সপ্তাহের ব্যবধানে ফের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঝোঁক বিনিয়োগকারীদের
ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ এসিআইর
Printed Edition
ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে গতকাল উঠে আসে আগের সপ্তাহে ব্যাপকভাবে দর হারানো কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগ.
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পরিবর্তন ঘটেছে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ভাবনায়। এক সপ্তাহ আগে তালিকাভুক্ত ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের যেসব কোম্পানি ক্রেতা খুঁজে পায়নি গত সপ্তাহে এদের অনেকগুলোর শেয়ারের বিক্রেতা ছিল না। আর এর ফলে সপ্তাহশেষে এ খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি উঠে আসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানির তালিকায়। এক প্রকার নেতিবাচক আচরণের মধ্য দিয়ে পার করা সপ্তাহটিতে বেশ কিছু ভালো কোম্পানি বাজারটিতে লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় জায়গা করে নিতে দেখা যায়, যা বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টরা বাজার আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন হিসাবে দেখছেন।
বিদায়ী সপ্তাহটি (১১-১৫ জানুয়ারি) নেতিবাচক প্রবণতার মধ্য দিয়ে পার করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এ সময় পুঁজিবাজারটির সবগুলো সূচকেরই কমবেশি অবনতি ঘটে। প্রধান সূচক ডিএসইএক্স এ সময় ৩৯ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট হারায়। রোববার ৪ হাজার ৯৯৮ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে নেমে আসে চার হাজার ৯৫৮ দশমিক ৯৯ পয়েন্টে। মোট ৫টি কর্মদিবসের মধ্যে তিনটিতে সূচকের নামমাত্র উন্নতি ঘটলে অন্য দুই দিন বড় ধরনের সূচক হারায় বাজারটি। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শলিয়াহ হারায় যথাক্রমে ২ দশমিক ২২ ও ১৪ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট।
মন্দাভাবের কারণে গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনেরও বড় ধরনের অবনতি ঘটে। এ সময় বাজারটি এক হাজার ৯০০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ১৯ দশমিক ৯০ শতাংশ কম। আগের সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেন ছিল ২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। একই হারে হ্রাস পেয়েছে বাজারটির গড় লেনদেনও। আগের ৪৭৪ কোটি টাকার স্থলে গত সপ্তাহের বাজরটির সপ্তাহিক গড় লেনদেন দাঁড়ায় ৩৮০ কোটি টাকা।
সূচক ও লেনদেনের অবনতি সত্ত্বেও গত সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধনে কিছুটা উন্নতি ঘটেছে। গত সপ্তাহশেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়ায় ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা এক হাজার ২৬০ কোটি তথা দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে ডিএসইর বাজর মূলধন ছিল ৬ লাখ ৮৩ হাজার ১৮০ কোটি টাকা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে বিনিয়োগকারীরা এক ধরনের সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। তাই বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই বাজার পর্যবেক্ষণে আছেন। কোন পর্যায়ে বাজারে অবস্থান নিতে হবে তা নির্ধারণেই তারা সময় ব্যয় করছেন। সূচক ও লেনদেনের অবনতির পেছনে তাদের এ সিদ্ধান্তহীনতাই কাজ করছে। তাদের প্রত্যাশা, নির্বাচনের পর নতুন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে পুঁজিবাজার নতুন করে গতি ফিরে পাবে।
এ দিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি অ্যাডভান্স কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (এসিআই) পিএলসি তার ব্যবসা আরো বহুমুখীকরণ ও সম্প্রসারণ করতে যাচ্ছে। এবার নতুন করে আবাসন ও সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোম্পানিটি। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের এক সভায় বিষয়টি অনুমোদন করা হয়েছে। কোম্পানি সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
সূত্র অনুসারে, কোম্পানিটির পর্ষদ সভায় নতুন উল্লিখিত দুই ব্যবসা শুরু করতে এসিআই প্রপার্টিজ লিমিটেড ও এসিআই সেমিকন্ডাক্টর লিমিটেড নামের দুটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এসিআইয়ের পরিচালনা পর্ষদ। এদের মধ্যে এসিআই প্রপার্টিজ লিমিটেডের অনুমোদিত মূলধন হবে ১০০ কোটি টাকা ও পরিশোধিত মূলধন ১০ কোটি টাকা। এসিআই পিএলসি নতুন এই প্রতিষ্ঠানের ৮৫ শতাংশ শেয়ার ধারণ করবে। এসিআই সেমিকন্ডাক্টর লিমিটেডেরও অনুমোদিত মূলধন ১০০ কোটি টাকা ও পরিশোধিত মূলধন ১০ কোটি টাকা হবে। এটিরও ৮৫ শতাংশ শেয়ার এসিআইয়ের কাছে থাকবে।
দেশে হাউজহোল্ড প্রোডাক্টসের চাহিদা বাড়তে থাকায় এই খাতে নতুন নতুন কোম্পানি ও কারখানা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আর এসব পণ্যের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে সেমিকন্ডাক্টরের। এই বিপুল চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সেমিকন্ডাক্টরের ব্যবসা শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এসিআই। সেমিকন্ডাক্টরের আন্তর্জাতিক বাজারের আকারও অনেক বড়। বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টরের বৈশ্বিক বাজার প্রায় ৭৭২ বিলিয়ন ডলারের।
গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে ছিল ফাইন ফুডস লিমিটেড। এ সময় প্রতিদিন গড়ে ১৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার শেয়ার বেচাকেনা হয় কোম্পানিটির যা ওই সময়ে ডিএসইর মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। প্রতিদিন গড়ে ১২ কোটি ৯৯ লাখ টাাকর শেয়ার হাতবদল হওয়া ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস উঠে আসে এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে। সপ্তাহিক মোট লেনদেনে কোম্পানিটির অংশগ্রহণ ছিল ৩ দশমিক ৪২ শতাংশ। এ ছাড়া ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ওরিয়ন ইনফিউশন, সিটি ব্যাংক, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, লাভেলো আইসক্রিম, এসিআই লিমিটেড, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন।
ড্এিসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে গতকাল উঠে আসে আগের সপ্তাহে ব্যাপকভাবে দর হারানো কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগ। এদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের দুর্বল কোম্পানিগুলো। তাদের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষস্থানে জায়গা করে নেয় পিপল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। আগের সপ্তাহে দশমিক ৪২ টাকায় থাকা কোম্পানিটির শেয়ারদর গত বৃহস্পতিবার পৌঁছে যায় দশমিক ৫৬ টাকায়। ২০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল একই ফারইস্ট ফিন্যান্স। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বিডি ওয়েল্ডিং ইলেক্ট্রোড, মাইডাস ফিন্যান্স, এপেক্স ট্যানারি, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, এপেক্স স্পিনিং, এফএএস ফিন্যান্স, এম হোসাইন স্পিনিং, ও ফ্যামিলিটেক্স।
বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের বিআইএফসি। কোম্পানিটি এ সময় ২৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ দর হারায়। ২৩ দশমিক ১৬ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল বিচ হ্যাচারিজ। দরপতনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, প্রিমিয়ার লিজিং, অ্যাপোলো ইস্পাত, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স, এএফসি এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ও ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।