সম্ভবত ১৯৮৮ বা ১৯৮৯ সালের কোনো একসময় আমরা জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিক বিপরীত দিকে থাকতাম। তখন আমার বয়স ১১ বা ১২ বছর। আমার বাবা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী যুক্তরাজ্যে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরের উদ্দেশে গাড়িতে উঠছিলেন। আমরা তাকে বিদায় জানাচ্ছি। পাশে একজন লম্বা ও সুদর্শন ব্যক্তি বসেন, যার পরণে ছিল স্যুট।

আমার বাবা তাকে সালাম দিয়ে অভ্যর্থনা জানান এবং মজা করে বললেন, ‘আমরা কি প্রস্তুত, ব্যারিস্টার সাহেব?’

তিনি মাথা নাড়লেন। তারপর বাবা বললেন, তিনি ব্রিফকেস নিচ্ছেন না, আর ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক উত্তর দিলেন, ‘আমি আপনার ব্রিফকেস হবো।’

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের সাথে এটাই ছিল আমার প্রথম পরিচয়। দুর্ভাগ্যবশত, ২০১৩ সাল পর্যন্ত আমি তাকে ভালোভাবে জানার বা তার কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পাইনি। ২০১৩ সালের গ্রীষ্মে, ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। আমি সবেমাত্র পিএইচডি শেষ করেছি এবং কিছু অবসর সময় পেয়েছি। তাই, নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটন ডিসিতে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের সাথে তার সভায় স্বেচ্ছায় যোগ দিই। জাতিসঙ্ঘের সহকারী মহাসচিবের সাথে আমাদের দেখা করার কথা ছিল। আমি এ নিয়ে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু ব্যারিস্টার রাজ্জাক আমাকে শান্ত করেন এবং জানতে চান আমার সাথে নোটবুক আছে কি না। আমার সাথে ছিল না, তাই একটি নোটবুক কিনতে স্ট্যাপলসে থামতে হয়। তিনি আমাকে সভায় নোট নিতে বলেন। সভার পরে, আমরা নোট বিনিময় করি। তিনি যেকোনো সভার ৩৬০-ডিগ্রি দৃশ্য পেতে নোট নেয়া ও বিনিময় করার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন।

তারপর আমরা বেশ কয়েকটি সভা করতে ওয়াশিংটন ডিসিতে যাই। আমি তাকে প্রতিটি সভার জন্য পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রস্তুতি নিতে দেখেছি। আমরা যার সাথে দেখা করতাম তার সম্পর্কে তিনি সম্ভাব্য সব তথ্য নিতেন এবং আমাদের সংক্ষিপ্ত করে বলতেন। হোটেল রুম থেকে বের হওয়ার আগে তিনি সর্বদা দুই রাকাত নামাজ পড়তেন এবং আল্লাহর কাছে সঠিক পথনির্দেশ চাইতেন। আমি যখন তাকে এক সভা থেকে অন্য সভায় যেতে গাড়ি চালাতাম অথবা ডিসির যানজটে আটকে যেতাম, তখন তিনি ব্রিফকেস থেকে কুরআনের একটি কপি বের করে তেলাওয়াত করতেন। তিনি সময় নষ্ট করতেন না। প্রতিটি সজাগ মুহূর্ত কাজে লাগিয়ে প্রোডাকটিভ কিছু করতে চাইতেন।

বিভিন্ন সভা ও মিটিংয়ে এক সপ্তাহ ব্যস্ত সময় কাটানোর পর ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। যাওয়ার সময় আমাকে কিছু কাজ দিয়ে যান। তার পর থেকে, আমি শিক্ষকতার কাজের পাশাপাশি ওকালতির কাজেও ব্যস্ত থাকি। প্রায়ই, আমাকে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে আমার বাড়ি থেকে ডিসিতে ৫-৬ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে যেতে হতো এবং আমার অনুপ্রেরণা ছিলেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। তিনি আমাকে পথ দেখিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন এবং আমাকে কিছু দায়িত্বও অর্পণ করেছিলেন।

শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে হাসিনা ফাঁসি দেয়ার কয়েক দিন পর, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৪ আমি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের ফোন পেলাম। তিনি ওয়াশিংটন ডিসি আসার একটি ফ্লাইটে উঠছেন। তিনি আমাকে ফ্লাইটের তথ্য দিলেন এবং বিমানবন্দরে তার সাথে দেখা করতে বললেন। তার কথাবার্তা ছিল স্বাভাবিক। তার সাথে আলাপে আমি অস্বাভাবিক কিছু টের পাইনি, আমি ভেবেছিলাম এটিও ওয়াশিংটন ডিসিতে তার আরেকটি ব্যস্ত সফর হতে চলেছে। কিন্তু যখন তিনি নামলেন এবং আমি তাকে আমার গাড়িতে তুলে নিলাম, তখন লক্ষ্য করলাম তার কাছে একটি বহনযোগ্য রোলারবোর্ড ছাড়া আর কোনো লাগেজ নেই। আমি যখন গাড়ি চালাতে শুরু করলাম, তখন তিনি জানালেন যে, তাকে বাংলাদেশ ছেড়ে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। সম্ভবত তিনি শীঘ্রই আর দেশে ফিরে যেতে পারবেন না। তিনি এত শান্ত স্বরে কথাটি বলছিলেন যে, তাতে উদ্বেগের লেশমাত্র ছিল না। এটি ছিল তার দৃঢ়বিশ্বাসের প্রকাশ। আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম, কিন্তু আমার গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের নির্বাসিত জীবন শুরু হয়।

এর পর থেকে, তিনি তার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ভাগ করে নেন। কিন্তু তিনি যখনই আমেরিকায় থাকতেন, আমিই থাকতাম তার কাছে। আমি সর্বত্র থাকতাম তার সাথে। তিনি জেগে থাকলে আমি আক্ষরিক অর্থেই তার সাথে সময় কাটাতাম। তার সাথে যত বেশি সময় কাটাতাম, তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তত বেশি বেড়ে যেত।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক তার স্বাস্থ্যের প্রতি বেশ মনোযোগী ছিলেন। তিনি সর্বদা স্বাস্থ্যকর খাবার খেতেন এবং প্রতিদিন কমপক্ষে এক ঘণ্টা হাঁটতেন। তিনি সর্বদা আমাকে মনে করিয়ে দিতেন, ‘তুমি যদি স্বাস্থ্যের যত্ন না নাও, তাহলে অন্য কেউ সেটি করবে না।’

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক একজন আগ্রহী পাঠক ছিলেন। আমি তাকে বার্নস অ্যান্ড নোবেল-এ নিয়ে যেতাম। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই পড়তেন। তিনি একবার আমাকে জিজ্ঞাসা করেন যে, রাষ্ট্রপতি ওবামা যে বইগুলো পড়তে পছন্দ করেন আমি সেগুলো খুঁজে পেতে পারি কি না। অনেক সভায়, তিনি তার বন্ধুদের জিজ্ঞাসা করতেন যে তারা কোন বই পড়ছেন এবং পরে আমাকে সেই বইগুলো তার জন্য আনতে বলতেন। তিনি সর্বদা কয়েকটি বই সাথে রাখতেন এবং যখনই অবসর পেতেন তখনই পড়তেন। কখনো তিনি আমাকে এমন কিছু ‘আমেরিকান রূপক’ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন যা পড়ার আগ পর্যন্ত তিনি জানতেন না। একদিন তিনি পড়ছিলেন, কিন্তু Monday morning Quarterback-এর অর্থ বুঝতে পারছিলেন না। আমি তাকে আমেরিকান ফুটবল সম্পর্কে জানিয়েছিলাম। আরেকবার তিনি Chips have fallen রূপকটি বুঝতে পারছিলেন না। একটু দ্বিধা নিয়ে, আমি তাকে বললাম এটি একটি জুয়ার পরিভাষা, তিনি হেসে দেন। কিন্তু সবসময় তার প্রিয় গ্রন্থ ছিল কুরআন। কুরআনের বিভিন্ন পৃষ্ঠায় তার অনেক স্টিকি নোট ছিল যা তিনি পড়তেন এবং আমার সাথে তার ব্যাখ্যা শেয়ার করতেন।

তার ধৈর্য ধরে শোনার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। অনেক সভায় আমি ক্ষুব্ধ হওয়ার মতো বিষয় দেখেছি। কারো অসম্মানজনক ও অমর্যাদাকর মন্তব্য আমার রক্ত গরম করে তুলত, কিন্তু তাকে কখনো রেগে যেতে দেখিনি। বরং তিনি জানতে চাইতেন আমি এটা লিখে রেখেছি কি না। এটি ছিল তার একটি বিরল বৈশিষ্ট্য। আমি চাই রাজনীতিবিদরা এমন জিনিসগুলো শুনুক যা তাদের পছন্দ নয়।

আমি বলছি না যে, ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক কখনো রাগ করেননি, তবে তা একেবারেই বিরল ছিল। একবার আমাদের গাড়ি অনেক দূরে পার্ক করতে হয়েছিল বলে আমরা ওয়াশিংটন ডিসিতে হাঁটছিলাম। আমাদের অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য কিছুটা দেরি হয়ে যাচ্ছিল, তাই আমি প্রায় দৌড়াতে শুরু করেছিলাম এবং আমাদের ট্র্যাফিক সিগন্যাল দেখা গেল। হালকা ট্র্যাফিক ছিল এবং আমরা রাস্তা পার হতে পারছিলাম, কিন্তু যেহেতু ‘হাঁটবেন না’ সাইনবোর্ড লাগানো ছিল, তাই আমার হাঁটতে শুরু করাটা তিনি পছন্দ করেননি। তিনি আমার ওপর একটু রেগে গিয়ে বলেন, কখনো আইন ভঙ্গ করবা না, এমনকি যদি এটি ‘জেওয়াকিং’-এর মতো ক্ষতিহীন কিছুও হয়। এটি আমাকে তার ব্যক্তিত্ব ও তার সততার স্তর সম্পর্কে অনেক কিছু বলে।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক আমাকে আমার বাবার গল্পও বলেছিলেন, যা আমি জানতাম না। তিনি আমাকে এক গল্পে বলেছিলেন যে, ১৯৭২ সালে তিনি দুবাইতে একটি আন্তর্জাতিক যুব সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার কাছে স্যুট ছিল না, তাই আমার বাবা রাতে তার জন্য স্যুট কিনতে বেরিয়েছিলেন। এ ছাড়া যখন তিনি লন্ডনে তার প্র্যাকটিস ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন, তখন ১৯৮৬ সালে আমার বাবা ঢাকা বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানান।

তিনি আমাকে খুব সাধারণভাবে সেই গল্পটি বলেছিলেন যেন এটি কোনো বড় বিষয় নয়। কিন্তু আমরা যারা পশ্চিমে থাকি তারা জানি, পশ্চিমে ক্যারিয়ার ও নিরাপদ জীবন ত্যাগ করা কতটা কঠিন। অন্য কোনো সময়, তিনি আমাকে বলেছিলেন, যখন তিনি লন্ডন ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার প্র্যাকটিস একেবারে জমজমাট ছিল। তার নিজের ভাষায়, ‘দরজা দিয়ে, জানালা দিয়ে, এ/সি ভেন্ট দিয়ে টাকা আসছিল।’ গভীর বিশ্বাসের জন্য তিনি সবকিছু ছেড়ে দিয়েছিলেন; তিনি যে আদর্শে বিশ্বাস করতেন তাকে সাহায্য করার জন্য তার পুরো জাগ্রত সময়কে সঠিক কাজে লাগানোর জন্য ব্যয় করেছিলেন।

আমরা অনেক বিষয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতাম। আমরা সবসময় একমত না হলেও, তিনি ভিন্নমতের বিষয়টা এত সহৃদয়ভাবে মেনে নিতেন যা ছিল বিরল। কোভিডের পর তিনি খুব বেশি যুক্তরাষ্ট্রে আসেননি। তার শেষ সফর ছিল ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে। এটি ছিল খুব ছোট সফর। সম্ভবত এটাই ছিল একমাত্র সময় যখন আমি তাকে দেখার সুযোগ পাইনি, কিন্তু আমরা কথা বলেছিলাম। আমি জানতাম না যে তাকে আর দেখতে পাবো না; তাহলে সব ব্যস্ততা ফেলে তাকে দেখতে যেতাম।

৪ মে, ২০২৫, তিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন; তিনি আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু তার আবেগের বাংলাদেশ চিরকাল আমাদের সাথে থাকবে। আমি তার জন্য খুশি যে জুলাই বিপ্লবের পর, তিনি তার নির্বাসন শেষ করে প্রিয় বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পান। তিনি বাংলাদেশের জন্য তার যা কিছু ছিল তার সবটাই দিয়েছিলেন; তিনি যে আদর্শে বিশ্বাস করতেন তার জন্য তিনি যা কিছু অর্জন করেন তা দিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক মতাদর্শের পুরো পরিসরে তিনি সবার সম্মান অর্জন করেছিলেন। আমি আপনাকে মিস করব ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক চাচা। বাংলাদেশ আপনাকে মিস করবে। এটি একটি যুগের সমাপ্তি।

আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, পরম করুণাময় যেন আপনার সব নেক আমল কবুল করেন, আপনার সব ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করেন এবং আপনাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান দান করেন। আমিন।

লেখক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক