গাজায় যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইলি হামলায় ৩৫৬ ফিলিস্তিনি নিহত

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • জনবল সঙ্কটের মুখে ইসরাইলের সেনাবাহিনী
  • পশ্চিমতীরে ৪ বিদেশীর ওপর ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা
  • গাজায় চার ইসরাইলি গুপ্তচর নিহত
  • টানেলে ৪০ ফিলিস্তিনি যোদ্ধাকে হত্যার দাবি ইসরাইলের

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে চলমান ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৩৫৬ জন নিহত হয়েছেন। গতকাল আলজাজিরা জানিয়েছে, গত রোববার থেকে সোমবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দখলদার বাহিনীর হামলায় অন্তত তিনজন নিহত এবং দু’জন আহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ আপডেটে বলা হয়েছে, ‘অনেক ভুক্তভোগী ধ্বংসস্তূপের নিচে এবং রাস্তায় পড়ে আছেন। অ্যাম্বুলেন্স ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা দল এখনো তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না।’

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১১ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ৩৫৬ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি আরো ৯০৮ জন আহত হওয়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। পূর্ববর্তী হামলায় নিহত আরো ৬০৭ জনের লাশও উদ্ধার করা হয়েছে। গাজা অঞ্চলজুড়ে ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে এক লাখ ৭২ হাজারের বেশি বেশি মানুষ আহত হয়েছে। অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন।

চলতি বছরের শুরুতেও একটি যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করে ইসরাইল গত ২৭ মে থেকে গাজায় পৃথক সাহায্য বিতরণ উদ্যোগ শুরু করে। এই পদক্ষেপের পর অঞ্চলটিতে দুর্ভিক্ষ প্রকট হয়ে উঠেছিল। ইসরাইলি বাহিনী খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের কাছে জড়ো হওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপরও গুলি চালিয়ে যায়। এর ফলে শত শত মানুষ নিহত হয়। সেই সাথে দুর্ভিক্ষে শিশুসহ বহু মানুষের মৃত্যু হয়। গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য নেতানিয়াহু ও তার প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। তা ছাড়া উপত্যকাজুড়ে যুদ্ধের জন্য ইসরাইল আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলার মুখোমুখি।

জনবল সঙ্কটের মুখে ইসরাইলের সেনাবাহিনী

অফিসারদের ধরে রাখার ক্ষেত্রে গভীর সঙ্কটের মুখোমুখি ইসরাইল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ জরিপে দেখা গেছে, লেফটেন্যান্ট ও ক্যাপ্টেন পদে প্রায় এক হাজার ৩০০ অফিসার এবং আরো ৩০০ মেজরের ঘাটতি রয়েছে। চ্যানেল ১২-এর খবরে বলা হয়েছে, অফিসারদের মধ্যে মাত্র ৬৩ শতাংশ সেনাবাহিনীতে থাকতে আগ্রহী, যেখানে ২০১৮ সালে এটি ছিল ৮৩ শতাংশ। নন-কমিশনড অফিসারদের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৩৭ শতাংশ এই কাজে থাকতে চান, যা ২০১৮ সালে ৫৮ শতাংশ ছিল। আইডিএফ বহু বছর ধরে ক্যারিয়ার সৈনিকদের ধরে রাখার লড়াই চালাচ্ছে, কারণ বেসামরিক চাকরি অনেক বেশি লাভজনক এবং চাপ কম। এ ছাড়া যুদ্ধ ক্লান্তি, রাজনৈতিক অবস্থা ও সামরিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের কারণে এই সমস্যা আরো তীব্র হয়েছে।

এই মাসে কর্মী অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রায় ৬০০ ক্যারিয়ার সৈনিক আগাম অবসর নিতে চাইছেন। ফলে জুনিয়র অফিসারদের পদোন্নতি দিয়ে শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। কর্মী অধিদফতরের চিফ অফ স্টাফ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির ভাদমানি বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনের অনুপাত হ্রাস পাচ্ছে। ২০২৮ সালের মধ্যে ৫০০ প্রার্থীর মধ্যে ৪০০ লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিয়োগ করতে হবে। সর্বস্তরে বার্নআউট বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ আইডিএফের চিফ অফ স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জমির এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা সঙ্কট মোকাবেলা ও আইন প্রণয়নের প্রভাব নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করছেন। একই সময়ে, অতি-অর্থোডক্সদের খসড়া ছাড় নিয়ন্ত্রণকারী নতুন বিলের কারণে সমালোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। ১৮-২৪ বছর বয়সী প্রায় ৮০ হাজার অতি-অর্থোডক্স পুরুষ সামরিক পরিষেবার জন্য যোগ্য;কিন্তু তালিকাভুক্ত হননি। আইডিএফ জানিয়েছে, গাজা ও অন্যান্য সামরিক চাপের কারণে জরুরিভাবে ১২ হাজার নতুন নিয়োগের প্রয়োজন।

পশ্চিমতীরে ৪ বিদেশীর ওপর ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা

ইসরাইল অধিকৃত পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীদের আক্রমণে তিনজন ইতালীয় এবং একজন কানাডিয়ান আহত হয়েছেন। তাদের জেরিকোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বলে এএফপির খবরে জানানো হয়েছে। ফিলিস্তিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা তাদের ‘আন্তর্জাতিক অ্যাক্টিভিস্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। রোমের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘গত রাতে তিনজন ইতালীয় আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবকের ওপর ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা আক্রমণ করেছে এবং এ ঘটনার পর এখনো তারা হতবাক।’

জেরিকো সরকারি হাসপাতালের পরিচালক রিয়াদ ঈদ এএফপিকে বলেছেন, ‘বসতি স্থাপনকারীদের হাতে মারধরের শিকার হওয়ার পর চারজন বিদেশী হাসপাতালে আসেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘তাদের মধ্যে কয়েকজনের মুখে এবং বুকে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং তাদের মধ্যে একজনকে একটি সংবেদনশীল এলাকায় মারধর করা হয়েছিল। তাদের শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। এক্স-রে ও আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেয়া হয়।’ চারজনের মধ্যে একজনের শরীরে দৃশ্যমান আঘাত ছিল এবং তিনি পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। তিনি এএফপিকে বলেছেন, তারা তিনজন ইতালির এবং একজন কানাডার, যারা পশ্চিমতীরের মধ্য জেরিকোর পশ্চিম প্রান্তে ডুয়ুক এলাকায় অবস্থান করছিলেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা রাতে ঘুমাচ্ছিলাম... ১০ জন মুখোশধারী বসতি স্থাপনকারী এসেছিল। তাদের মধ্যে দু’জনের হাতে বন্দুক ছিল। আবার কারো কারো হাতে লাঠি ছিল। তারা আমার মুখে, পাঁজরে, কোমরে একাধিকবার লাথি মারে।’ তিনি জানান, প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট স্থায়ী পর্যন্ত মারধর চলে। তারপর তারা আমাদের সব জিনিসপত্র নিয়ে যায়। এর মধ্যে ছিল, পাসপোর্ট, ফোন, মানিব্যাগ, ব্যাংক কার্ড। মারধরের কারণে এক্স-রে, ব্যথানাশক ওষুধ নিতে হয়েছিল।’ ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের বিবৃতিতে আরো বলেছে, ‘বসতি স্থাপনকারীরা তাদের বাড়িতে প্রবেশ করেছে, স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর আক্রমণ করেছে এবং তাদের সব ব্যক্তিগত জিনিসপত্র চুরি করেছে বলে জানা গেছে।’ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি ‘ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করছেন’, জেরুসালেমে ইতালির কনসাল জেনারেলের সাথে যোগাযোগ রাখছেন। ১৯৬৭ সাল থেকে দখলকৃত পশ্চিমতীরের বসতিগুলোতে বর্তমানে পাঁচ লাখের বেশি ইসরাইলি বাস করে, এ ছাড়া প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির বসবাস সেখানে।

চার ইসরাইলি গুপ্তচর নিহত

উত্তর গাজায় ইসরাইলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করার সময় চারজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী সংগঠন হামাস। গতকাল সোমবার জানিয়েছে গ্রুপটির সামরিক শাখা কাসসাম ব্রিগেডস। অফিসিয়াল টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘শত্রু ইসরাইলের হয়ে কাজ করা এবং হামাসের একজন সদস্যকে অপহরণের চেষ্টা করা চারজন গুপ্তচরকে গাজায় হত্যা করা হয়েছে।’ হামাস আরো জানায়, তাদের অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। তবে তাদের পরিচয় বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তুর্কিভিত্তিক টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে, এই খবরের বিষয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

টানেলে ৪০ ফিলিস্তিনি যোদ্ধাকে হত্যার দাবি ইসরাইলের

গাজা উপত্যকার রাফাহ শহরের কাছে একটি টানেলকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে গত সপ্তাহে ৪০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি যোদ্ধাকে হত্যা করার দাবি করেছে ইসরাইল। রোববার এক বিবৃতিতে এ কথা জানিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। গত শনিবার ইসরাইলি সেনাবাহিনী ঘোষণা করেছে যে তারা গত রাতে ভূগর্ভস্থ এলাকা থেকে বেরিয়ে আসা চার যোদ্ধাকে হত্যা করেছে।

হামাসের কয়েক ডজন যোদ্ধা দক্ষিণ গাজার টানেলগুলোতে, ইসরাইলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকার নিচে লুকিয়ে আছে দাবি করা হচ্ছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী, গত ৪০ দিন ধরে, সেনাবাহিনী পূর্ব রাফাহর চারপাশে তাদের প্রচেষ্টাকে কেন্দ্রীভূত করছে। এই এলাকায় থাকা ভূগর্ভস্থ টানেল রুটগুলো ভেঙে ফেলা ও তাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা যোদ্ধাদের নির্মূল করার লক্ষ্যেই এ অভিযান চালানো হয়েছে বলে সেনাবাহিনী তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে। তারা আরো জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ‘৪০ জনেরও বেশি যোদ্ধাকে নির্মূল করা হয়েছে।’ বিবৃতিতে আরো বলা হয়, এ ছাড়াও এলাকায় মাটির উপরে ও নিচে কয়েক ডজন টানেল শ্যাফট ও যোদ্ধা অবকাঠামো সাইট ভেঙে ফেলা হয়েছে।’ বৃহস্পতিবার একাধিক সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, দক্ষিণ গাজার টানেল নেটওয়ার্কে এখনো যেসব হামাস যোদ্ধা রয়েছ, তাদের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে- তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

বুধবার, হামাস মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোকে ইসরাইলকে নিরাপদ পথের অনুমতি দেয়ার জন্য চাপ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। প্রথমবারের মতো তারা প্রকাশ্যে এই পরিস্থিতির কথা স্বীকার করেছে। মিসর, তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ১০ অক্টোবর কার্যকর হয়।