অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যান।
খাজা শুধু ক্রিকেটার হিসেবেই নন, মানুষ হিসেবেও ছিলেন ব্যতিক্রমী। মাঠে ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও পরিমিত স্ট্রোক খেলার জন্য পরিচিত হলেও মাঠের বাইরে তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী ও সাহসী। বর্ণবাদ, বৈষম্য, যুদ্ধ ও মানবাধিকার ইস্যুতে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে কখনো দ্বিধা করেননি।
বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধাচারণ
অবসর ঘোষণার দিনও খাজা খোলামেলা কথা বলেছেন তার জীবনের কঠিন অধ্যায়গুলো নিয়ে। তিনি জানান, ছোটবেলায় পাকিস্তান থেকে আসা মুসলিম হওয়ায় তাকে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি আদৌ ‘যথেষ্ট অস্ট্রেলিয়ান’ কি না। খাজা বলেন, ‘আমার নাম জন স্মিথ নয়। তাই যখন ৫০-৫০ সিদ্ধান্ত আসে, বেশির ভাগ সময় সেটি আমার বিপক্ষে যায়।’
খাজা জানান, অস্ট্রেলিয়া দলে মানিয়ে নিতে তিনি সব চেষ্টা করেছেন। পোশাক, জীবনযাপন এমনকি সামাজিক মেলামেশাতেও। কিন্তু তবুও তাকে বারবার দল থেকে বাদ পড়তে হয়েছে। টেস্ট ক্যারিয়ারে মোট আটবার দল থেকে বাদ পড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে তার।
গাজা ও ফিলিস্তিন ইস্যু
বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তার অবস্থান সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে চলতি বছর গাজা সঙ্কটকে কেন্দ্র করে। ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে খাজা মাঠে কালো আর্মব্যান্ড পরে খেলতে চেয়েছিলেন এবং জুতায় শান্তির প্রতীক পায়রা সংবলিত স্টিকার ব্যবহার করেছিলেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গাজার সাধারণ মানুষের পক্ষে বারবার অবস্থান নেন।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) খাজার এই উদ্যোগে আপত্তি তোলে। আইসিসির আচরণবিধি অনুযায়ী মাঠে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বার্তা প্রদর্শন নিষিদ্ধ। সেই নিয়মের আওতায় খাজাকে কালো আর্মব্যান্ড ও প্রতীক ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। আইসিসির নির্দেশ না মানলে শাস্তির হুমকিও দেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত নিয়ম মেনে নিতে বাধ্য হলেও খাজা স্পষ্ট করে বলেন, ‘মানবতা কোনো রাজনীতি নয়।’
এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়। অনেক সাবেক ক্রিকেটার ও মানবাধিকার সংগঠন খাজার পাশে দাঁড়ান। খাজা বলেন, ‘আমি কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে নই। আমি নিরীহ মানুষের পক্ষে। শিশুদের মৃত্যুর বিরুদ্ধে কথা বলা যদি অপরাধ হয়, তাহলে আমি সেই অপরাধ করতেই প্রস্তুত।’
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ডও খাজার অবদানের প্রশংসা করেছে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী টড গ্রিনবার্গ বলেন, ‘উসমান খাজা শুধু একজন সফল ক্রিকেটার নন, তিনি এই খেলাটিকে আরো মানবিক করে তুলেছেন।’
লাইসেন্সপ্রাপ্ত পাইলট
ক্রিকেটের বাইরে খাজার আরেকটি পরিচয়ও আছে। তিনি একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত পাইলট। ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের স্কুল অব অ্যাভিয়েশন থেকে বিমান চালনার প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি। ২০১৯ সালে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া তার পাইলট পরীক্ষার ভিডিও প্রকাশ করেছিল।
সব মিলিয়ে উসমান খাজা ছিলেন একাধারে সফল ক্রিকেটার, সচেতন নাগরিক এবং মানবিক কণ্ঠস্বর। ক্রিকেট মাঠ ছাড়লেও বর্ণবাদ, বৈষম্য ও মানবাধিকারের প্রশ্নে তার কণ্ঠ যে থেমে যাবে না, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন এই বিদায়ী অসি ওপেনার।