২০২৪ সাল ছিল পাকিস্তানেন প্রায় এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বছর। এ বছর সেখানে সন্ত্রাসী হামলায় তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়। এসব হামলার বেশির ভাগই তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (টিটিপি) দায় বলে মনে করা হয়। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আদিবাসী এলাকায় ভিত্তি গড়া এ সশস্ত্র গোষ্ঠীটি আফগান ভূখণ্ডকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে বলে ইসলামাবাদ অভিযোগ করে।

পাকিস্তান ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালালে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে। ইসলামাবাদ দাবি করে, টিটিপির ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। সীমান্তে ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষ, আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি এবং পাকিস্তানের চলমান নিরাপত্তা সঙ্কটের ফলে বছরের শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ক কোন দিকে গড়াবে, তা অনিশ্চিত ছিল।

মুজাহিদিন থেকে তালেবান : পাকিস্তানের আফগান কৌশল

আশির দশকের সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সক্রিয়ভাবে আফগানিস্তানে জড়িত হয়। তারা সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত আফগান মুজাহিদিনদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠে। এই মুজাহিদিন গোষ্ঠীগুলোর মধ্য থেকেই পরবর্তীতে তালেবানের উদ্ভব হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সমর্থনে পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) মুজাহিদিন যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ করে, যা প্রায় এক দশক ধরে চলা সংঘর্ষের পর ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনীর প্রত্যাহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মুজাহিদিন গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়, যা আফগানিস্তানকে প্রায় সাত বছরের গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়, যা ১৯৯৬ সালে শেষ হয়। এই সময়ে, ১৯৯৪ সালে, তালেবান গোষ্ঠী আত্মপ্রকাশ করে। ‘তালেবান’ শব্দটি পশতু ভাষায় ‘ছাত্র’ অর্থে ব্যবহৃত হয়, কারণ তাদের বেশির ভাগ সদস্যই ছিল পশতুন মাদরাসার শিক্ষার্থী।

দুই বছরের মধ্যে তালেবান কাবুল দখল করে এবং আফগানিস্তানে ইসলামিক আমিরাত প্রতিষ্ঠা করে। যদিও পাকিস্তান এই বিষয়ে সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে, বিভিন্ন প্রতিবেদন ইঙ্গিত করে, আইএসআই তালেবানের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল নিজেদের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের জন্য। পাকিস্তান ছিল নব্বইয়ের দশকে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়া মাত্র তিনটি দেশের একটি।

নাইন-ইলেভেনে হামলার পর, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের জোট দেশটিকে বিপুল পরিমাণে আর্থিক সহায়তা এনে দিলেও তালেবানের সাথে তাদের সম্পর্ক গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাকিস্তান যখন মার্কিন নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে লজিস্টিক সহায়তা দিচ্ছিল, তখন তালেবানপন্থী অনেক ইসলামপন্থী গোষ্ঠী আরো চরমপন্থী হয়ে ওঠে, যার ফলে পাকিস্তানে প্রথমবারের মতো বড় আকারে সন্ত্রাসবাদের উত্থান ঘটে।

২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পর, পাকিস্তান তালেবানের সাথে সম্পর্ক উন্নতির আশা করেছিল। তবে বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরো বাড়তে থাকে।

পাক-আফগান দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ

দশকের পর দশক ধরে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্ত, পানিসম্পদ ও শরণার্থী-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিরোধে জড়িয়ে আছে।

ডুরান্ড লাইন

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত, যা ১৮৯৩ সালে নির্ধারিত ডুরান্ড লাইন নামে পরিচিত, দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত ইস্যু হয়ে আছে। পাকিস্তান একে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত হিসেবে দাবি করলেও আফগানিস্তান এটিকে ঔপনিবেশিক শাসনের আরোপিত সিদ্ধান্ত বলে প্রত্যাখ্যান করে এবং যুক্তি দেয়, এটি ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সাথে সাথে বাতিল হয়ে গেছে। নব্বইয়ের দশকের আফগান গৃহযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান তালেবানকে সমর্থন দিয়েছিল এই আশায় যে, তারা ডুরান্ড লাইনকে স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তালেবান একে ‘কাল্পনিক রেখা’ বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এই সীমান্ত পশতু সম্প্রদায়কে বিভক্ত করেছে, যার ফলে তাদের জোরপূর্বক বিচ্ছিন্নতার কারণে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ বিরাজ করছে।

পানি ও শরণার্থী সঙ্কট

সীমান্ত বিরোধ ছাড়াও পানিসম্পদ ও শরণার্থী সমস্যা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন কাবুল নদী পাকিস্তানে প্রবাহিত হয়, যা দুই দেশের প্রায় দুই কোটি মানুষের জন্য পানীয়জল, কৃষিকাজ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে আফগানিস্তানের নির্মিত বাঁধ প্রকল্প, বিশেষ করে শাহতুত বাঁধ, পাকিস্তানে পানির প্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক পানিবণ্টন চুক্তি নেই, যা উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে।

এ দিকে, আফগান শরণার্থী সঙ্কট দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপড়েনের কারণ হয়ে আছে। পাকিস্তান বহু বছর ধরে লাখ লাখ আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, বর্তমানে যার মধ্যে সাড়ে ১৩ লাখ নিবন্ধিত রয়েছে। তবে, ২০২৩ সালের শেষ দিকে ইসলামাবাদ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে অনিবন্ধিত শরণার্থীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন জোরদার করে এবং যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তালেবান এই পদক্ষেপকে তীব্রভাবে বিরোধিতা করে একে ‘অগ্রহণযোগ্য আচরণ’ বলে উল্লেখ করে, যা দুই দেশের মধ্যে আরো উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে।

টিটিপির উত্থান ও পাকিস্তানের নিরাপত্তা সঙ্কট

ঐতিহাসিক বিরোধ দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি করলেও, সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং ক্রমবর্ধমান জঙ্গিবাদ। ২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আফগানিস্তান আগ্রাসনের পর, বহু তালেবান যোদ্ধা পাকিস্তানে পালিয়ে যায় এবং দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। কঠিন ভূপ্রকৃতি ও পশতু উপজাতীয় সংযোগের কারণে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের পক্ষে তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মার্কিন ড্রোন হামলা তালেবান যোদ্ধাদের লক্ষ্যবস্তু করলেও, এতে প্রায়ই বেসামরিক প্রাণহানি ঘটে, যা সাধারণ জনগণের ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে এবং তালেবানের প্রতি সহানুভূতি জাগিয়ে তোলে।

এই অস্থিরতার মধ্যেই একাধিক ইসলামপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠী পাকিস্তানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী হিসেবে দেখে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালে, এসব গোষ্ঠী একত্র হয়ে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) গঠন করে। তারা পাকিস্তানের সরকারকে উৎখাত করে কঠোর শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের লক্ষ্য ঘোষণা করে। গঠনের পর থেকে টিটিপি পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে হাজারও মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি ঘটে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে, যখন টিটিপির অস্ত্রধারীরা পেশোয়ারের একটি স্কুলে হামলা চালিয়ে ১৩০ স্কুলশিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এটি পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

পাকিস্তানের হিসাবে ভুল : তালেবান কৌশল

পাকিস্তান ধারণা করেছিল, তালেবান-শাসিত আফগানিস্তান টিটিপিকে দমন করবে। এই আশায় প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের (২০১৮-২২) সরকার প্রকাশ্যে তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পক্ষে অবস্থান নেয়। তার প্রশাসন বারবার যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান আগ্রাসনকে ‘বিদেশী হস্তক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করে এবং ২০২১ সালের আগস্টে যখন তালেবান কাবুল দখল করে, তখন খান একে ‘দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার’ সাথে তুলনা করেন।

কিন্তু পাকিস্তানের এই প্রত্যাশা দ্রুতই ভুল প্রমাণিত হয়। ইসলামাবাদ অভিযোগ তোলে, তালেবান সরকার আফগানিস্তানে টিটিপিকে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে। তবে কাবুল এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে। পাকিস্তান ২০২২ সালে টিটিপির সাথে আলোচনা শুরু করলেও সেটি ব্যর্থ হয়। এরপর থেকে টিটিপির হামলা নজিরবিহীন মাত্রায় বেড়েছে। শুধু ২০২৪ সালেই তিন হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যাদের মধ্যে দুই হাজার ৫৪৬ জন বেসামরিক নাগরিক।

সামরিক অভিযানের মাধ্যমে টিটিপিকে প্রতিহত করার পাকিস্তানের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামাবাদের দাবি, টিটিপি জঙ্গিরা সহজেই আফগানিস্তানে পালিয়ে যায়। সীমান্তে জঙ্গি কার্যকলাপ ঠেকাতে পাকিস্তান ডুরান্ড লাইনের পাশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নেয়, কিন্তু তালেবান সরকার এই প্রচেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। ২০২৪ সালের ২১ ডিসেম্বর, টিটিপি যোদ্ধারা পাকিস্তানের একটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা চালিয়ে ১৬ জন সেনাকে হত্যা করে। জবাবে, ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তান আফগানিস্তানের পাতাকিয়া জেলায় বিমান হামলা চালায়, যেখানে ৪৬ জন নিহত হয়, যাদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকও ছিল। পাকিস্তান দাবি করেছিল, হামলায় টিটিপির আস্তানাগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। তবে তালেবান সরকার এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে পাল্টা প্রতিশোধ নেয়ার ঘোষণা দেয়। তিন দিন পর, তারা পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করে, যদিও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

টিটিপি, তালেবান ও পাকিস্তান : নড়বড়ে পরিস্থিতি

টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তালেবানের অনীহা একটি জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে তালেবানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ভেঙে যেতে পারে এবং এতে আরো চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রদেশ (আইএসকেপি), আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তালেবানের এই অবস্থান অনেকটা পাকিস্তানের অতীত কৌশলের প্রতিফলন, যেখানে ইসলামাবাদ নিজ ভূখণ্ডে তালেবানের কার্যক্রম দমনে আফগান ও মার্কিন দাবি উপেক্ষা করেছিল।

আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালানোর পেছনে পাকিস্তানের উদ্দেশ্য বহুমুখী। একদিকে এটি টিটিপির কার্যক্রম দমন করার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মহলে শক্তির প্রদর্শন। একই সাথে এটি তালেবান সরকারকে বার্তা দিচ্ছে যে, সীমান্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে পাকিস্তান কঠোর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না। তবে এই সামরিক পদক্ষেপ আফগানদের মধ্যে পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব আরো উসকে দিতে পারে এবং পাকিস্তানি পশতুনদের আরো বিচ্ছিন্ন করে তুলতে পারে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ডিসেম্বর ২০২৪-এ পাকিস্তানের বিমান হামলার পর থেকে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কের নাটকীয় অবনতি ঘটেছে। বিশেষ করে, পাকিস্তান যখন আফগানিস্তানে হামলা চালায়, সে সময় একটি পাকিস্তানি কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল কাবুলে আলোচনা করছিল। তালেবান এই হামলাকে আফগান সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানায়। তারা দাবি করে, কূটনৈতিক সংলাপের আড়ালে সামরিক হামলা চালানো পাকিস্তানের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করে।

২০২৫ সালের প্রথম দিকে সীমান্ত সংঘর্ষ আরো বেড়েছে। সবচেয়ে ব্যস্ততম তোরখাম সীমান্ত পারাপারটি ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ রয়েছে, যা একটি সীমান্ত চৌকি নির্মাণ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ থেকে উদ্ভূত। ৩ মার্চ, আফগান ও পাকিস্তানি সীমান্ত বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি বিনিময় হয়, যার ফলে এক আফগান সেনা নিহত হন। এ দিকে, পাকিস্তান আফগান শরণার্থীদের দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে, যা কূটনৈতিক উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতিও রয়ে গেছে অস্থিতিশীল। টিটিপির হামলা ও পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সংঘর্ষের অবসানের লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

এদিকে তালেবান সরকার পাকিস্তানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। ৮ জানুয়ারি ২০২৫, দুবাইতে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব আফগানিস্তানের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন, যা তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপ। এই বৈঠকে আফগানিস্তান ইরানের চাবাহার বন্দরের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করে, যা স্পষ্টতই পাকিস্তানের বাণিজ্য রুটের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর ইঙ্গিত দেয়। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, আফগানিস্তান কৌশলগতভাবে পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে এবং নীতিগতভাবে আরো স্বাধীনতা অর্জন করতে চায়। ফলে, ভবিষ্যতে আফগানিস্তান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আরো দৃঢ় অবস্থান নিতে পারে।

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ক এখনো নাজুক, যা ঐতিহাসিক বিরোধ, নিরাপত্তা হুমকি এবং পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক মিত্রতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবে তালেবানের বিরুদ্ধে টিটিপিকে সমর্থন দেয়ার অভিযোগ জানিয়ে আসছে। তবে তালেবানের অস্বীকৃতি সঙ্কটের সমাধান আরো সদূরে ঠেলে দিচ্ছে। এরই মধ্যে, ভারতের সাথে কাবুলের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক এই বিরোধ আরো গভীর করেছে। অর্থবহ সংলাপ ও সহযোগিতা ছাড়া, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

লেখক : আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক, জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি