আযাদ আলাউদ্দীন
‘একটি হৃদয় কলির মতো, ওলির মতো, মেঘনা নদীর পলির মতো’ এমনি অসংখ্য জনপ্রিয় কবিতার রচয়িতা, গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী মতিউর রহমান মল্লিকের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১০ সালের ১২ আগস্ট ইন্তেকাল করেন তিনি।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক বাংলাদেশে ইসলামী গানের একজন আলোচিত গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী। শৈশব থেকে তিনি বিভিন্ন ধরনের সংগঠন গড়ে তুলতে থাকেন। বাংলাদেশে সাহিত্য সংস্কৃতির একটি নতুন ধারা তৈরি করে গেছেন তিনি। যেটি এদেশের বেশির ভাগ মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে। লেখালেখি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি সারা দেশে তৈরি করেছেন অনেক সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক। যারা প্রতিনিয়ত স্মরণ করেন তার বিশ্বাসী প্রতিভা, আন্তরিক উদারতা আর স্নেহময় পরশের কথা।
মতিউর রহমান মল্লিক ১৯৫৪ সালের পয়লা মার্চ বাগেরহাটের সদর উপজেলার বারুইপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মুন্সি কায়েম উদ্দিন মল্লিক স্থানীয় জারিগানের দলের জন্য গান লিখতেন। মা আয়েশা বেগম। তৎকালীন রেডিওতে কবি ফররুখ আহমদ যে সাহিত্য আসর পরিচালনা করতেন ওই আসরে মল্লিকের বড় ভাই কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। বাবা-মার সান্নিধ্যে থেকে তিনি গানের প্রাথমিক জীবন শুরু করেন। ছেলেবেলায় রেডিওতে শুনে শুনে গান লেখা শুরু করেন। তখন তার প্রায় সব গানই ছিল প্রেমের। পরবর্তীতে ইসলামী ধারায় গান লেখা শুরু করেন।
মল্লিক বারুইপাড়া সিদ্দীকিয়া সিনিয়র মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। বাগেরহাট পিসি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন।
কর্মজীবন : কর্মজীবনে কবি মতিউর রহমান মল্লিক সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক, ‘বিপরীত উচ্চারণ’ সাহিত্য সঙ্কলনও সম্পাদনা করেছেন, মাসিক কলম পত্রিকার সম্পাদক এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ছিলেন।
সাংস্কৃতিক জীবন : মতিউর রহমান মল্লিককে প্রথম ঢাকায় নিয়ে আসেন শহীদ মীর কাসেম আলী। তার পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৮ সালে ঢাকায় সমমনা সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে কবি মল্লিক গড়ে তোলেন সাংস্কৃতিক সংগঠন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী। একই বছর চট্টগ্রামে পাঞ্জেরী শিল্পীগোষ্ঠী এবং বরিশালে হেরাররশ্মি শিল্পীগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে কাজ করেন তিনি। তার অনুপ্রেরণায় বাংলাদেশের সব বিভাগীয় ও জেলা শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জেও গড়ে ওঠে একই ধারার অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন। শুধু তাই নয়, পশ্চিমবঙ্গ, আসামসহ বিশ্বের যেখানে বাংলাভাষাভাষী মুসলমান আছেন, সেখানে গড়ে উঠেছে একই ধারার বহু সাংস্কৃতিক সংগঠন।
কবি মতিউর রহমান মল্লিকের জনপ্রিয় গানের মধ্যে আছে- তোমার সৃষ্টি যদি হয় এত সুন্দর, টিক টিক টিক টিক যে ঘড়িটা, রাসূল আমার ভালোবাসা, পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয়, এলো কে কাবার ধারে, সে কোন বন্ধু বলো, আম্মা বলেন ঘর ছেড়ে তুই, এ আকাশ মেঘে ঢাকা রবে না, কথায় কাজে মিল দাও আমার, এসো গাই আল্লাহ নামের গান, হঠাৎ করে জীবন দেওয়া খুব সহজ, আয় কে যাবি সঙ্গে আমার, আমার গানের ভাষা জীবনের সাথে যেন মিলেমিশে হয় একাকার প্রভৃতি।
প্রকাশিত গ্রন্থ ও অন্যান্য : নীষন্ন পাখির নীড়ে (কাব্যগ্রন্থ), সুর-শিহরণ (গানের বই), যত গান গেয়েছি (গানের সঙ্কলন), ঝঙ্কার (গানের বই), আবর্তিত তৃণলতা (কাব্যগ্রন্থ), মোনালিসা প্রকাশন, তোমার ভাষার তীক্ষ্ণ ছোরা (কাব্যগ্রন্থ), অনবরত বৃক্ষের গান (কাব্যগ্রন্থ), চিত্রল প্রজাপতি (কাব্যগ্রন্থ), নির্বাচিত প্রবন্ধ (প্রবন্ধের বই), রঙিন মেঘের পালকি (ছোটদের ছড়ার বই), প্রতীতি এক (ইসলামি গানের ক্যাসেট), প্রতীতি দুই (ইসলামি গানের ক্যাসেট), প্রাণের ভিতরে প্রাণ (গীতিকাব্য) উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া প্রকাশনা সংস্থা ‘দেশজ প্রকাশন’ ছয় খণ্ডে প্রকাশ করেছে কবি মতিউর রহমান মল্লিক রচনাবলী।
অনুবাদক হিসেবেও তিনি ছিলেন জনপ্রিয়। পাহাড়ি এক লড়াকু নামে আফগান মুজাহিদদের কীর্তি তার বিখ্যাত অনুবাদ উপন্যাস। মহানায়ক (উপন্যাস) ছাড়াও হজরত আলী ও আল্লামা ইকবালের কবিতাও অনুবাদ করেছেন তিনি।
স্বীকৃতি : সাহিত্যকর্মে অবদানের জন্য তিনি বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তার প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননা, সাহিত্য পুরস্কার : সবুজ-মিতালী সংঘ, বারুইপাড়া, বাগেরহাট, স্বর্ণপদক : জাতীয় সাহিত্য পরিষদ, ঢাকা, সাহিত্য পদক : কলমসেনা সাহিত্য পুরস্কার- ঢাকা, লক্ষ্মীপুর সাহিত্য সংসদ, রাঙ্গামাটি সাহিত্য পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম, খানজাহান আলী শিল্পীগোষ্ঠী, বাগেরহাট, সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ, সমন্বিত সাংস্কৃতিক সংসদ, বাগেরহাট, প্যারিস সাহিত্য পুরস্কার : বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ, ফ্রান্স, বায়তুশ শরফ সাহিত্য পুরস্কার : বায়তুশ শরফ আঞ্জুমানে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম, ইসলামী সংস্কৃতি পুরস্কার : ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদ, চট্টগ্রাম, বাংলা সাহিত্য পরিষদ, ফ্রান্স এবং কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার।